>করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর অনেকেই চীনের বিকল্প কোনো দেশ থেকে শিল্পের কাঁচামাল ও পণ্য আমদানির কথা বলছেন। আসলে কি চীনের বিকল্প আছে?
default-image

পুরান ঢাকার নবাবপুরের একজন কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবসায়ীর কাছে জানতে চাইলাম, চীন যেহেতু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে যথাসময়ে পণ্য দিতে পারছে না, তাহলে অন্য দেশ থেকে কি আমদানি করা যায় না?

ব্যবসায়ী এককথায় উত্তর দিলেন। বললেন, ‘সম্ভব না।’ কেন, তার ব্যাখ্যাও দিলেন তিনি। বললেন, ‘চীনের ছয় অশ্বশক্তির একটি শ্যালো যন্ত্রের দাম ১৪ হাজার টাকার আশপাশে। এটি যদি জাপান থেকে আনতে যান, তাহলে দাম পড়বে ৬০ হাজার টাকা। কজন ক্রেতা এত চড়া দামে কিনতে পারবেন?’

এই ব্যবসায়ীর নাম শামীম ফয়সাল। তিনি বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল মেশিনারি মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। তিনি আরও বলেন, চীনের মতো এত কম দামে এত পণ্য আর কেউ দিতে পারবে না। তাই চীনের বিকল্প আসলে নেই।

চীনে নতুন ধরনের করোনাভাইরাস ছড়াতে শুরু করে গত ডিসেম্বর মাসে। ৩১ ডিসেম্বর চীন সরকার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়। শুরুটা হয়েছিল চীনের হুবেই প্রদেশের উহান থেকে। সেখানে ২৩ জানুয়ারি থেকে সবকিছু বন্ধ করে দেয় চীন সরকার। অবশ্য প্রতিবছরের জানুয়ারির শেষে চীনে নববর্ষের ছুটি শুরু হয়। এ সময় কোনো কাজ হয় না, সেটা সবার জানা। তাই ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই পণ্য আমদানি করে রাখেন।

সব মিলিয়ে ২৪ জানুয়ারি ছুটি শুরুর পর তা দুই দফা বাড়িয়ে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নেওয়া হলেও বাংলাদেশে পণ্যের ব্যাপক ঘাটতি তৈরি হয়নি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দাম বেড়েছে। অবশ্য বিশ্লেষকেরা বলছেন, আগামী দুই, তিন সপ্তাহে বোঝা যাবে সরবরাহ পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়।

এখানে একটা বিষয় জানিয়ে রাখা দরকার, চীনে করোনার কারণে বাংলাদেশে শুরুতেই রসুন ও আদার দাম বেড়ে গিয়েছিল। ১৬০ টাকা কেজির আশপাশে চীনা রসুন ও আদা ২০০ টাকা কেজি হয়ে যায়। অবশ্য এখন দেশি রসুন উঠছে। ভারত ও মিয়ানমার থেকে আদা আসছে। ফলে দাম কমে গেছে।

যাহোক, আলোচ্য বিষয় হলো শিল্পের কাঁচামাল ও অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে চীনের কি কোনো বিকল্প চিন্তা করা যায়। বাংলাদেশ কতটুকু চীননির্ভর, তা দেখা যায় বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক প্রাথমিক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে। এটি তৈরি করেছেন কমিশনের সদস্য মোস্তফা আবিদ খান।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া প্রতিবেদনটিতে দেখা যায়, সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৫ হাজার ৬০৬ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যার ২৫ শতাংশ এসেছে চীন থেকে। আপনি যদি মোট আমদানি থেকে জ্বালানি ও খাদ্য বাদ দেন, তাহলে দেখবেন শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ, মধ্যবর্তী পণ্য ও অন্যান্য পণ্যের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীলতা অনেক বেশি।

মোস্তফা আবিদ খান বাংলাদেশে ২৫ ধরনের পণ্য ও ২৫ ধরনের কাঁচামাল অথবা মধ্যবর্তী পণ্যের মোট আমদানি ও সেখানে চীনের অংশ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ নির্ভরতা চীনের ওপরে। যেমন তুলা থেকে উৎপাদিত সুতা ও সমজাতীয় পণ্যের (এইচএস কোড নম্বর ৫২) ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মোট আমদানি ৫২০ কোটি ডলার, যার ৫৪ শতাংশ আসে চীন থেকে।

বৈদ্যুতিক সামগ্রী ও সরঞ্জাম, ইস্পাতের বিভিন্ন উপকরণ, আসবাবের সরঞ্জাম, জুতা ও সমজাতীয় পণ্য, খেলনা ইত্যাদি ১৫টি পণ্যের বিকল্প বাজার কী হতে পারে, তা–ও দেখানো হয়েছে ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে। যদিও সেসব বাজার থেকে ব্যবসায়ীরা কম আমদানি করেন। যেমন ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বৈদ্যুতিক সামগ্রী ও সরঞ্জামের ৫৭ শতাংশ এসেছে চীন থেকে। দ্বিতীয় বড় উৎস ভারত, হিস্যা মাত্র ৭ শতাংশ। জার্মানি ও ইতালি থেকেও আসে। কিন্তু ইউরোপীয় পণ্যের যে দাম পড়ে, তা কেনার সাধ্য সাধারণের নেই।

আবার অনেক পণ্য আছে, যেগুলো তৈরিতে অন্যান্য দেশ কাঁচামাল নেয় চীন থেকে। যেমন ওষুধের কাঁচামাল বা অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যালস ইনগ্রেডিয়েন্টসের (এপিআই) বড় উৎস চীনের উহান। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব এস এম শফিউজ্জামান সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এপিআইয়ের কিছু কিছু আমরা ভারত থেকে আনি। ভারত আবার মধ্যবর্তী পণ্য আনে চীন থেকে।’

অবশ্য ভালো খবর হলো, চীনের পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম প্রথম আলোকে গত বুধবার বলেন, চীন থেকে সরবরাহজনিত যে সমস্যা, সেটা বাংলাদেশ কাটিয়ে উঠছে বলেই তাঁর কাছে মনে হচ্ছে। যদিও কিছু বিলম্বের ঘটনা ঘটতে পারে।

অবশ্য এখন দেখার বিষয়, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়। এ দেশে করোনা ছড়িয়ে পড়ার কারণে যদি মানুষ ঘর থেকে বের না হয়, পণ্যের চাহিদা কমে যায়, তাহলে চীনের বিকল্প খুঁজে লাভ কী। ভালো খবর হলো, রোববার দুপুরে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাঁচজনের বাইরে আর কারও করোনা ধরা পড়েনি। যে পাঁচজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাঁদের তিনজন সুস্থ হয়ে গেছেন।

পণ্যের নাম (এইচএস কোড)

মোট আমদানি

চীনের অংশ

সুতা ও সমজাতীয় (৫২)

৫২০

৫৪%

বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম (৮৫)

৪০৩

৫৪%

কৃত্রিম তন্তু (৫৪)

১৭২

৬৯%

বস্ত্র (৬০)

১২৯

৭৪%

ইস্পাতের পণ্য (৭৩)

১০১

৫৭%

জুতা ও জুতার উপকরণ (৬৪)

১৬

৭৫%

বিশেষ বস্ত্র (৫৮)

২৯

৬৫%

রাসায়নিক (২৮)

১১

৫৮%

বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন