default-image

আর্থিক ব্যবস্থায় সাইবার হামলার ঝুঁকি বাড়ছে, এটি প্রতিরোধে বিশ্ব সম্প্রদায়কে অবশ্যই একজোট হয়ে কাজ করতে হবে বলে মনে করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ। সম্প্রতি আর্থিক খাতের ক্রমবর্ধমান সাইবার হামলার ঝুঁকি নিয়ে ওয়েবসাইটে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। ‘দ্য গ্লোবাল সাইবার থ্রেট’ নামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাইবার হামলার কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বড় আকারের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, এটাই এখন সর্বজনবিদিত। সাইবার হামলা হতে পারে বা কখন হবে, এই ধরনের আলোচনা আর এখন নেই।

প্রতিবেদনের শুরুতেই, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাইবার হামলার ঘটনা সেটি। আলোড়ন তুলেছিল সারা বিশ্বে। সুইফটের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে হ্যাকাররা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি করে। এর মধ্যে ফিলিপাইনে যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার আজও ফিরে পায়নি বাংলাদেশ।

বিশ্বব্যাপী ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে লেনদেন করতে সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টার ব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন বা সুইফট ব্যবহার করে। বিশেষ ধরনের বার্তা প্রেরণের মাধ্যমে এই লেনদেন করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকে সুইফট বার্তার মাধ্যমে অর্থ হস্তান্তরের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আটজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের (এবিডি) আওতাধীন একটি কক্ষে (যাকে ব্যাক-অফিস বলা হয়) এই বার্তা লেনদেন চলে। এটি বিশেষ একটি সংরক্ষিত জায়গা। অথচ সেখানেই দুর্বলতা খুঁজে নিয়েছিল হ্যাকাররা। এরপর দেশে দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে।

বিজ্ঞাপন

সাধারণ সময়ই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাইবার চুরির ঝুঁকিতে থাকে। করোনার সময়ে অনলাইনে লেনদেন বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকির পরিমাণ আরও বেড়েছে। প্রতিবেদনে ঝুঁকির দুটি দিক তুলে ধরা হয়েছে। এক, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা একটি অভূতপূর্ব ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা করোনার কারণে আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।

ব্যাংকগুলো প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে, প্রযুক্তি সংস্থাগুলো ব্যাংকগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। মহামারির কারণে অনলাইন আর্থিক পরিষেবার চাহিদা আরও বেড়েছে এবং ঘরে বসে কাজ করার ব্যবস্থা নতুন স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা সাইবার হামলার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। দুই, আগে কখনো অনলাইনে লেনদেন করেনি এমন সব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি করোনায় অনলাইন লেনদেনের আওতায় এসেছে। হ্যাকারদের জন্য তারা সহজ শিকার। ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর সেটেলমেন্ট জানাচ্ছে, এই মুহূর্তে স্বাস্থ্য খাতের পর আর্থিক খাত সবচেয়ে বেশি সাইবার হামলার ঝুঁকিতে আছে।

সাইবার হামলার মাধ্যমে কেবল অর্থ চুরির ঘটনা ঘটে এমনটা নয়, তথ্য চুরি, গুপ্তচরবৃত্তির মতো ঘটনাও ঘটছে। এমনকি আর্থিক ব্যবস্থাপনার শৃঙ্খলাও নষ্ট করে দিতে পারে হ্যাকাররা। উদ্ভাবন, প্রতিযোগিতা ও মহামারি ডিজিটাল রেভল্যুশন যত বাড়িয়ে দিচ্ছে আর্থিক ব্যবস্থায় তত ঝুঁকির আশঙ্কা বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ আয়ের দেশের চেয়ে মধ্যম ও নিম্ন আয়ের দেশগুলো সাইবার হামলার ঝুঁকিতে বেশি আছে। ২০২০ সালের অক্টোবরে আফ্রিকার দেশ উগান্ডায় এমন একটি সাইবার হামলার ঘটনা ঘটে। করোনায় দেশটির মোবাইল লেনদেনের পরিমাণ বাড়ছিল, এমন অবস্থায় দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল লেনদেনের নেটওয়ার্ক এমটিএন ও এয়ারটেল সাইবার হামলার শিকার হয়। এরপর পরিস্থিতি সামাল দিতে চার দিন কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইবার হামলা প্রতিরোধে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ নিরাপত্তা বিধান করছে, যা ঝুঁকির সাপেক্ষে যথেষ্ট না। বিভিন্ন দেশের সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা একজোট হয়ে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন, যদিও তা এখনো সম্ভব হয়নি। প্রতিবেদনে আর্থিক প্রতিষ্ঠাগুলোর এই ঝুঁকি রোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং অংশীদারদের দায়িত্ব নির্ধারণ করার পরামর্শ দেয় আইএমএফ।

বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন