default-image

জীবন না জীবিকা? শুরু হয়ে গেছে এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক। চলছে জীবন আর জীবিকার মধ্যে সংঘাত। অনেকটা রুদ্রের কবিতার সেই লাইনটার মতো, ‘দাঁড়াও, নিজেকে প্রশ্ন করো, কোন পক্ষে যাবে?’

বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ দম্পতি অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও এস্থার দুফলো এক আলাপচারিতায় যেমনটা বলেছেন, ‘এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মানুষের জীবন বাঁচানো, অদূর ভবিষ্যতে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেবে তাদের কাজে ফেরানো। তার পরবর্তী সময়ের সমস্যা, স্বাভাবিক অর্থনীতিতে ফিরে যাওয়া। আজ আমরা প্রাণ বাঁচাতে যা করছি, তার পরিণাম বড় হতে হতে যেন ভবিষ্যতে জীবিকা হারানোর কারণ হয়ে না দাঁড়ায়, তা দেখতে হবে।’

তবে আরও বেশি ডালপালা ছড়ানোর আগেই এই বিতর্ক বন্ধ করার একটি যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস এবং আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা যৌথ নামে একটি লেখা প্রকাশ করেছেন। লেখাটির শিরোনামই হচ্ছে, ‘জীবন রক্ষা না চাকরি রক্ষা—এটা একটি মিথ্যা উভয়সংকট’। দুই সংস্থার এই দুই প্রধান বলেছেন, আসলে দুটোই একসঙ্গে চালিয়ে যেতে হবে। এ জন্য উঠতি ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর নীতিনির্ধারকদের কাছে বিশেষভাবে আহ্বান জানিয়ে তাঁরা বলেছেন, জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং মানুষকে কর্মে ফিরিয়ে আনার কাজটি একই সঙ্গে করতে হবে, একটির আরেকটি বিকল্প হিসেবে নয়।

মন্দায় অর্থনীতি

তবে জীবন ও জীবিকাকে একসঙ্গে বাঁচানোর কাজটি সহজ হবে না। আইএমএফ বলেই দিয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার মধ্যে ঢুকে গেছে। আর জীবন বাঁচাতে ঘরে বসে থাকার সময় যত দীর্ঘ হবে, অর্থনৈতিক সংকট তত বাড়তে থাকবে। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ও লিখেছেন, ‘আন্দাজ হয়, ছয় মাস এই যুদ্ধ চলবে, হয়তো খুব বেশি প্রাণক্ষয় হবে না। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির পতন হবে। ধনী দেশগুলো বাইরে থেকে কেনা বন্ধ করে দেবে। আমরা এক বিপুল মন্দা দেখব। শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে। মধ্যবিত্তের আয় কমেছে। এই সময়ের পরে ক্রেতারা উৎসাহের সঙ্গে জিনিসপত্র কিনবে, তার আশা কম।’

অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে ভোক্তারা কেনাকাটা কমিয়ে দেয়। কারণ, এ সময় আয় কমে যায়, চাকরি চলে যায় এবং সামনের দিনে আরও চাকরি চলে যেতে পারে—এই আশঙ্কাও থাকে। মানুষ হাতে থাকা অর্থ খরচ করতে চায় না বলে সামগ্রিক চাহিদায় ধস নামে। ফলে নতুন বিনিয়োগ কমে যায়, নতুন চাকরিও তৈরি হয় না। তখন মন্দা আরও তীব্র হয়। এ রকম এক সময়ে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের হাতে টাকা রাখার ব্যবস্থা করা। বিভিন্ন দেশ তাই এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থের তহবিল গঠনের ঘোষণা দিচ্ছে।

কী করতে হবে

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আইএমএফের দুই প্রধান তাঁদের লেখায় পরিষ্কারভাবে বলেছেন, সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হচ্ছে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ। চিকিৎসক ও নার্সদের বেতন-ভাতা, সহায়ক হাসপাতাল ও জরুরি কক্ষ তৈরি, দ্রুত বানানো ও স্থানান্তর করা যায় এমন ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা, সব ধরনের নিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবস্থা করা এবং নিয়মিত হাত ধুতে হবে এমন অতিসাধারণ সচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়ে যাওয়া—এসবই হচ্ছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিনিয়োগ। আর জীবিকা বাঁচাতে প্রয়োজন লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা প্রদান। এর মধ্যে থাকবে নগদ সহায়তা, বেতনে ভর্তুকি, স্বল্পমেয়াদি কাজের ব্যবস্থা করা, বেকারদের জন্য কর্মসূচি তৈরি এবং ঋণ করার ব্যয় কমানো। আবার যেসব দেশে অনানুষ্ঠানিক খাত বড়, যাদের জীবিকা প্রতিদিনকার মজুরির ওপর নির্ভরশীল, সেসব দেশে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কেননা, সেখানে সামাজিক দূরত্ব পালন করে যাওয়া কঠিন একটি কাজ।

বাংলাদেশে মোট শ্রমশক্তির বড় অংশই কাজ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে। সুতরাং বিপর্যয় ও মন্দার এই সময়ে কাদের বিশেষ সহায়তা লাগবে এবং কী ধরনের সহায়তা লাগবে, সে পরিকল্পনা তৈরি করা হবে প্রথম কাজ। তা ছাড়া, কেবল রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল অর্থনীতিকে চাঙা করতে পারবে না। কাদের সহায়তা দেওয়া হবে, এই কাজটি ঠিক করার পর দুটি প্রশ্নের সমাধান করতে হবে। যেমন অর্থ আসবে কোথা থেকে এবং সেই অর্থ সঠিক মানুষটির কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া কী হবে।

যে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে, তা সংগ্রহ করা খুব সহজ হবে না। বাজেট কাটছাঁট বা কৃচ্ছ্রসাধন থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ পাওয়া যাবে না। তবে জ্বালানি তেলের দামে ধস নামায় সরকারের কিছু অর্থের সাশ্রয় হবে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশেষ তহবিল গঠন করেছে। সেখান থেকে কিছু অর্থ পাওয়া যাবে। এর বাইরে বিশ্বব্যাপীই অর্থনীতিবিদেরা এখন টাকা ছাপানোর সুপারিশ করছেন। তবে অবশ্যই তা মূল্যস্ফীতিকে বিবেচনায় নিয়ে। নোবেল বিজয়ী অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ও ভারত সরকারকে টাকা ছাপানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

কত টাকা লাগবে

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, করোনা পুনরুদ্ধারে সব মিলিয়ে বাংলাদেশে ৫০ হাজার কোটি টাকা লাগতে পারে, যা জিডিপির ২ শতাংশের সমান। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের মতো দেশ তাদের জিডিপির ১১-১২ শতাংশের মতো পুনরুদ্ধার কর্মসূচিতে অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে।

আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, করোনার কারণে প্রায় এক কোটি লোক বেকার হয়ে গেছেন বা যাচ্ছেন। তাঁদের ৩-৪ মাস খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ দেশে খাদ্যসংকট হবে না। কিন্তু খাবার কেনার সামর্থ্য থাকবে না অনেক মানুষের। আর বাবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রপ্তানি খাত ছাড়াও ছোট ছোট অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে। ইতিমধ্যে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। রেস্তোরাঁ, দোকান, সেলুন এমন ধরনের ছোট ব্যবসায়ীদের আপাতত তিন মাস ভাড়ার অর্ধেক দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে। এতে তাঁরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন, ব্যবসা গুটিয়ে যাবেন না।

আহসান এইচ মনসুরের আরও সুপারিশ হচ্ছে, সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। বড় ব্যবসায়ীদেরও অংশীদারির ভিত্তিতে তহবিল দিতে পারে সরকার। এ ধরনের উদ্যোগ ২০০৮ সালের মন্দার সময় যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছিল। বহু প্রতিষ্ঠানে তহবিল দিয়ে শেয়ারের মালিক হয়েছিল। সার্বিকভাবে সরকারকে বাজেটের বাইরে গিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজের কথা চিন্তা করতে হবে, যা হবে ঘাটতি অর্থায়ন। কারণ, বরাদ্দ কমিয়ে বাজেটের টাকা এদিক–সেদিক করে এই পুনরুদ্ধার কর্মসূচি নেওয়া যাবে না। তাঁর মতে, টাকা ছাপিয়ে সরকার বাজারে তারল্য জোগান দিতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংকের কাছ থেকে নিলামের মাধ্যমে বন্ড কিনে নেবে। নতুন টাকা ছাপিয়ে ওই সব বন্ডের অর্থ পরিশোধ করলে ব্যাংকগুলোর কাছে টাকার সরবরাহ বাড়বে। এ ক্ষেত্রে নিলামের মাধ্যমে বন্ড বিক্রি হলে ব্যাংকগুলো বেশি রেট চাইবে। এটি সার্বিকভাবে বাজারে সুদের হার কমাতে সহায়তা করবে। প্রাথমিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে এই প্রক্রিয়ায় বাজারে টাকা ছাড়তে পারে। এটিও এই সংকট সময়ে বাজারে তারল্যের জোগান ঠিক রাখতে পারে। 

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন