করোনার কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা। এখন তাঁরা চরম তহবিল-সংকটে রয়েছেন। তবু ঘুরে দাঁড়াতে প্রাণপণ চেষ্টা করে চলেছেন। এসব নিয়ে বলছেন রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও স্থানীয় মোতাহার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আরিফুল হক।
default-image

প্রথম আলো: এই শীতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কথা শোনা যাচ্ছে, তাহলে রংপুরে ব্যবসার অবস্থা কেমন দাঁড়াবে মনে করছেন?

মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী: যদি করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়, তাহলে ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখা কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। কোভিডের প্রথম ঢেউ থেকে শিক্ষা নিয়ে ও পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সরকারকে দ্রুত রোডম্যাপ তৈরি করে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

রংপুরের ব্যবসা-বাণিজ্যে করোনা কেমন প্রভাব ফেলছে?

মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী: করোনার প্রভাবে দোকানপাট ও বিপণিবিতানে বেচাকেনা একেবারেই কমে গেছে। ক্রেতাসংকটের কারণে দোকানের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে আর মাসিক ভাড়া পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন রংপুরের ব্যবসায়ীরা।

বিজ্ঞাপন

রংপুরের অর্থনীতি কৃষিপ্রধান। স্বাভাবিক সময় যেখানে কৃষকেরা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান না, সেখানে করোনাকালে অন্যান্য জেলায় সরবরাহ বন্ধ ছিল। তাঁদের ক্ষতি সম্পর্কে কী বলবেন?

মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী: কৃষকদের মূল সমস্যা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া। এটি সমাধানে পণ্য সরবরাহ চেইন এবং বিদ্যমান বাজারব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীনির্ভর প্রাচীন বাজারব্যবস্থার পরিবর্তে সরকারকে এমন পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে কৃষকেরা উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য পান। করোনার কারণে দোকানপাট ও আড়ত বন্ধ থাকায় বাইরের জেলায় পণ্য যায়নি। তাই অনেক শাকসবজি ও দুধ নষ্ট হয়েছে। ফলে রংপুরের চাষিরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাই সরকার প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় কৃষকদের জন্য ৪ শতাংশ সুদে যে ঋণ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে, সেটির সদ্ব্যবহার হলে কৃষি খাতের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি।

রংপুরের ব্যবসায়ীদের সরকারি প্রণোদনা পেতে কি কোনো সমস্যা হচ্ছে? এ ক্ষেত্রে জেলা চেম্বার কী ভূমিকা পালন করছে?

মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যবসায়ীদের জন্য ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশনা দিলেও সেভাবে সুবিধা পাননি রংপুরের ব্যবসায়ীরা। তাই আমরা চেম্বারের পক্ষ থেকে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যে দ্রুত প্রণোদনার অর্থ বিতরণের অনুরোধ জানিয়ে আসছি। ফলে ব্যবসায়ীরা সুফল পেতে শুরু করেছেন।

করোনা-পরবর্তী সময়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কীভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন?

মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী: করোনার মধ্যেই কলকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ফলে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসায়ীরা তাঁদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন, আবার ঘুরে দাঁড়াতে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। তবে উদ্যোক্তারা তহবিল-সংকটে পড়ে ব্যবসা ছেড়ে পালানোর মতো অবস্থায় রয়েছেন।

করোনা পরিস্থিতিতে জেলার নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে আপনাদের ভাবনা কী?

মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী: রংপুরের নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাংক লেনদেন একেবারেই নেই। সে ক্ষেত্রে প্রণোদনা তাঁদের কাছে কীভাবে পৌঁছাবে, সেটি একটি বিরাট সমস্যা। তাই রংপুরের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিকল্প ফিন্যান্সিংয়ের ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি।

বিজ্ঞাপন

করোনা সংকট থেকে রংপুরের ব্যবসায়ীদের মুক্তির উপায় কী?

মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী: করোনায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। কেননা ক্ষুদ্র ব্যবসা একবার বন্ধ হয়ে গেলে পুনরায় শুরু করা খুবই কঠিন। ব্যবসায়ে নগদ অর্থের সংকট এখন প্রকট। বর্তমান সময়টিও অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। এ প্রেক্ষাপটে অনেক উদ্যোক্তাই আছেন, যাঁরা ব্যবসায়ে টিকে থাকতে পারছেন না। এসব উদ্যোক্তাকে টিকিয়ে রাখতে হলে তাঁদের নগদ অর্থের জোগান দিতে হবে। তাই সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ দ্রুত ছাড় করতে হবে।

রংপুর একটি পুরোনো জেলা হলেও তেমন কোনো শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। এ ব্যাপারে আপনাদের ভাবনা কী?

মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী: পিছিয়ে পড়া রংপুর অঞ্চলের অর্থনীতিকে চাঙা করতে হলে শিল্পায়নের বিকল্প নেই। কারণ, হাতে গোনা দু-চারটি ক্ষুদ্র শিল্প ছাড়া রংপুরে শিল্প বলতে কিছুই নেই। দীর্ঘদিনের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে রংপুর পিছিয়ে আছে। তাই রংপুর বিভাগে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে আলাদা শিল্প ও ঋণনীতি, কর ও ভ্যাটনীতি প্রণয়ন এবং ট্যাক্স হলিডের মেয়াদ বৃদ্ধি করা একান্ত জরুরি। তবে আশার কথা, ঢাকা-এলেঙ্গা-রংপুর মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ শুরু হয়েছে। বগুড়া-রংপুর-সৈয়দপুর গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণকাজ ২০২২ সালে শেষ হলে রংপুর অঞ্চলে শিল্পবিপ্লব ঘটবে বলে আমরা আশা করছি।

প্রথম আলো: করোনা সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকারের কাছে আপনাদের কোনো দাবি আছে?

মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী: সরকারকে কমপ্রিহেনসিভ পলিসি (সমন্বিত নীতিমালা) গ্রহণ করতে হবে। সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ দ্রুত ছাড় করে নগদ অর্থ প্রবাহের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এ ছাড়া রংপুরের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে আলাদা নীতিসহায়তা প্রদানের দাবি জানাচ্ছি।

মন্তব্য পড়ুন 0