কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবেষণা বিভাগ থেকে নীতিনির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা ঠিকমতো করানো হচ্ছে না। একাধিক প্রয়োজনীয় গবেষণাকাজ মাঝপথে আটকে গেছে বা থমকে গেছে। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির নতুন নীতিমালায় এ বিভাগে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।
জানা গেছে, নতুন নীতিমালায় হঠাৎ করে পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের বিশেষ আনুকূল্য দেখানোর পাশাপাশি মাস্টার ডিগ্রিধারীদের মূল্যায়নে নম্বর কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটাই ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।
গবেষণা বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এতে তাঁদের পদোন্নতির পথ একেবারেই আটকে যাবে। তাঁদের অভিযোগ, মাত্র কয়েকজন পিএইচডিধারীকে পদোন্নতি দিতেই এ নীতিমালা করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সম্প্রতি এ নীতিমালা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। আগামী ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নতুন নীতিমালা কার্যকর হবে। তবে বর্তমান নীতিমালাটি গত অক্টোবর শেষে মেয়াদ শেষ হয়েছে।
বর্তমানে উপপরিচালক থেকে মহাব্যবস্থাপক পদ পর্যন্ত পদোন্নতিতে বার্ষিক কর্মমূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেওয়া হয় ৬০ নম্বর, প্রকাশনায় ১০, শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতায় ২০ এবং চাকরির দীর্ঘতায় ১০ নম্বর। নতুন নীতিমালায় তা পরিবর্তন করে বার্ষিক কর্মমূল্যায়ন প্রতিবেদনে ৪০, প্রকাশনায় ৩০, শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতায় ২০ এবং চাকরির দীর্ঘতায় ১০ নম্বর করা হয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুধু গবেষণা বিভাগ নয়, সব বিভাগের পদোন্নতির নীতিমালা যুগোপযোগী করা উচিত। তা না হলে ভালোদের পদোন্নতি দিয়ে ওপরে আনা যাবে না।’ তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই পদোন্নতির নীতিমালাগুলো যুগোপযোগী করা উচিত।
নতুন নীতিমালায় প্রকাশনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, উপপরিচালক থেকে প্রতি ধাপ পদোন্নতির ক্ষেত্রে অন্তত চারটি করে প্রকাশনা থাকতে হবে। চারটি প্রকাশনা না থাকলে তাঁরা পদোন্নতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন না। প্রকাশনাগুলো হতে হবে বিআইবিএম জার্নাল বা সাময়িকী (ব্যাংক পরিক্রমা), আইবিবি জার্নাল, বিবিটিএ জার্নাল, বিবি ডব্লিউপিএস, বাংলাদেশ জার্নাল অব পলিটিক্যাল ইকোনমি (বিইএ) এবং অন্যান্য সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত জার্নালে।
বর্তমানে প্রকাশনা বাধ্যতামূলক নয়। প্রকাশনা থাকলে তার জন্য অতিরিক্ত ১০ নম্বর দেওয়া হয়ে থাকে। আর নতুন নীতিমালায় প্রকাশনার জন্য অন্তত ২০ নম্বর পেতে হবে।
তবে গবেষণা বিভাগের কর্মকর্তা যদি অন্য বিভাগে প্রেষণে থাকেন, তাঁর ক্ষেত্রে প্রকাশনা না থাকলেও চলবে। একে বৈষম্যমূলক বলছেন কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, এটা আবার করা হয়েছে শীর্ষ ব্যক্তিদের পছন্দের গুটি কয়েক ব্যক্তিকে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য।
নতুন নীতিমালায় গবেষণা বিভাগে মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ও উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) পদে সরাসরি নিয়োগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নতুন নীতিমালা তৈরির পর্যায়ে গবেষণা বিভাগের কর্মকর্তারা গভর্নরের কাছে লেখা ৪২টি দরখাস্তে উল্লেখ করেন, জিএম ও ডিজিএম পদে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হলে ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে যাঁরা কর্মরত আছেন, তাঁরা পদোন্নতিবঞ্চিত হবেন।
প্রয়োজনীয় গবেষণা নেই: সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্ত নিলেও তার আগে কোনো গবেষণা হয় না—এমন অভিযোগ রয়েছে। বিশেষত গত কয়েক বছরে মোবাইল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং, কৃষিঋণে ব্যাপক উদ্যোগ, খেলাপি ঋণ নীতিমালায় বড় পরিবর্তনের বিষয়গুলো আগেভাগে সমীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং নীতিতে তা সংযোজনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অথচ এগুলোর প্রতিটি ক্ষেত্রে সমীক্ষা বা গবেষণা করা হলে নানান দিক থেকে তা ইতিবাচকভাবে আগানো যেত বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন।
স্বল্প মেয়াদের লোন অ্যাগেইনস্ট ট্রাস্ট রিসিট (এলটিআর) বা বিশ্বাসী ঋণ নিয়ে ভিন্ন খাতে ব্যবহার, পরবর্তীকালে মেয়াদি ঋণে পরিণত হওয়া এবং আরও পরে তা খেলাপি হয়ে পড়া বিষয়ে সংবাদপত্রে প্রতিবেদন হয়েছে। এরপর প্রায় তিন বছর ধরে দুই দফায় কিছু গবেষণা হলেও তা এখনো শেষ হয়নি। এ গবেষণার মাঝপথে নীতিনির্ধারকদের কারও কারও আদেশে গবেষকদের ফেরত আনার অভিযোগও আছে। ফলে কেন এমন ঋণ সৃষ্টি হলো, নীতির দুর্বলতা আছে কি না, ঋণগুলোর অর্থ দেশে আছে না বিদেশে পাচার হয়েছে, অথবা এ থেকে বের হওয়ার পথ কী হতে পারে—এসব বিষয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নেই।
যদিও বড় খেলাপি বা বড় অঙ্কের ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। কিন্তু, এতে ভালো গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং বারবার ঋণ পুনঃ তফসিল করায় ভালো গ্রাহকেরা যে নিরুৎসাহিত হবেন, তা ভাবা হচ্ছে না।
তবে বিগত ২০০৯-১০ সময়ে দেশের শেয়ারবাজারে বড় উত্থান নিয়ে গবেষণা হয়েছে। বেসরকারি পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুরকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে তাঁর আওতায় গবেষণা বিভাগের কয়েকজনকে নিয়ে সমীক্ষা করা হয়। সেই গবেষণার ফলাফলে উঠে আসে, বাজারে বুদ্বুদ বা বাবল্স আছে এবং সেটা খুব শিগগির পতনের মুখে পড়বে। বাস্তবে হয়েছেও তাই।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এতে প্রমাণ মেলে, নীতিনির্ধারকেরা চাইলে গবেষণা বিভাগ থেকে ভালো কাজ হতে পারে। কিন্তু, এ কাজে নীতিনির্ধারকদের বা নেতৃত্বের আগ্রহ দেখা যায় না।
আবার ২০০৯-১০ সালের দিকেই রিয়েল এস্টেট বা আবাসন খাত নিয়েও গবেষণা শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, এ খাতেও বড় বুদ্বুদ বা কৃত্রিম স্ফীতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণাকাজটি আজও শেষ হয়নি। এ ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের আগ্রহ না থাকা বা কাজটি আটকে রাখা হয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
গবেষণা বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, একদিকে তাঁদের দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকাজ করানো হয় না, অন্যদিকে নতুন নীতিমালা তৈরি করে তাঁদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন