default-image

বিশ্বায়নের যুগে পুরো পৃথিবী এক সুতোয় গাঁথা। এমন বিশ্বে অর্থনীতিও সমন্বিত রূপ নিয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতি একটি জালের মতো। এর এক প্রান্তে সমস্যা দেখা দিলে তা অন্যান্য প্রান্তেও ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। তাই মহামারি দেখা দিলে শুধু যে আক্রান্ত অঞ্চলের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমন নয়; বরং পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতেই মন্দা ভাব দেখা দেয়।

নভেল করোনাভাইরাসকে এরই মধ্যে এই রোগকে বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। অন্য সবকিছুর মতো অর্থনীতিতেও থাবা বসিয়েছে কোভিড-১৯। ফলে বিশ্বের সামগ্রিক অর্থনীতি ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছে।

অবশ্য রোগবালাইয়ের কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা এর আগেও দেখা গেছে। নভেল করোনাভাইরাসের মতো আরও কিছু রোগে অর্থনৈতিক প্রভাব দেখে নেওয়া যাক একনজরে:

কোভিড-১৯

যেহেতু চীন এই রোগের উৎপত্তিস্থল, তাই সি চিন পিংয়ের দেশের অর্থনীতিই প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশটির অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের গতি কমে গেছে। দেশটির হুবেই প্রদেশে প্রথম ছড়িয়ে পড়ে কোভিড-১৯। চীনের জিডিপির সাড়ে ৪ শতাংশ আসে হুবেই থেকে। ফলে হুবেই স্থবির থাকার অর্থ হলো চীনের সার্বিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া। গত বছর বৈশ্বিক জিডিপিতে চীনের অবদান ছিল ১৬ শতাংশ। তাই স্বাভাবিকভাবেই চীনের মন্দার ভার বিশ্বের ঘাড়েও চাপবে। সামগ্রিকভাবে বলা হচ্ছে, কোভিড-১৯ বেশ কিছু দেশকে অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ঠেলে দেবে এবং এর ফলে পুরো বিশ্বের প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে যেতে পারে।

সার্স

করোনাভাইরাস গোত্রের আরেক সংক্রমণ সিভিয়ার একিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম (সার্স)। এটি ২০০৩ সালে পৃথিবীতে আতঙ্ক তৈরি করেছিল। চীন থেকে উদ্ভূত হয়েছিল সার্স। ওই সংক্রমণে ৮ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল, মারা গিয়েছিল ৭৭৪ জন। সার্সে আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার ছিল ১০ শতাংশ। সার্সে আক্রান্তদের জ্বর হতো এবং এর সঙ্গে থাকত শুকনা কাশি, যা অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে পরে নিউমোনিয়ায় রূপ নিয়েছিল।

সার্স এই পৃথিবীর বুকে মোটে ৬ মাস টিকে ছিল। মৃত্যুহার বেশি থাকায় এটি ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। আক্রান্ত এলাকায় পর্যটন, খুচরা বিক্রির পরিমাণ অনেক কমে গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, সার্সের কারণে মোট ৪০ থেকে ৮০ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল।

স্প্যানিশ ফ্লু

বেশ কিছু কারণে ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু অত্যন্ত প্রাণঘাতী রূপে দেখা দিয়েছিল। একে তো সেটি ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কাল; সংঘাতবিক্ষুব্ধ পৃথিবীতে এমন রোগ সুচারুভাবে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব ছিল না। এর ওপর তখন আবিষ্কৃত হয়নি সালফা ড্রাগস ও পেনিসিলিন। স্পেনের মোট ৮০ লাখ মানুষ এই ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী আক্রান্ত হয়েছিল ৫০০ মিলিয়ন মানুষ। মৃতের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ মিলিয়ন। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই মারা গিয়েছিল ৬ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ।

ওই সময় স্প্যানিশ ফ্লুর উচ্চ মৃত্যুহারের কারণে সুস্থ শ্রমিকের সংখ্যা কমে গিয়েছিল। ফলে একপর্যায়ে বেড়ে গিয়েছিল মজুরি। দীর্ঘ মেয়াদে স্প্যানিশ ফ্লুতে শিশুরা বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছিল। আক্রান্ত নারীদের গর্ভে থাকা শিশুদের বৃদ্ধির হার খুব কম ছিল। ফলে এসব খাতে সাধারণ মানুষের ব্যয় বেড়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে পুরুষ শ্রমিকদের মজুরি কমে গিয়েছিল ৫ থেকে ৯ শতাংশ।

ইবোলা

২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়েছিল এই মহামারি রোগ। ওই অঞ্চলে আক্রান্ত হয়েছিল ২৮ হাজার ৬৩৯ জন। মারা গিয়েছিল ১১ হাজার ৩১৬ জন। এর বাইরে আরও ১০ হাজার ৬০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী এই রোগ ঠেকাতে ব্যয় হয়েছিল ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ২০১৫ সালে গিনি, লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিওন জিডিপিতে হারিয়েছিল ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। সিয়েরা লিওনের বেসরকারি খাত প্রায় অর্ধেক শ্রমশক্তি হারিয়েছিল। ২০১৮ সালের আগস্টে ইবোলা ছড়িয়ে পড়েছিল গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোতে। ওই সময় প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ সংক্রমিত হয়েছিল, মারা যায় ২ হাজার ২৪২ জন।

ডেঙ্গু

মশাবাহিত এই রোগে প্রতিবছর প্রায় ১০০ মিলিয়ন মানুষ আক্রান্ত হয়ে থাকে। গত কয়েক বছরে এই সংক্রমণের হার বহুগুণে বেড়েছে। এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় ডেঙ্গুর দেখা মেলে প্রায়শই। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হিসেবে এটি ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। ডেঙ্গুর কারণে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই বছরে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকে। এবার বুঝে নিন, পুরো বিশ্বে এর অর্থনৈতিক প্রভাব কতটা!

জিকা

এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মাঝারি ফ্লু ধরনের লক্ষণ দেখা দেয়। এটি সাধারণত প্রাণঘাতী হয় না। তবে অন্তঃসত্ত্বা নারীরা আক্রান্ত হলে, জন্মানো শিশুদের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করে। এ ছাড়া অকালগর্ভপাতের ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে। ২০১৭ সালে জিকা ভাইরাস সামলাতে স্বল্প মেয়াদে ব্যয় হয়েছিল ৭ থেকে ১৮ বিলিয়ন ডলার। দীর্ঘ মেয়াদে এই খরচ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলারে।

প্লেগ

১৩৪৭ থেকে ১৩৫২ সালের মধ্যে ইউরোপের জনসংখ্যা ৪০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছিল প্লেগ। এর মধ্যে মাত্র এক থেকে দুই বছরের মধ্যে ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের জনসংখ্যা কমে যায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। প্লেগের অর্থনৈতিক প্রভাবও ছিল মারাত্মক। জনসংখ্যা আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনতেই লেগেছিল ২০০ বছর। মানুষ আনতে করছাড় ও বিনা মূল্যে বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। গ্রামাঞ্চলের মানুষ শহরে চলে যাওয়ায় অনেক জমি জঙ্গলে পরিণত হয়েছিল।

তথ্যসূত্র: দ্য ব্যালান্স ডট কম, এএফপি, বিবিসি, ইকোনমিস্ট ও সিএনবিসি

বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন