বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সজাগ কোয়ালিশন হচ্ছে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট), ক্রিশ্চিয়ান এইড ও নারীপক্ষের একটি যৌথ উদ্যোগ। ‘করোনাকালে পোশাকশিল্পের চ্যালেঞ্জ ও শ্রমিকের সুরক্ষা’ শিরোনামের এই আলোচনা সভায় বলা হয়, করোনা মহামারির মধ্যে পোশাক কারখানার শ্রমিকের কথা মাথায় রেখে সরকার বিশেষ প্রণোদনা দিলেও কিছু ক্ষেত্রে তা শ্রমিকের কাছে কম পৌঁছেছে। শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধ করে দেওয়া যাবে না, এমন শর্তে ওই প্রণোদনা দেওয়া হলেও অনেক কারখানা সরকারি প্রণোদনা নেওয়ার পর সেই সব শর্ত মানেনি। বক্তারা বলেন, দেশে করোনাকালে পোশাকশিল্প খাতে চার লাখের মতো কর্মী তাঁদের কাজ হারিয়েছেন। এ ছাড়া বহু পোশাক কারখানায় এখনো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রেও ঢিলেঢালা ভাব চলে এসেছে বলে তাঁরা অভিযোগ করেন।

সভায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ঢাকা) এ কে এম সালাউদ্দিন জানান, করোনাকালে কিছু সময় পূর্ণ লকডাউন, তথা বিধিনিষেধ ছিল। ওই সময় পোশাক কারখানাসহ সবকিছুই বন্ধ ছিল। এই অবস্থায় মালিকপক্ষ শ্রমিকের বেতন পরিশোধ করতে পারবে না জানালে সরকার বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করে। এ ছাড়া অন্যান্য সময়ে বিধিনিষেধের মধ্যে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের শর্তে পোশাক কারখানা খোলার অনুমতি দেওয়া হয়। ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেছে কারখানাগুলো। শুধু দূরে থাকা শ্রমিকদের কারখানায় নিজস্ব ব্যবস্থায় পরিবহনের কথা বলেও কিছু কারখানা সেই শর্ত পূরণ করতে পারেনি।

এ কে এম সালাউদ্দিন আরও বলেন, অধিদপ্তর মালিক নয়, শ্রমিককেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। গত এক বছর শ্রমিকদের অভিযোগ লিপিবদ্ধ করার জন্য একজনকে নিয়োজিত রেখেছে অধিদপ্তর। মাঠপর্যায়ে গিয়ে কারখানা পরিদর্শন করা হয়েছে, যাতে প্রণোদনা পাওয়া কোনো কারখানা শ্রমিক ছাঁটাই না করে বা কারখানা বন্ধ করে না দেয়। অল্পসংখ্যক কারখানা প্রণোদনা নেওয়ার পরও আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সেই সব কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। পর্যাপ্ত না হলেও শ্রমিকেরা প্রণোদনার সুবিধা পেয়েছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

প্রণোদনা অনেক শ্রমিককে কোনো সুরক্ষা দিতে পারেনি। ন্যূনতম সুবিধা না দিয়েই চাকরিচ্যুত করা হয়েছে অনেক শ্রমিককে। এ ছাড়া পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য কারখানাগুলোই শুধু প্রণোদনা পেয়েছে।
বরকত আলী, উপপরিচালক, ব্লাস্ট।

কারখানা–সংক্রান্ত যেকোনো কমিটিতে শ্রমিক প্রতিনিধি রাখার ওপর জোর দিয়ে ফেডারেশন অব গার্মেন্টস ওয়ার্কারের সাধারণ সম্পাদক চায়না রহমান বলেন, এতে শ্রমিকের স্বার্থরক্ষা হবে। করোনাকালে কাজ হারানো শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য দিয়ে তিনি জানান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর করোনাকালে শ্রম খাত সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে। করোনার শুরুতে দেখা গেছে, কিছু মালিকপক্ষের কারণে জীবিকা বাঁচাতে কীভাবে শ্রমিকেরা দীর্ঘ পথ হেঁটে কারখানায় ফিরে আসতে বাধ্য হন।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) উপপরিচালক (আইন) বরকত আলী বলেন, প্রণোদনা অনেক শ্রমিককে কোনো সুরক্ষা দিতে পারেনি। ন্যূনতম সুবিধা না দিয়েই চাকরিচ্যুত করা হয়েছে অনেক শ্রমিককে। এ ছাড়া পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য কারখানাগুলোই শুধু প্রণোদনা পেয়েছে। এর বাইরেও অনেক কারখানা রয়েছে। করোনাকাল দেখিয়েছে, শ্রমিকের সুরক্ষায় আইনে আলাদা বিধান থাকা কতটা জরুরি। ২৫টি আইন একত্র করে শ্রম আইন করা হলেও এতে দুর্যোগকালে শ্রমিকের সুরক্ষা কী হতে পারে, তা স্পষ্ট করা নেই। দুর্যোগে মালিকপক্ষ শ্রমিকের কতটা পাশে থাকবে, সরকার কী পদক্ষেপ নেবে এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোরই–বা কী ভূমিকা থাকবে, সে ব্যাপারে যার যার জায়গা থেকে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ও এর বাস্তবায়নের বিষয়গুলো আইনে থাকা প্রয়োজন।

পোশাক কারখানার শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন নারীপক্ষের সদস্য রওশন আরা। তিনি বলেন, প্রণোদনা শ্রমিকের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তথ্য–উপাত্ত নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করা হবে এবং সুপারিশ তুলে ধরা হবে। করোনা পরিস্থিতি এখনো শেষ হয়নি, এর মধ্যেই বিভিন্ন কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে ঢিলেঢালাভাব চলে এসেছে বলে জানা গেছে। কোভিডের সময়ে শ্রমিকের অভিযোগ শোনার জন্য যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সে তথ্য আরও বেশি করে ছড়িয়ে দিতে হবে। সবার সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই শ্রমবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন