এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে নয় হাজার কোটি টাকার বেশি। শতকরা হারে বৃদ্ধি হয়েছে শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ।

তবে গত সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার আরও বেশি ছিল। সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ কমেছে পরিমাণে ৭ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৯১ শতাংশ।

সর্বশেষ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন ৫০ হাজার ১৫৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, যা এ সময় পর্যন্ত বিতরণ করা ৫ লাখ ১৭ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকার ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

২০১৩ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪০ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা বা বিতরণ করা ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকার ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

আর ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ হয়েছিল ৫৭ হাজার ২৯০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা বা মোট বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ।

ব্যাংক খাতের সূত্রগুলো বলছে, মূলত ঋণ পুনঃ তফসিল করে ও ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়িয়ে এ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমানো হয়েছে।

অবশ্য যোগাযোগ করা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, পুনঃ তফসিল হয়তো কিছুটা থাকতে পারে। তবে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ এ প্রান্তিকে আদায়ও হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরিং বা তদারকি ব্যবস্থাও এ সময়ে বেশ জোরদার ছিল। এতে নতুন ঋণ খেলাপি কম হয়েছে।’   

যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মইনুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, খেলাপি ঋণের যে হিসাব দেওয়া হয়, তা আসলে একধরনের প্রতারণা। কেননা, এর মধ্যে অবলোপন বা রাইট অফ করা ঋণের হিসাব থাকে না। অথচ অবলোপন করা ঋণের আদায় তেমন নেই এবং আদায়ের চেষ্টা হয় না। তিনি বলেন, ‘২০০২ সালে অবলোপনের সুযোগ তৈরি করার পর এর পরিমাণ ও তার সুদাসলের হিসাব প্রথম এক বছর প্রকাশ হয়। এতে দেখা যায়, অবলোপন ঋণের আদায় ১ শতাংশের মতো। এ পরিস্থিতিতে আর তা প্রকাশ হচ্ছে না।’

রাষ্ট্র খাতের ব্যাংক: বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তুত করা ২০১৪ সালের ডিসেম্বরভিত্তিক প্রতিবেদন অনুসারে, রাষ্ট্র খাতের ব্যাংকগুলোতেই সর্বাধিক পরিমাণ খেলাপি ঋণ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবার বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের তথ্য রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের তালিকার মধ্যে নিয়ে এসেছে। এর আগে বেসিক ব্যাংককে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংকের তালিকায় রাখা হতো। ডিসেম্বর শেষে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক মিলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হয়েছে ২২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকার বেশি। শতকরা হারে যা মোট বিতরণ করা ঋণের ২২ দশমিক ২৩ শতাংশ।

২০১৩ সাল শেষে রাষ্ট্রমালিকানাধীন চার বাণিজ্যিক ব্যাংকে অর্থাৎ সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৬০৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা বা মোট ঋণের ১৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

২০১৪ সাল শেষে বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ হয়েছে ৬ হাজার ৩০৯ কোটি ৮৮ লাখ বা মোট বিতরণ করা ঋণের ৫৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকটির বিতরণ করা ১১ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকার মধ্যে বেশির ভাগ ঋণই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। যার আবার প্রায় ৪ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা বা ৩৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ লোকসানি বা ক্ষতিজনক পর্যায়ের খেলাপি। হিসাববিজ্ঞানের ভাষায় যা কখনো আদায় হবে না।

রাষ্ট্র খাতের এই ব্যাংকটি ২০০৮ সাল শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

 বেসরকারি ব্যাংক: বেসরকারি ৩৯ ব্যাংকে ২০১৪ সাল শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হয়েছে ১৮ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা বা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ২০১৩ সাল শেষে ছিল প্রায় ১৪ হাজার ৩১৬ কোটি বা ৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

 বিশেষায়িত ব্যাংক: ২০১৪ সাল শেষে রাষ্ট্র খাতের বিশেষায়িত তিন ব্যাংক অর্থাৎ বিডিবিএল, কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক বা রাকাবের খেলাপি ঋণ হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ২৬০ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৮১ শতাংশ। ২০১৩ সাল শেষে এ তিন ব্যাংকের সঙ্গে বেসিক ব্যাংক মিলে চার ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ৮ হাজার ৩৫৮ কোটি বা মোট ঋণের ২৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

 বিদেশি ব্যাংক: বিদেশি নয়টি ব্যাংকে ২০১৪ সাল শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ। ২০১৩ সাল শেষে ছিল প্রায় ১ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা বা বিতরণ করা ঋণের সাড়ে ৫ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন