default-image

দুই বছর আগেও বিশ্বব্যাংকের সহজে ব্যবসা পরিচালনা সূচকে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের চেয়ে খারাপ অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। ব্যবসায়ীরা তখন প্রকাশ্যেই বিষয়টি লজ্জাকর বলেছিলেন। এরপর সরকারের তরফ থেকে অনেক রকমের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। অঙ্গীকার ছিল অনেক, কিন্তু অর্জন সামান্যই। আগে বাংলাদেশ ছিল ১৯০ দেশের মধ্যে ১৭৬তম, এখন ১৬৮তম। একমাত্র কৃতিত্ব আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলা।

এমনিতেই ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার পরিবেশ নিয়ে উদ্যোক্তাদের অনেক অভিযোগ। কাগজে-কলমে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হলেও বাস্তবে পাওয়া যায় সামান্যই। গত এক দশকে যে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রায় স্থবির হয়ে আছে, তার বড় কারণ ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনায় সহায়ক পরিবেশের ঘাটতি। ফলে প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী সব দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণও অনেক কম।

করোনার প্রথম ধাক্কা সামলে যখন অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, তখনই দ্বিতীয় ঢেউয়ের তীব্র ধাক্কা। সন্দেহ নেই, এতে দেশের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন। বিনিয়োগ পরিবেশ ও করকাঠামো নিয়ে ক্ষোভ আগে থেকেই ছিল। তবে প্রত্যাশা ছিল কঠিন এ সময়ে এসব বিষয়ে জোরালো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কিন্তু সে রকম কিছু হয়নি।

করোনায় অর্থনীতির বিপর্যয়

এর মধ্যেই আবার করোনার হানা। সরকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা দিয়েছে ঠিকই, তবে এর প্রায় পুরোটাই ব্যাংকঋণনির্ভর। একের পর এক ব্যাংক খোলা হলেও দেশের বেশির ভাগ মানুষ এখনো ব্যাংকের আওতার বাইরে। ফলে প্রণোদনার ঋণের বেশির ভাগই পাচ্ছেন বড় ও প্রভাবশালীরা। করোনার এই মহামারির সময়ে বিশ্বের প্রায় সব দেশই প্রণোদনা দিচ্ছে। অন্য সব দেশের প্রণোদনা তহবিলের অন্যতম উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষ বা ভোক্তার হাতে নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়া, যাতে অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা বজায় থাকে। কেননা চাহিদা থাকলেই উৎপাদন বাড়বে, বিনিয়োগ হবে, তাতে কর্মসংস্থানও ধরে রাখা যাবে।

বিজ্ঞাপন

করোনার প্রথম ধাক্কা সামলে যখন অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, তখনই দ্বিতীয় ঢেউয়ের তীব্র ধাক্কা। সন্দেহ নেই, এতে দেশের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন। বিনিয়োগ পরিবেশ ও করকাঠামো নিয়ে ক্ষোভ আগে থেকেই ছিল। তবে প্রত্যাশা ছিল কঠিন এ সময়ে এসব বিষয়ে জোরালো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কিন্তু সে রকম কিছু হয়নি। এ অবস্থায় দেশের ব্যবসায়ীদের অন্যতম প্রভাবশালী সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর তীব্র ভাষায় নিজের ক্ষোভের কথাই জানালেন। তাঁর বক্তব্য যথেষ্ট আলোড়নও তুলেছে।

বাংলাদেশের করব্যবস্থা চূড়ান্তভাবে ব্যবসাবৈরী। এ কারণে ব্যবসা বন্ধ করেই দেওয়া উচিত। আমরা যারা বাংলাদেশে ব্যবসা করি, আমরা কাল থেকে কান ধরে ছেড়ে দিতে চাই।
সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর যা বললেন

গত শনিবার এক সেমিনারে তিনি বললেন, ‘বাংলাদেশের করব্যবস্থা চূড়ান্তভাবে ব্যবসাবৈরী। এ কারণে ব্যবসা বন্ধ করেই দেওয়া উচিত। আমরা যারা বাংলাদেশে ব্যবসা করি, আমরা কাল থেকে কান ধরে ছেড়ে দিতে চাই।’ এ নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার আবারও কথা হলো সৈয়দ নাসিম মঞ্জুরের সঙ্গে। প্রশ্ন ছিল, ঠিক কোন পরিস্থিতিতে তাঁকে এভাবে বলতে হলো। খুব শঙ্কা নিয়ে তিনি বললেন, ‘ডিমান্ড ইজ ডায়িং। অর্থাৎ চাহিদা কমে যাচ্ছে। মানুষ এখন নিত্যপণ্য আর চিকিৎসাসামগ্রী ছাড়া আর কিছু তেমন কিনতে চাচ্ছে না। সারা বিশ্বেই এ অবস্থা। বাংলাদেশ যে ধরনের পণ্য বেশি রপ্তানি করে, তা নিত্যপণ্য না। এখন দামের চাপ আসছে। বিক্রি করতে হলে দাম কমিয়ে দিতে হবে। সুতরাং রপ্তানি ধরে রাখতে হলে দাম না কমালে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাবে না, টিকে থাকতে পারছি না।’

ব্যবসাবৈরী করব্যবস্থা

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুরের বড় অভিযোগ করব্যবস্থা নিয়ে। এবার দেখা যাক দেশের করব্যবস্থা কতটা ব্যবসাবৈরী। এমনিতেই দক্ষিণ এশিয়ায় করপোরেট কর সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। সরাসরি আয়কর আদায়ের সক্ষমতাও সবচেয়ে কম জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)। মোট আয়করের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে উৎসে ও অগ্রিম কর হিসেবে।

এর মানে,

  • আয়-ব্যয় হিসাব করার আগেই ব্যবসা শুরু বা পরিচালনা পর্যায়ে উৎসে ও অগ্রিম করের নামে বিপুল অর্থ কেটে রাখা হয়, যা ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দেয়, প্রতিষ্ঠানগুলোর নগদ অর্থের প্রবাহ কমিয়ে দেয়।

  • আবার যদি বার্ষিক লেনদেন বা টার্নওভার ৩ কোটি টাকার বেশি যদি হয়, তাহলে লোকসান হলেও দশমিক ৫ শতাংশ হারে কর দিতেই হবে।

  • কাঁচামাল বা অন্য পণ্য আনলে, আমদানি পর্যায়ে ৪ শতাংশ আগাম ভ্যাট দিতে হয়। এই ভ্যাট ফেরত পাওয়ার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশের রীতি হচ্ছে, যাঁরা নিয়ম মেনে কর দেন, তাঁদের ওপর চাপ বাড়তেই থাকে। যাঁরা দেন না, তাঁরা আরাম-আয়েশে জীবন কাটিয়ে দেন।

স্বাভাবিক সময়ে করের এই বোঝা মেনে নিয়েই হয়তো সবাই ব্যবসা পরিচালনা করেন। আবার অনেকে এসব ঝামেলায় যান না। নানা ফন্দি করে কর ফাঁকি দেন, ধরাও পড়েন না। এসব অর্থের বড় অংশ অন্য দেশে পাচার হয়, আর কালোটাকা অবাধে সাদা করার সুযোগ তো থাকেই। বাংলাদেশের রীতি হচ্ছে, যাঁরা নিয়ম মেনে কর দেন, তাঁদের ওপর চাপ বাড়তেই থাকে। যাঁরা দেন না, তাঁরা আরাম-আয়েশে জীবন কাটিয়ে দেন।

আবার কর দেওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি কমাতে সেই নব্বইয়ের দশক থেকে অটোমেশন ব্যবস্থার নানা প্রকল্প নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একমাত্র ব্যক্তিশ্রেণির টিআইএন গ্রহণ ছাড়া অন্য কোনো সুবিধাই স্বয়ংক্রিয় হয়নি। অনলাইনের ভ্যাট রিটার্ন দেওয়ার ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রিন চ্যানেলের মতো সুবিধা দেওয়ার জন্য অথরাইজ ইকোনমিক অপারেটর (এইও) ব্যবস্থাও নিয়মিত করা যায়নি। সব মিলিয়ে করকাঠামো নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই।

বিজ্ঞাপন

বিপাকে আছে সংবাদপত্রশিল্প

হয়তো করোনার কারণেই বিনিয়োগ পরিবেশ ও করকাঠামোর এসব অসংগতি নিয়ে ব্যবসায়ীরা এখন বেশি সোচ্চার হচ্ছেন। কারণ, মহামারির এই সময়ে সারা বিশ্বেই ওষুধ কোম্পানি, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ও তথ্যপ্রযুক্তিসেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রায় সবাই চরম বিপাকে। সংবাদপত্রশিল্পের কথাই ধরা যাক। মহামারির সময়ে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এ কাজটি যাঁরা করেন, তাঁরা বিপর্যয়ের মধ্যে আছেন।

এনবিআর যদি কর সংগ্রহকারী হিসেবে থাকে এবং সারা জীবন শুধু বলে “শুনছি”, কিন্তু বাস্তবে কোনো প্রতিফলন না দেখি, তার মানে বাংলাদেশে আপনারা কোনো বিনিয়োগ চান না।
সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার

দেশে এখন সংবাদপত্রের কাঁচামাল কাগজের আমদানিতে শুল্ক ৫ শতাংশ, পাশাপাশি ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ অগ্রিম করসহ সব মিলিয়ে দিতে হয় ২৫ শতাংশ কর। এ ছাড়া ব্যবসা হোক বা না হোক, এ শিল্পের করপোরেট করহার ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে করোনার কারণে সংবাদপত্র প্রকাশের খরচ মেটানোই অসাধ্য হয়ে পড়েছে। সরকার ঘোষণা দিলেও সেবা শিল্প হিসেবে সংবাদপত্র কোনো সহযোগিতা পায়নি। সংবাদপত্রশিল্প বাঁচাতে এ জন্য বহুদিন ধরেই সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) এনবিআরের সহায়তা চেয়ে আসছে।

এ প্রসঙ্গে সৈয়দ নাসিম মঞ্জুরের গত শনিবারের সেমিনারে বলা আরেকটি বক্তব্য তুলে ধরা যায়। তিনি বলেছিলেন, ‘এনবিআর যদি কর সংগ্রহকারী হিসেবে থাকে এবং সারা জীবন শুধু বলে “শুনছি”, কিন্তু বাস্তবে কোনো প্রতিফলন না দেখি, তার মানে বাংলাদেশে আপনারা কোনো বিনিয়োগ চান না। বলে দেন, আমরা বন্ধ (কারখানা) করে ট্রেডার হয়ে যাই। কারণ, ট্রেডিং ব্যবসা ভালো। উৎপাদন করে এই মরার খাটুনি যুক্তিসংগত নয়।’

এখন সংকট জীবন ও জীবিকার। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে নীতিনির্ধারকেরা ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বৈঠকও কি করেছেন? একবারও কি জানতে চাওয়া হয়েছে ব্যবসায়ীরা কী চান?

ব্যবসায়ীদের কথা শুনুন

তাহলে কী করতে হবে—এ প্রশ্নটাই করেছিলাম সৈয়দ নাসিম মঞ্জুরকে। তিনি বললেন, ‘আমাদের সমস্ত লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে। লুকানোর কিছু নেই। সবাই কমবেশি লোকসানে। অথচ অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। এটা আয়ের ওপরে কর। আয়ই নেই, অথচ আয়ের ওপর ঠিকই কর দিতে হচ্ছে। বিশেষ এই সময়ে কি ছয় মাসের জন্য অগ্রিম আয়করে রেয়াত দেওয়া যেত না?’

এখন সংকট জীবন ও জীবিকার। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে নীতিনির্ধারকেরা ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বৈঠকও কি করেছেন? একবারও কি জানতে চাওয়া হয়েছে ব্যবসায়ীরা কী চান? ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কী ধরনের আর্থিক ও নীতিসহায়তা চান—তাঁদের মুখ থেকে কি শুনতে চাওয়া হয়েছে? জীবিকা বাঁচানোর ক্ষেত্রে ২০২০ সালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ২০২১ সালে ভিন্ন কিছু কি করা হয়েছে? এমনিতে অন্যের কথা শোনা বা পরামর্শ নেওয়ার সংস্কৃতি বিদায় নিয়েছে অনেক আগেই। শাহ এ এম এস কিবরিয়ার সময়েও অর্থনীতি বিষয়ে একটি পরামর্শক কমিটি ছিল, নিয়মিত বৈঠকও হতো। করোনার এই সংকটে সে রকম কিছু কি হতে পারত না?

সময় কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। আরেকটি নতুন বাজেট আসছে। সুতরাং এখনো সুযোগ আছে। সুযোগটি নীতিনির্ধারকেরা নেবেন কি না, সেটাই এখন প্রশ্ন।

বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন