default-image

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯কে মহামারি ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। গত বছরের নভেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান থেকে উৎপত্তি হওয়া এই ভাইরাস এখন সারা বিশ্বের আতঙ্ক। এর প্রাদুর্ভাব এখন ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়েছে। মহামারি ঠেকাতে নানা দেশ নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। কোয়ারেন্টিন–সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপ হিসেবে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী বাতিল হয়েছে হাজার হাজার আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। লাখ লাখ কোটি টাকার লোকসান। এই ভাইরাস কেবল স্বাস্থ্যে মারছে না, অন্নেও মারতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশের শেয়ার ও তেলের বাজারে ধস নেমেছে। বছর শেষে প্রবৃদ্ধির হার কত কমবে, তাই নিয়ে এখনই শুরু হয়ে গেছে হিসাব–নিকাশ। সব মিলিয়ে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে বিশ্ব।

সম্প্রতি ব্লুমবার্গের অর্থনীতিবিদেরা করোনার সংক্রমণকে চারটি পর্যায়ে বিশ্লেষণ করে পূর্বাভাস দিয়েছেন। যদিও এই ভাইরাসের অনেক কিছুই এখনো মানুষের অজানা। সেই সঙ্গে সরকারগুলোর পদক্ষেপ ও ব্যবসায়িক প্রতিক্রিয়া দেখে এখনই চূড়ান্ত উপসংহারে যাওয়া সম্ভব নয়। তবে এই চার পর্যায়ের মাধ্যমে বলা যায়, কিসের মুখে পড়তে যাচ্ছে বিশ্ব।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে, চীনে কী হচ্ছে। গত তিন–চার মাসে দেশটির অটোমোবাইল শিল্পে ব্যাপক ধস নেমেছে। গাড়ি বিক্রি কমে গেছে প্রায় ৮০ শতাংশ। যেসব পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হচ্ছে, তাতে সর্বকালের সর্বনিম্ন অবস্থানই নির্দেশ করছে। অর্থনৈতিক কার্যকলাপ কার্যত বন্ধই হয়ে গেছে। ব্লুমবার্গের অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন, চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার গত বছরের তুলনায় এ বছর ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে যাবে, যা কিনা রেকর্ড। যদি চীন এই মার্চের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াতে না পারে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সেই ধারণা মাথায় নিয়েই এই চার ধাপের বিশ্লেষণ করেছেন তাঁরা।

১. বড় ধাক্কা চীনের, ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বে
প্রথমে ধরে নেওয়া যাক, খুব দ্রুত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে চীন। তাহলে বছর শেষে কোন অবস্থানে দাঁড়াবে বিশ্ব। ধরা যাক, মার্চের মধ্যেই খুলে গেছে চীনের সব কারখানা, কাজে নেমে পড়েছে মানুষ। বিশ্বের কাছে চীন হলো চাহিদার উৎস, সরবরাহের উৎস। বিশ্বের কারখানা বলা হয় দেশটিকে। ২০১৯ সালে ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের আমদানি করে চীন। স্টারবাকসের ল্যাতে কফি থেকে শুরু করে ইয়ামস ফ্রাইড চিকেন পর্যন্ত অসংখ্য বহুজাতিক কোম্পানির প্রধান ক্রেতা চীন। এই চীনের মানুষ যখন ঘরবন্দী হয়, তখন ক্ষতির পরিমাণটা যে বড়ই হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্বের সব দেশের পর্যটন খাতই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। করোনাভাইরাসের কারণে চীনের অসংখ্য কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অ্যাপলের আইফোন থেকে শুরু করে নির্মাণ যন্ত্রপাতি পর্যন্ত সব পণ্য উৎপাদনেই ব্যাঘাত ঘটেছে। তবে কেবল বড় বড় নামকরা কোম্পানিই যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা নয়, ছোট কারখানাগুলোতেও প্রভাব কম পড়বে না।

এখন ধরা যাক চীন দ্রুত প্রকোপটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে চীন। বিশ্বব্যাপী বাকি অর্থনীতিগুলোতেও যা প্রভাব ফেলবে। এভাবে চললে প্রথমার্ধের ক্ষতি দ্বিতীয়ার্ধেই কিছুটা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। ফলে বছর শেষে বিশ্বে এর প্রভাব তেমন দেখা যাবে না।

২. প্রাদুর্ভাব একক একক দেশে বাধা সৃষ্টি করবে
এখন প্রশ্ন, কী ঘটবে যদি প্রাদুর্ভাব বাড়ে। দ্বিতীয় পরিস্থিতিতে ব্লুমবার্গের অর্থনীতিবিদেরা ধরে নিচ্ছেন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে চীনের আরও অনেক সময় লাগল। পুনরুদ্ধার সরাসরি ‘ভি’ শেপের না হয়ে ‘ইউ’ শেপের হলো। অর্থাৎ আস্তে আসতে পুনরুদ্ধার। মেড ইন চায়না ডটকমের ব্যবস্থাপক লি লেই বলেন, সব কারখানা উৎপাদনে ফিরলেও সব সমস্যার সমাধান হবে না। অনেক কারখানায় পর্যাপ্ত পরিমাণ রসদ নেই...সরবরাহ শৃঙ্খলে বাধা উৎপাদনক্ষমতা। চীন ছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, জাপান, ফ্রান্স ও জার্মানিতে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। ফলে বছর শেষে বিশ্ব প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা আগে ৩ দশমিক ১ শতাংশ হবে বলে আশা করা হচ্ছিল।

৩. প্রাদুর্ভাব বেড়েই চললে...
এর চেয়েও খারাপ হলে অর্থনীতির কত ক্ষতি হতে পারে, সেটাও নির্ণয়ের বিষয়। দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, জাপান, ফ্রান্স ও জার্মানিতে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ল প্রাদুর্ভাব। এর মধ্যে মার্চের শুরুতে যেসব দেশ করোনাভাইরাসে আক্রান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, তারাও মোটামুটি সংক্রমণ নিয়ে বিপদে আছে। এসব দেশের মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, কানাডা। এর অর্থ হলো, বিশ্বের ১০টি বৃহত্তম অর্থনীতিরই গতি হ্রাস পাচ্ছে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে লড়াই করে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ব প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ২ শতাংশে ঠেকতে পারে। ইউরো অঞ্চল ও জাপানে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি কমবে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। নির্বাচনের বছর দেশটি ব্যাপক বেকারত্বের হারে ভুগবে।

৪. বিশ্বব্যাপী মহামারি
বিশ্বব্যাপী মহামারির অর্থনৈতিক প্রভাব ধরার জন্য আমরা ধরে নিই যে এই পরিস্থিতিতে পুরো দেশই একটি মারাত্মক ধাক্কার মুখোমুখি। এমন অবস্থায় এ বছর বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার প্রায় শূন্য শতাংশ। সংকুচিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরো অঞ্চল ও জাপানের মতো অর্থনীতি। চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার হবে মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ, যা কিনা ১৯৮০ সালের পর সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির হার। বিশ্ব প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি দেখবে। আসলে পরিস্থিতি যে এই চূড়ান্ত অবস্থায় দিকেই যাচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

default-image

এয়ারলাইনস শিল্পের ক্ষতি
করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ এর প্রভাব পড়ছে অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে। সবচেয়ে বড় সংকট উৎপাদন খাতে। সংকট তৈরি হয়েছে সাপ্লাই চেইন সরবরাহ ব্যবস্থাতেও। আর এখন বড় সংকট চলছে আকাশপথে। ভাইরাসের আতঙ্কে মাটিতে নেমে এসেছে এয়ারলাইনস বা এভিয়েশন শিল্প খাত। কেননা, করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী অসংখ্য মানুষ ভ্রমণ স্থগিত রেখেছে। পর্যটন খাত বড় ধরনের বিপদে আছে। মানুষ সফর কম করছে বলে অনেক এয়ারলাইনস এখন আর আকাশে উড়ছে না। চীনের মানুষ বলতে গেলে ঘরেই বসে আছে। অন্যরাও বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হচ্ছেন না।

করোনাভাইরাস দ্রুত কীভাবে ছড়াচ্ছে? মূলত এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে বিমান চলাচল। এ কারণে অনেক দেশই চীনে ফ্লাইট পরিচালনা করছে না। ফলে চীনের মতো একটি বড় দেশেরে আশপাশে থাকা ছোট ছোট অর্থনীতির দেশ সংকটে পড়ে আছে বেশি। এর মধ্যে পাশের অর্থনীতি হংকং ও তাইওয়ান সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে। আবার একই অঞ্চলের বড় অর্থনীতির দেশ জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থা্ও ভালো নয়। তাদের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ ফ্লাইট বন্ধ হয়ে আছে। আবার দূরের দেশগুলোর মধ্যে কানাডা তাদের ফ্লাইট বন্ধ রেখেছে ৫৮ শতাংশ এবং রাশিয়া ৬৭ শতাংশ।

তাহলে হিসাবটা এ রকম। তাইওয়ানের ফ্লাইট বন্ধ হয়ে আছে ৯০ দশমিক ৪ শতাংশ, হংকং-এর ৮৬ দশমিক ৬ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৮৫ দশমিক ৯ শতাংশ, থাইল্যান্ড ৭৬ দশমিক ৯ শতাংশ, মালয়েশিয়া ৭৫ দশমিক ২ শতাংশ, জাপান ৭৪ দশমিক ৬ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ার বন্ধ ৬৯ দশমিক ৩ শতাংশ ফ্লাইট, রাশিয়ার ৬৭ দশমিক ৪ শতাংশ, কানাডার ৫৮ দশমিক ২ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ফ্লাইট বন্ধ ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন