default-image

কোভিড-১৯-এর কারণে বিশ্বজুড়েই পারিবারিক ব্যবসায় টান পড়েছে। পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি দুটোই কম হয়েছে। ফলে সার্বিকভাবে ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি কমেছে। বাংলাদেশের পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও কোভিডের এ রকম প্রভাব পড়েছে। তবে বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি অবশ্য মিশ্র। কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ইতিবাচক চিত্রও আছে।

গতকাল মঙ্গলবার রাতে বিশ্বখ্যাত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রাইসওয়াটারহাউসকুপারসের (পিডব্লিউসি) প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক পারিবারিক ব্যবসায় জরিপ ২০২১’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। পিডব্লিউসি দুই বছর পরপর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। জরিপে ২০১৯ সালের পর এবারে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের মতামত নেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

জরিপে ৮৭টি দেশের ২ হাজার ৮০১ জন ব্যবসায়ী অংশ নেন। এর মধ্যে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ৫৪ জন। এতে যেসব দেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবসায়ী অংশ নেন: ইউরোপে জার্মানির ১৭৪, উত্তর আমেরিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৪১, দক্ষিণ আমেরিকায় ব্রাজিলের ২৮২, এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়ার ১২০ এবং আফ্রিকায় দক্ষিণ আফ্রিকার ৭৫ জন। সরাসরি সাক্ষাৎকার, টেলিফোন ও অনলাইনে সবাই কথা বলেছেন ১৭ থেকে ১৮ মিনিট করে। সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় ২০২০ সালের ৫ অক্টোবর থেকে ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোভিড আসার আগের বছরে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হয়েছে বাংলাদেশের ১৫ শতাংশ কোম্পানির, আর এক অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৭ শতাংশ কোম্পানির। একই সময়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২১ শতাংশ ও এক অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হয় ৩৩ শতাংশ কোম্পানির। কোভিড আসার পর অবশ্য বাংলাদেশি পারিবারিক কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমেছে ৬৩ শতাংশ, যা বৈশ্বিক পর্যায়ে ৫১ শতাংশ। অথচ দুই বছর আগেই বাংলাদেশের পারিবারিক ব্যবসায়ের প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক গড়ের চেয়েও ভালো ছিল। ২০১৮ সালে পারিবারিক ব্যবসায়ের প্রবৃদ্ধির বৈশ্বিক গড় ছিল যেখানে ৩৪ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের তা ছিল ৫৩ শতাংশ।

আগামী দুই বছরে বাংলাদেশের পারিবারিক কোম্পানিগুলোকে কয়েকটি বিষয়ে অধিকতর মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। এগুলো হচ্ছে ডিজিটাল সক্ষমতার উন্নয়ন, নতুন বাজার সম্প্রসারণ, নতুন গ্রাহক খোঁজা, নতুন পণ্য বা সেবা চালু করা, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ের সুরক্ষায় খরচের দিকে খেয়াল রাখা।

তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি ৭৪ শতাংশ ব্যবসায়ী ২০২১ সালের ব্যবসায়ে ভালো প্রবৃদ্ধি আশা করছেন। এই হার বৈশ্বিক পর্যায়ে ৬৫ শতাংশ। ২০২২ সালে বাংলাদেশিদের প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা আরও বেশি ৯৩ শতাংশ, যা বৈশ্বিক ক্ষেত্রে ৮৬ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

মালিকানায় প্রজন্ম, পাঁচ বছর পর

প্রতিবেদনে কোম্পানিতে বর্তমান ও আগামী পাঁচ বছর পরের পরিবারের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ এবং পারিবারিক ব্যবসায়ের বেশির ভাগ শেয়ারের মালিকানা বদল নিয়ে ধারণা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশে পরের প্রজন্মের হাতে পারিবারিক ব্যবসা থাকার হার বর্তমানে ৫৭ শতাংশ, যা বৈশ্বিক পর্যায়ে ৫৫ শতাংশ। পরিবারের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে কোম্পানি চলবে—এমনটা আশা করেন ৫২ শতাংশ ব্যবসায়ী।

আরও বলা হয়েছে, পারিবারিক ব্যবসায়ের বেশির ভাগ শেয়ারের মালিকানা বর্তমানে প্রথম প্রজন্মের হাতে রয়েছে, যা ২৮ শতাংশ। আগামী পাঁচ বছরে তা কমে ১৭ শতাংশে নামতে পারে।

পিডব্লিউসির প্রতিবেদনমতে, পারিবারিক ব্যবসায়ের বেশির ভাগ শেয়ার আছে—এমন ৫০ শতাংশ কোম্পানি আছে বর্তমানে দ্বিতীয় প্রজন্মের হাতে। পাঁচ বছর পর এটি কমে ৪৮ শতাংশ হবে। একইভাবে তৃতীয় প্রজন্মের হাতে থাকা কোম্পানি আছে ১৫ শতাংশ, যা ২০ শতাংশে উন্নীত হবে।

আর চতুর্থ প্রজন্মের হাতে থাকা কোম্পানি বর্তমান ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশে উঠবে। পারিবারিক কোম্পানির পর্ষদে পরের প্রজন্ম থাকার হার দেশে ৪১ শতাংশ, বৈশ্বিক পর্যায়ে ৩০ শতাংশ।

জরিপে অংশ নেওয়া ৮০ শতাংশ বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মনে করেন, পারিবারিক ব্যবসাটা তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক সম্পত্তি। এ বিষয়ে ৭৬ শতাংশ বাংলাদেশি জানান যে তাঁরা ব্যবসায়ে থাকবেন। বৈশ্বিক ক্ষেত্রে এই হার ৬৫ শতাংশ। অন্য পরিবারের সদস্যদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার দিক থেকে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের হার যেখানে ৪৪ শতাংশ, সেখানে বিশ্বে তা অর্ধেক, অর্থাৎ ২৩ শতাংশ।

ডিজিটাল সক্ষমতা ও সুশাসন কম

পিডব্লিউসি বলছে, শক্ত ডিজিটাল সক্ষমতা আছে মাত্র বাংলাদেশের ৩৯ শতাংশের, যা বিশ্বে প্রায় সমানই, ৩৮ শতাংশ।

আর ব্যবসা পরিচালনায় স্বচ্ছ নিয়মনীতি ও দায়িত্বশীলতা আছে ৬৩ শতাংশ বাংলাদেশির। বৈশ্বিক গড়ে এই হার ৭৪ শতাংশ। ব্যবসায়ে শক্ত নেতৃত্ব আছে বাংলাদেশের ৬৫ ও বিশ্বের ৭১ শতাংশের। স্বচ্ছ সুশাসন কাঠামোতে বাংলাদেশের হার যেখানে ৪৩ শতাংশ, সেখানে বিশ্বে তা ৬৫ শতাংশ।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সুশাসন নীতিমালা আছে বলে জবাব দেন বাংলাদেশের ৬৩ শতাংশ ব্যবসায়ী। বৈশ্বিক ক্ষেত্রে এই হার ৭৯ শতাংশ।

সুশাসন নীতিমালায় লভ্যাংশসংক্রান্ত নীতিমালা থাকার হার বাংলাদেশে ১৭ শতাংশ, আর বিশ্বে ৩৭ শতাংশ। মালিকপক্ষের পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থান নীতিমালা থাকায়ও বাংলাদেশে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক কম।

এদিকে ডিজিটাল সক্ষমতা সম্পর্কে বাংলাদেশের ৭ শতাংশ ব্যবসায়ী জানান, তাঁরা শক্ত অবস্থানে আছেন। এই হার বিশ্বে ১৯ শতাংশ। আর বাংলাদেশের ১৯ শতাংশের জবাব হচ্ছে, শক্ত না হলেও এ ব্যাপারে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন তাঁরা। বিশ্বে এমন কথা বলেন ৩৩ শতাংশ। অন্যদিকে ৪৩ শতাংশ বাংলাদেশি জানান, এ ব্যাপারে তাঁরা শক্ত তো ননই, শক্ত হওয়ার ব্যাপারে অগ্রাধিকারও দিচ্ছেন না। বিশ্বে এই হার ২৯ শতাংশ।

কর্মী সহায়তায় এগিয়ে বাংলাদেশ

কোভিড-১৯ শুরুর পর বাড়িতে থেকে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক হার ৮০ শতাংশ, বাংলাদেশে তা ৭০ শতাংশ। কর্মীদের মানসিকভাবে সহায়তা করার বৈশ্বিক হার ৪৫ শতাংশ, বাংলাদেশে তা ৩১ শতাংশ।

তবে কর্মীদের আর্থিক সহায়তা বা ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক হার যেখানে ২২ শতাংশ, বাংলাদেশে এই হার ৩৭ শতাংশ।

করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রমে স্থানীয় সম্প্রদায়কে অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক হার ৭৪ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা ৮৩ শতাংশ। এ ছাড়া ৯০ শতাংশ পারিবারিক কোম্পানি কোনো না কোনোভাবে সিএসআর কার্যক্রমে জড়িত থাকে।

পিডব্লিউসি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সংস্থাটির বৈশ্বিক পারিবারিক ব্যবসায়ের নেতা পিটার ইংলিক্স বলেছেন, ‘বিশ্বজুড়েই পারিবারিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাশা অনুযায়ী বদলাচ্ছে না। এতে তাদের ব্যবসায়ে ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে ডিজিটাল সক্ষমতায় দ্রুততম সময়ে তাদের অনেক দূর যেতে হবে।’

বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন