বাংলাদেশ সম্প্রতি ডব্লিউটিওতে স্বল্পোন্নত দেশের সমন্বয়ক নির্বাচিত হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ কীভাবে লাভবান হতে পারে এবং বিশ্ব বাণিজ্যে অবস্থান শক্ত করতে বাংলাদেশ কী কী পদক্ষেপ নিতে পারে—সে ব্যাপারে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান

default-image

প্রথম আলো: বাংলাদেশ পঞ্চমবারের মতো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসির সমন্বয়ক হলো। এতে লাভ কী হলো?
মোস্তাফিজুর রহমান: বিশ্বে বর্তমানে ৪৮টি স্বল্পোন্নত দেশ রয়েছে, এর মধ্যে ৩৪টি ডব্লিউটিওর সদস্য। আরও ৮টি দেশ ডব্লিউটিওর সদস্য হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। সমন্বয়ক হওয়ার বড় লাভ হচ্ছে উন্নত দেশগুলোর কাছে এলডিসির দাবি ও অধিকার আদায়ে নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ। সবাই এ জায়গায় যেতে পারে না। সমন্বয়ক হলে ডব্লিউটিওর অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিতে পারবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের স্বার্থের বাইরে চলে যেতে পারে—এ রকম কোনো বিষয় কোনো বৈঠকে উপস্থাপিত হলে, বাংলাদেশ তখন তা নিয়ে কথা বলতে পারবে। সব মিলে গোটা বিষয়টিকে আমি বাংলাদেশের অর্জন ও স্বীকৃতি হিসেবেই বিবেচনা করব।

প্রথম আলো: বলা হয়, অনেকেই সমন্বয়ক হতে চায় না, তাই ঘুরেফিরে দায়িত্বটি বাংলাদেশের ঘাড়ে আসে। তাহলে অর্জনটা কীভাবে হলো?
মোস্তাফিজুর রহমান: ডব্লিউটিওতে এলডিসির সমন্বয়ক নির্বাচিত হয় যদিও দেশের নামের আদ্যক্ষরের ক্রম অনুযায়ী (অ্যালফাবেটিক্যালি), তবে এটাও ঠিক যে সব এলডিসিরই ৩৪টি দেশের সমন্বয়ক হওয়ার সক্ষমতা নেই। ডব্লিউটিওতে ১২টি স্বল্পোন্নত দেশের কোনো অফিসই নেই। জেনেভাতে বাংলাদেশের যেমন একটি স্থায়ী মিশন রয়েছে, দেশেও রয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি ডব্লিউটিও সেল। মোটকথা, এলডিসির মধ্যে বাংলাদেশের একটা শক্ত অবস্থান রয়েছে। তা ছাড়া শুরু থেকেই বাংলাদেশ ডব্লিউটিওকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ১৯৯৫ সালে ১২২টি সদস্য নিয়ে সংস্থাটি যখন গঠিত হয়, তখন থেকেই বাংলাদেশ সদস্য। বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থার মধ্যে নিজের অবস্থানকে সুদৃঢ় করতে সীমিত সাধ্যের মধ্যেও চেষ্টা করছে বাংলাদেশ।

প্রথম আলো: সব এলডিসির স্বার্থের জায়গাটি তো একরকম নয়। এশিয়ার এলডিসি ও আফ্রিকার এলডিসির স্বার্থের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এ দুয়ের সমন্বয় ঘটিয়ে সমন্বয়কের দায়িত্ব কীভাবে পালন করবে বাংলাদেশ?

মোস্তাফিজুর রহমান: বাংলাদেশের ওপর সব এলডিসির একধরনের আস্থা রয়েছে। এর কারণ হচ্ছে—আমাদের রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) এবং মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বাণিজ্যের অংশ। বাংলাদেশকে এসব দিক থেকে অন্য স্বল্পোন্নত দেশগুলো যথেষ্টই সমীহ করে। উন্নত দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের প্রধান চাওয়া হচ্ছে পণ্য বাণিজ্যে বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার। আর আফ্রিকার এলডিসির অন্যতম চাওয়া হচ্ছে কৃষি। বাংলাদেশের প্রতি সবার এ রকম একটি আস্থা রয়েছে যে বাংলাদেশ দুইয়ের মধ্যে একটি সুষম ভাব নিয়ে আসতে সক্ষম। আর আফ্রিকার এলডিসিদের আমরা বলতে পারি যে আমাদের শিল্পে তোমরা সমর্থন দাও, তোমাদের কৃষিতেও আমরা তা দেব।

প্রথম আলো: শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার তো বাংলাদেশ এখনো পেল না।
মোস্তাফিজুর রহমান: এটা নিয়ে আলোচনা প্রথম থেকেই হচ্ছে। ২০০৫ সালে হংকংয়ে অনুষ্ঠিত ডব্লিউটিওর মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে একটা সিদ্ধান্তও হয়েছিল যে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো শুল্ক ও কোটামুক্ত বাজার প্রবেশাধিকার দেবে। সব দেশ মেনে নিলেও বাদ সাধে তখন যুক্তরাষ্ট্র। তারা তখন বলে যে তারা পারবে না। তখনই ৯৭ শতাংশ পণ্য রপ্তানিতে শুল্ক ও কোটামুক্ত বাজার প্রবেশাধিকারের বিষয়টি এসেছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) কিছু দেশে রপ্তানিতে বর্তমানেও আমরা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে পাই না। আবার ইইউতে যেটা পাই, সেটা দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে। ইইউ যখন-তখন বলতে পারে যে দেব না। তখন কিছু করার থাকবে না।

প্রথম আলো: হংকং বৈঠক শেষে তো তখনকার বাণিজ্যমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী দেশে ফিরে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ব্যাঙের পা থেকে উড়োজাহাজ পর্যন্ত শূন্য শুল্কে রপ্তানি করা যাবে...।
মোস্তাফিজুর রহমান: হ্যাঁ। কিন্তু যে ৩ শতাংশ বাইরে থেকে গেল, এর মধ্যেই রয়েছে আমাদের তৈরি পোশাক। ফলে হংকং বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাণিজ্যিক ও অর্থপূর্ণভাবে আর কার্যকর হলো না। বাংলাদেশও শুল্ক ও কোটামুক্ত তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করতে পারল না। তবে এ ব্যাপারে একটা চাপ কিন্তু সব সময়ই তৈরি করে রেখেছে বাংলাদেশ। সব সময়ই এটা নিয়ে কথা বলছে। সেবা খাতের বাণিজ্য নিয়েও কথা বলছে। এলডিসির জন্য একটা বড় সম্ভাবনা হচ্ছে সেবা খাতের বাণিজ্যে ছাড় (সার্ভিস ওয়েভার)। অর্থাৎ এলডিসি থেকে উন্নত দেশগুলোতে বেশি হারে ও শিথিল শর্তে সেবা খাতের বাজার উন্মুক্ত হওয়া। আগামী জুলাইয়ের মধ্যে উন্নত দেশগুলো এ বিষয়ে তাদের প্রতিবন্ধকতার কথা ডব্লিউটিওকে জানাবে। একটা হিসাবে এসেছে, উন্নত দেশগুলো তাদের ৩ শতাংশ শ্রমবাজার উন্মুক্ত করলে এলডিসির জন্য ১৫ হাজার কোটি ডলারের বাজারের সুযোগ তৈরি হয়।

প্রথম আলো: সেবা খাতের বাণিজ্যে ছাড় উন্নত দেশগুলো ১, ২ বা ৫ বছর পরেও যদি দেয়, সেই সুযোগটি কাজে লাগানোর জন্য আমরা প্রস্তুত কি না।
মোস্তাফিজুর রহমান: মোটেই না। তবে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে, বাজার উন্মুক্ত হলেই যাতে সুযোগটি নেওয়া যায়। এ ব্যাপারে গবেষণারও দরকার রয়েছে। কয়েকটি খাতকে অবশ্য এর মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে আমাদের সবার আগে নজর দিতে হবে নার্সিং ও দক্ষ জনশক্তি—এ দুই খাতে। এর মধ্যে সনদটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। দেখা গেল, একজন নার্সিং পাস করলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর সনদ উন্নত দেশগুলো গ্রহণ করল না। সে জন্য এখন থেকেই সুষ্ঠু পরিকল্পনা করে এগোতে হবে, যাতে শিক্ষার মানটা ভালো হয়, উন্নত দেশের কাছাকাছি হয়।

প্রথম আলো: শুধু বাংলাদেশ নয়, সব এলডিসির স্বার্থে বাংলাদেশ আর কী ভূমিকা পালন করতে পারে?
মোস্তাফিজুর রহমান: উন্নত দেশগুলো তাদের জাতীয় আয়ের শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ সহায়তা (এইড) হিসেবে দরিদ্র দেশগুলোকে দেওয়ার কথা। জাতিসংঘের কাছে তাদের স্বীকারোক্তি ছিল। অনেক দিন থেকেই আমরা বলছি, এ থেকে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ যাতে এলডিসিগুলো পায়। নরওয়েসহ কোনো কোনো দেশ অবশ্য তা মানছে। এই বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ তার কণ্ঠস্বর আরও জোরালো করতে পারে।

প্রথম আলো: এলডিসির সমন্বয়ক হিসেবে বাংলাদেশের সক্ষমতার কথা বললেন, কিন্তু এ কথা তো প্রায়ই বলা হয় যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দর-কষাকষিতে বাংলাদেশ বরং দুর্বল।
মোস্তাফিজুর রহমান: সেটাও বলা হয় এবং ততটা ভুল বলাও হয় না। দেখতে হবে যে অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে আমরা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি। হংকং মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের দলে আইনজীবীই ছিলেন ২৫০ জন। আমাদের কজন ছিলেন? ডব্লিউটিওর আগামী মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকেই বা কজন থাকবেন? অথচ ডব্লিউটিও বা বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা চলেই এখন আইনি বাচনে। বুঝতে হবে যে কোনো ধারায় ‘শ্যাল’ থাকলে কী হবে আর ‘শুড’ থাকলে কী হবে।

প্রথম আলো: আমাদের করণীয় কী তাহলে?
মোস্তাফিজুর রহমান: শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, আমদানি-রপ্তানি, রাজস্ব সংগ্রহ—সবদিক থেকেই বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব বাণিজ্যে নিজেদের অংশগ্রহণ ও হিস্যা বাড়াতে বাণিজ্যবিষয়ক জ্ঞান আহরণে এখন পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। অথচ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমে (কারিকুলাম) বাণিজ্য, বাণিজ্য আইন ততটা গুরুত্বের সঙ্গে পড়ানো হয় না। বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) নামে একটি সংস্থা রয়েছে, সেটিও অবহেলিত। বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ে বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার দরকার।

বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন