default-image

মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থান এবং এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করায় দেশটির ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা সচল থাকবে কি না অথবা মিয়ানমার থেকে ব্যবসা এ দেশে ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে কি না, সেটি নিয়েও চলছে আলোচনা।

অবশ্য মিয়ানমারের রাজনীতির পটপরিবর্তনে বাংলাদেশের সম্ভাবনার বিষয় কয়েকটি কিন্তুর ওপর নির্ভর করছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা। তাঁরা বলছেন, সামরিক অভ্যুত্থানের পর যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বা অন্য কোনো দেশ বা জোট মিয়ানমারের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে বাংলাদেশ লাভবান হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, হিমায়িত খাদ্য, মাছসহ কয়েকটি পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে। আর মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে খুব একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা কম।

মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি ও তাঁর ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে গতকাল সোমবার ভোরে আকস্মিকভাবে গ্রেপ্তার করে দেশটির সেনাবাহিনী। তারা দেশটিতে এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। এই ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করে বলেছে, সু চিসহ অন্যদের ছেড়ে না দিলে দায়ী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে তারা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কয়েকটি দেশও সেনা অভ্যুত্থানের প্রতিবাদ করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিবও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

মিয়ানমারের বড় রপ্তানি বাজার চীন, থাইল্যান্ড, জাপান, ভারত, হংকং, যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ। এগুলোর মধ্যে চীন, জাপান, ভারত ও থাইল্যান্ড মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠ। সেনা অভ্যুত্থানের পর দেশগুলো শক্ত বক্তব্য দেয়নি। অন্যদিকে মিয়ানমারে চীন, সিঙ্গাপুর, জাপান, হংকং ও যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগ বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ যদি মিয়ানমারের ওপর কোনো প্রকার বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেয়, তবে কিছু রপ্তানি ক্রয়াদেশ বাংলাদেশ পাবে বলে মন্তব্য করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সেনা অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের বিনিয়োগে বড় কোনো পরিবর্তন না আসার সম্ভাবনাই বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে তেমন প্রভাব পড়বে না। কারণ, চাপে থাকা মিয়ানমার সরকার ইচ্ছা করে কোনো দেশের সঙ্গে ঝামেলায় যেতে চাইবে না।

তৈরি পোশাকে লাভ কীভাবে

তৈরি পোশাক রপ্তানিতে কয়েক বছর ধরেই ভালো করছে মিয়ানমার। মূলত ২০১৩ সালে ইইউর দেওয়া অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা বা জিএসপি সুবিধা দেওয়ার কারণে দেশটিতে পোশাকশিল্পের শক্ত ভিত তৈরি হয়। সেটি কাজে লাগিয়ে ১০ বছরের মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানি ১ হাজার কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে মিয়ানমার। যদিও দেশটির রাখাইন রাজ্যে গণহত্যার কারণে ইইউর জিএসপি সুবিধা পুনর্বিবেচনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

জিএসপির পাশাপাশি নানা সুবিধা দেওয়ার কারণে চীন ও থাইল্যান্ড থেকে পোশাকশিল্পে বিনিয়োগ আসে মিয়ানমারে। তবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ৮০ শতাংশ চীনা। মিয়ানমারের পোশাক রপ্তানির ৫০ শতাংশের গন্তব্য ইইউ। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে তাদের রপ্তানি বাড়ছিল। মিয়ানমার টাইমস–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৩৭ কোটি মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে দেশটি। যদিও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তাদের রপ্তানি ছিল মাত্র ৮০ কোটি ডলার।

ইউরোপিয়ান কমিশনের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ ইইউভুক্ত দেশগুলোতে মিয়ানমারের পোশাক রপ্তানি ছিল ১৫৪ কোটি ইউরোর। ২০১৯ সালে সেটি বেড়ে ২২১ কোটি ইউরোতে দাঁড়ায়। অন্যদিকে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালে মিয়ানমার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১৩ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। পরের বছর সেটি প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ২৫ কোটি ৪২ লাখ ডলার হয়।

জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, মিয়ানমারে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশের সুযোগ আসতে পারে। সেটি হয়তো কালকেই আসবে না। মিয়ানমার থেকে ক্রয়াদেশ সরলে ভিয়েতনাম বেশি লাভবান হবে। কারণ, মিয়ানমারে বিনিয়োগকারী অনেক চীনারই ভিয়েতনামেও কারখানা আছে। তবে মিয়ানমার যেহেতু সস্তা পোশাক তৈরি করে, সেহেতু বাংলাদেশেও ক্রয়াদেশ আসতে পারে।

দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য একটি পদ্ধতির মাধ্যমে হয়ে আসছে। যে সরকারই আসুক না কেন, তা চলমান থাকবে। সেনা অভ্যুত্থানের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও বড় ধরনের সমস্যা হবে না।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এস এম নূরুল হক

রপ্তানি বাণিজ্যে কি প্রভাব পড়বে

পার্শ্ববতী দেশ হলেও মিয়ানমারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাজার বড় নয়। গত ২০১৯-২০ অর্থবছর দেশটিতে ২ কোটি ৮৩ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৮৮ লাখ ডলারের।
ব্যবসায়ীরা জানালেন, মিয়ানমারে মোট রপ্তানির তিন ভাগের দুই ভাগই ওষুধ। তা ছাড়া মাছ, নির্মাণসামগ্রী, রাসায়নিক, কাপড়, জুতা ইত্যাদি পণ্য রপ্তানি হয়। তার বিপরীতে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এস এম নূরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য একটি পদ্ধতির মাধ্যমে হয়ে আসছে। যে সরকারই আসুক না কেন, তা চলমান থাকবে। সেনা অভ্যুত্থানের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও বড় ধরনের সমস্যা হবে না। কারণ, প্রয়োজনের কারণেই উভয় দেশ আমদানি–রপ্তানি করছে।

বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন