করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া অর্থনীতিকে টেনে তুলতে বড় ভূমিকা রাখছে দেশের ব্যাংক খাত। এ অবস্থায় প্রণোদনা প্যাকেজ, সুদহার, ইসলামি ব্যাংকিংসহ সার্বিক ব্যাংকব্যবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ওসমান আলী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সানাউল্লাহ সাকিব
default-image

প্রথম আলো: করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরুর আগে ও বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে কেমন পার্থক্য লক্ষ করছেন?

কাজী ওসমান আলী: করোনাভাইরাস আসার আগে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য পুরোদমে চালু ছিল। নতুন নতুন কারখানা স্থাপন হচ্ছিল, ব্যবসা–বাণিজ্য বাড়ছিল। ফলে ব্যাংকিং কার্যক্রমও চাঙা ছিল। করোনা আসার পরও আমরা ব্যাংকিং সেবা পুরোদমে চালু রেখেছি। এ সময় অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী আক্রান্ত হয়েছেন। তবে করোনায় ব্যবসায়িক তৎপরতা অনেক কমেছে। এতে ব্যাংকিং লেনদেনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সম্প্রতি ব্যবসা আবার আগের ধারায় ফিরতে শুরু করেছে। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে করোনা আসার ইঙ্গিত মিলছে। ফলে ব্যবসা–বাণিজ্য ঠিক কত দিনে আগের ধারায় ফিরবে, তা বলা যাচ্ছে না। আমরা গ্রাহকসেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে গত সেপ্টেম্বরে পূর্ণাঙ্গ কল সেন্টার চালু করেছি। ফলে গ্রাহকসেবা আরও বেড়েছে। এ ছাড়া অনলাইন ব্যাংক হিসাব খোলারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রথম আলো: করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে কম সুদের ঋণ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। কেমন সাড়া মিলছে।

কাজী ওসমান আলী: প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণে ভালো সাড়া মিলছে। ঋণের বড় অংশই বিতরণ করা হয়ে গেছে। তবে বড় গ্রাহকেরা ঋণ নিলেও ছোটদের ঋণ দিতে বেগ পেতে হচ্ছে। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, গ্রাহকদের জামানত কম। গ্রাহকদের ব্যবসা সম্পর্কে জানতে হচ্ছে। এ জন্য বুঝেশুনে ঋণ দিতে হচ্ছে। এতে একটু বেশি সময় লাগছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আন্তরিকতা ও পেশাদারত্বের পরিচয় দিতে হবে। কারণ, ব্যাংকের সমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং বিষয় হচ্ছে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা। প্রণোদনা ঋণ যাতে উপযুক্ত গ্রাহকেরা পান, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রণোদনার অপব্যবহার হলে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি বাড়বে।

বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: আপনারা ইসলামি ব্যাংকিং করছেন। বিনিয়োগে কতটা ইসলামি ধারা অনুসরণ করে তা হচ্ছে। লাভ-ক্ষতির ভিত্তিতে ব্যাংকিং করছেন কি?

কাজী ওসমান আলী: আমরা শতভাগ চেষ্টা করে যাচ্ছি। লাভ-ক্ষতির ব্যাংকিং করার চেষ্টা রয়েছে। তবে শরিয়াহ ব্যাংকিং সম্পর্কে অধিকাংশ গ্রাহকের জ্ঞানের স্বল্পতা আছে। তারা এই পদ্ধতিতে ব্যাংকিং করতে চায় না। ফলে ঘুরেফিরে আগের ধারাতেই চলতে হয়। তবে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়লে আমরা ভাগীদার হই। তার ক্ষতির পরিমাণ ঠিক করে আমাদের আয় থেকে তা ভাগাভাগি করি। যদি কোনো শাখার বড় গ্রাহক লোকসানে পড়ে, আর ওই শাখার আমানতকারীদের একটু কম মুনাফা দিতে চাই, তাহলে কেউ রাজি হয় না। এরপরও যদি মুনাফা বেশি হয়, তখন কিছু গ্রাহককে বেশি মুনাফা দেওয়া হয়।

প্রথম আলো: এসআইবিএলের মালিকানা পরিবর্তনের তিন বছর হয়ে গেল। এতে ব্যাংকটিতে কি পরিবর্তন এসেছে?

কাজী ওসমান আলী: পরিবর্তনের পর সব ক্ষেত্রে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। শাখা ও গ্রাহক বেড়েছে। ঘরে বসে হিসাব খোলা যাচ্ছে। বিকাশের গ্রাহকেরা আমাদের এটিএম থেকে টাকা তুলতে পারছেন। ফলে ব্যাংকের সেবা ও মান—সবই বেড়েছে। সামনে কিউআর কোড দিয়ে গ্রাহকেরা ব্যাংকের শাখা থেকে টাকা তোলার সুযোগ পাবেন। এটা বাংলাদেশে আমরাই প্রথম চালু করব। আন্তর্জাতিক রেটিং প্রতিষ্ঠান মুডিস আমাদের ব্যাংকের রেটিং করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের সৌদি আরবে শাখা খোলার অনুমতি দিয়েছে। এখন সৌদি আরবের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি। জেদ্দা ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক পরিচালিত আওকাফ প্রোপার্টিজে ২০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছি, যা দিয়ে তারা বিভিন্ন দেশে বড় অবকাঠামো নির্মাণ করবে।

প্রথম আলো: ২৫ বছরে এসআইবিএলের অর্জন কী?

কাজী ওসমান আলী: দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে যাত্রা করে আমরা এখন দেশের প্রথম সারির ব্যাংক। আমরা শাখা, উপশাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে গ্রাহকসেবা দিচ্ছি। আবার ডিজিটাল মাধ্যমেও গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছি। ফলে করোনার মধ্যে গ্রাহকেরা ঘরে বসেই আমাদের সেবা নিতে পারছেন। ২৫ বছরে এসআইবিএল এখন ৩৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদের ব্যাংক। আমানত আছে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকার এবং বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার কোটি টাকা। সারা দেশে রয়েছে ১৬১টি শাখা, ৫৪টি উপশাখা, ১৩৩টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট, ১৪০টি এটিএম বুথসহ ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও মোবাইল অ্যাপসহ প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার। ফলে আমাদের গ্রাহকসংখ্যা ১৫ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে ডেবিট কার্ডের গ্রাহক প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ও ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক প্রায় ২০ হাজার।

আমরা বিদেশফেরত ব্যক্তিদের জন্য প্রবাসী অগ্রযাত্রা ও প্রবাসী উদ্যোগ নামে দুটি বিশেষ পুনর্বাসন বিনিয়োগ প্রকল্প চালু করেছি। এ ছাড়া ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে টাকা পাঠানোর সেবা চালু করছি। দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল সেন্টারভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের অফশোর ব্যাংকিংয়ের জন্য ১০ কোটি ডলার তহবিলের চুক্তি হয়েছে।

মন্তব্য পড়ুন 0