default-image

মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বলতে চোখের সামনে কী ভেসে ওঠে? বেশির ভাগ সাধারণ মানুষের কাছে এর হয়তো উত্তর নেই। অর্থনৈতিক উন্নয়ন নির্ধারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কোনো দৃশ্যমান সূচক দিয়ে পরিমাপ করা হয় না। তাই সাধারণ মানুষের কাছে তা দুর্বোধ্য থেকে যায়। তাহলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিমাপের সহজ উপায় কী হতে পারে। শহরের রাস্তাঘাট, গণপরিবহন, নদীর পাড়, পার্ক, মানুষের শিষ্টাচারের পাশাপাশি গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা দেখেও একটি দেশ কতটা উন্নতি করল, তা বোঝা যায়। উন্নয়ন পরিমাপে এ নতুন ধরনের ব্যতিক্রমী দৃশ্যমান সূচকের কথা বলছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

অনুন্নত দেশের একজন পর্যটক একটি দেশে ভ্রমণে গিয়ে যা দেখেন, এর সঙ্গে নিজ দেশের উন্নয়নের তুলনা করেন, সেগুলোকেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের দৃশ্যমান সূচক।
অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

গত শনিবার সন্ধ্যায় পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত এক ভার্চ্যুয়াল সংলাপে এমন কিছু নতুন ধরনের সূচক তুলে ধরেন তিনি। সভায় সভাপতিত্ব করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিমাপের একটি সহজ উদাহরণ দেন ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘অনুন্নত দেশের একজন পর্যটক একটি দেশে ভ্রমণে গিয়ে যা দেখেন, এর সঙ্গে নিজ দেশের উন্নয়নের তুলনা করেন, সেগুলোকেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের দৃশ্যমান সূচক। কোনো পর্যটক ভ্রমণের আগে ওই দেশের জিডিপির আকার, প্রবৃদ্ধি কত, মানব উন্নয়ন সূচকে কী অবস্থান—এসব বিষয়ে পড়াশোনা করে যাবেন না। তিনি (পর্যটক) ওই দেশে গিয়ে রাস্তাঘাটে চলাচল করবেন, চারপাশ দেখেই বোঝার চেষ্টা করবেন, দেশটা কতটা উন্নত।’ তাঁর মতে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্য সংযোজন—এসব দিয়ে মানুষ নিজ দেশের উন্নয়ন বুঝতে পারেন না।

বিজ্ঞাপন
default-image
মানুষ নিজেদের যাপিত জীবন দিয়েই উন্নয়ন বোঝেন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। এর সঙ্গে মানুষের বোঝার সংযোগ ঘটাতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

তবে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মানব উন্নয়ন—এসব সূচককে মেনে নিয়ে নতুন এই সূচকের কথা বলছেন। তিনি অর্থনীতিবিদের সমালোচনা করে বলেছেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধির মতো একক সূচকের ওপর অর্থনীতিবিদদের নির্ভরশীলতা বেশি। ‘মানুষ নিজেদের যাপিত জীবন দিয়েই উন্নয়ন বোঝেন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। এর সঙ্গে মানুষের বোঝার সংযোগ ঘটাতে হবে।’ তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া, চীনে যখন তিন দশক ধরে উন্নত হচ্ছিল, তখন ওই দুটি দেশের নাগরিকেরা দেখছিলেন, তাঁদের জীবনমান উন্নত হচ্ছে।

নতুন সূচকগুলো কী

ওয়াহিদউদ্দিন নগরায়ণের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান চারটি সূচকের কথা বলেন তিনি।

  • প্রথমত, শহরের গণপরিবহন সময়সূচি মেনে চলে কি না; ট্রাফিক আইন মেনে চলে কি না; যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করে কি না। উন্নত দেশে এসব চলে নিয়মমাফিক।

  • দ্বিতীয়ত, প্রকাশ্য স্থানে নাগরিকদের শিষ্টাচার দিয়েও উন্নয়ন বোঝা যায়। যেমন যেখানে–সেখানে থুতু ফেলা, গণপরিবহনে নারীর প্রতি আচরণ।

  • তৃতীয়ত, পথচারীদের স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলের জন্য ফুটপাত, গণশৌচাগার—এসব অবকাঠামো পর্যাপ্ত আছে কি না।

  • চতুর্থত, বড় শহরের নদীর পাড়ের নান্দনিক সৌন্দর্য দিয়েও উন্নয়ন পরিমাপ করা যায়। এ ছাড়া শহরের বস্তিবাসীর জন্য বাসের উপযোগী কতটা নাগরিক–সুবিধা আছে, তা–ও দেখতে হবে।

গ্রাম এলাকায় বসতবাড়ির বাহ্যিক রূপ, শৌচাগার, সুপেয় পানির সুবিধা দিয়ে একটি দেশের পল্লি এলাকার উন্নয়ন পরিমাপ করা যেতে পারে। এ ছাড়া আধা শহর-আধা গ্রাম এলাকায় ছাত্রছাত্রীরা যখন স্কুলে যায়, তখন তাদের পোশাক, শারীরিক গঠন দিয়ে দেশের সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করা যায়।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ উন্নয়ন পরিমাপের আরও একটি দৃশ্যমান সূচকের কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘একটি দেশের শিক্ষিত নাগরিকদের স্থায়ীভাবে বিদেশে চলে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কতটা আছে। এটি দিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁদের কতটা আস্থা আছে, তা বোঝা যায়।’

মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিমাপে পরিসংখ্যানগত দুর্বলতা আছে বলে মনে করেন ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। অনানুষ্ঠানিক খাতের মূল্য সংযোজন অনেকাংশে অনুমানভিত্তিক করা হয়।

অনুষ্ঠানের সভাপতি হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, জিডিপি গণনার সময় শুধু মাথাপিছু গড় আয় হিসাব করা হয়। কিন্তু সবচেয়ে গরিব ৪০ শতাংশের মাথাপিছু আয় কত, তা হিসাব করা হয় না। যদি তাদের মাথাপিছু আয় হিসাব করলে গরিব মানুষের পরিস্থিতি আরও বিস্তারিত জানা যেত। তাঁর মতে, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের প্রস্তাবিত ব্যতিক্রমী দৃশ্যমান সূচকগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0