default-image

প্রথম আলো: বিশ্বের অনেক দেশে ক্রেডিটকার্ড বেশ জনপ্রিয়। দেশে এই কার্ডের বাজার কেমন?

মাসরুর আরেফিন: শুরুতেই বলে রাখি, আমাদের দেশের মোট ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র দশমিক ৯৩ শতাংশ ক্রেডিট কার্ড গ্রাহক এবং প্রায় ১২ শতাংশ ডেবিট কার্ড গ্রাহক রয়েছেন। বাংলাদেশে গত ২৫ বছরেও ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি। তবে গত ছয় বছরে ক্রেডিট কার্ডের বাজার গড়ে ১৮ শতাংশ হারে বেড়েছে। ২০২০ সালে কেনাকাটা বা বিভিন্ন সেবার বিপরীতে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ১১ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে ৭ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। গত পাঁচ-ছয় বছরে বিভিন্ন ধরনের কেনাকাটা ও সেবার বিপরীতে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ গড়ে সাড়ে ১৭ শতাংশ হারে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ডুয়েল কারেন্সি বা দুই ধরনের মুদ্রায় লেনদেনে কার্ড আবশ্যক হওয়ায় ক্রেডিট কার্ডের চাহিদা ও ব্যবহার
উভয়ই বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

সুদহার ও মাশুলের কারণে ক্রেডিট কার্ড নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে একধরনের ভীতি কাজ করে। এ ভীতি দূর করতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?

মাসরুর আরেফিন: বিষয়টি আমাদেরও দৃষ্টিগোচর হয়েছে। আমাদের পাশের দেশগুলোতে লক্ষ করলে দেখা যায়, ক্রেডিট কার্ডের গড় সুদের হার ২৭ থেকে ৪৮ শতাংশের মধ্যে ওঠা–নামা করে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়াতে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যার মধ্যে একটি হলো ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার কমানো। এ ছাড়া করোনা চলাকালীন গ্রাহকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অনেক ধরনের পাওনা পরিশোধ ও মাশুল আদায় স্থগিত রাখা হয়েছিল। এ ছাড়া সুদ ও মাশুলের ব্যাপারে বলতে চাই, গ্রাহকেরা যেকোনো কেনাকাটার দিন থেকে সর্বোচ্চ ৪৫ দিন পর্যন্ত সুদবিহীন সুবিধা ভোগ করে থাকেন। এই সময়ের মধ্যে যদি টাকা পরিশোধ করেন, তাহলে কোনো সুদ বা মাশুল গুনতে হয় না।

সিটি ব্যাংকে কোন শ্রেণি–পেশার মানুষ বেশি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছেন।

মাসরুর আরেফিন: আমাদের ব্যাংকের ৮৫ ভাগ কার্ড ব্যবহারকারী চাকরিজীবী। এ ছাড়া আমাদের কার্ড ব্যবহারকারীদের মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

রাজধানী ও কয়েকটি বিভাগীয় শহরের মধ্যেই গ্রাহক সীমাবদ্ধ। পুরো দেশে ক্রেডিট কার্ড ছড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না কেন?

মাসরুর আরেফিন: আমরা ঢাকা-চট্টগ্রামের পাশাপাশি সারা দেশে ক্রেডিট কার্ডের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। উল্লেখযোগ্য
জেলা শহরে আমাদের মোট ১৩২টি শাখার মাধ্যমে গ্রাহকদের কার্ড সেবা প্রদান করছি। পাশাপাশি কার্ড ব্যবহারের জন্য দোকানগুলোতে আমাদের পিওএস (পয়েন্ট অব সেলস) মেশিনও প্রদান করছি। নানা ধরনের উদ্যোগের পরও কার্ডের ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ ব্যবহার শুধু ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

পাশের দেশগুলোতে ক্রেডিট কার্ডের গড় সুদের হার ২৭ থেকে ৪৮ শতাংশ। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়াতে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যার মধ্যে একটি হলো ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার কমানো।
মাসরুর আরেফিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিটি ব্যাংক

দেশজুড়ে সেবা ছড়িয়ে দিতে সরকারের দিক থেকে কী ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করেন?

মাসরুর আরেফিন: সরকার বরাবরই সহায়তা করে আসছে। সামনের দিনে ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য নথিপত্রের প্রয়োজনীয়তা শিথিল করলে কার্ডের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। এ ছাড়া কার্ডসংক্রান্ত বিভিন্ন খরচের ওপর আরোপিত কর কমিয়ে আনলে ব্যাংকগুলো কার্ড ব্যবসায় আরও উৎসাহিত হবে। এভাবে কার্ডের বাজার আরও বড় হতে পারে।

ঈদ সামনে রেখে আপনাদের ব্যাংকের কার্ডে বিশেষ কোনো সুবিধা দেওয়া হচ্ছে কি?

মাসরুর আরেফিন: আমাদের ব্যাংক বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য বিভিন্ন রকম কার্ড প্রদান করে থাকে। ঈদ সামনে রেখে কার্ড ব্যবহারকারীদের জন্য বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দোকানে, যেমন ক্যাটস আই, ভাসাভি, জ্যারা ফ্যাশনস, সেইলর ইত্যাদিতে আকর্ষণীয় ছাড় দেওয়া হচ্ছে। তা ছাড়া করোনার কথা মাথায় রেখে আমরা বিভিন্ন নামীদামি রেস্টুরেন্টে, যেমন আমারি ঢাকা, লা মেরিডিয়ান, ওয়েস্টিন, সিক্স সিজন্সে টেকঅ্যাওয়ে সার্ভিসের ওপর বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে। পাশাপাশি ঘরে বসে পণ্য বা সেবা কেনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ই-কমার্স সাইট, যেমন দারাজ, চালডাল, স্বপ্ন, মীনায়ও বিশেষ ছাড় দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

করোনার কারণে কার্ড ব্যবসায় কী ধরনের প্রভাব পড়েছে।

মাসরুর আরেফিন: করোনার কারণে মানুষ অনেকটাই ঘরমুখী হয়ে গেছে। এতে লেনদেনে ব্যাপকভাবে ভাটা পড়েছে। এ ছাড়া মানুষের চলাচলসহ নানা বিধিনিষেধের কারণে নতুন করে ক্রেডিট কার্ডের বিক্রির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এই সময়ে একদিকে দেশের গ্রাহকেরা যেমন বাইরে বের হতে পারছেন না, অন্যদিকে বিদেশের গ্রাহকেরাও দেশে আসতে পারছেন না। এ কারণে আমাদের ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের অভ্যন্তরীণ লেনদেন ৩০ শতাংশ কমে গেছে। আবার গ্রাহকেরা সরাসরি দোকানে গিয়ে কেনাকাটার পরিবর্তে অনলাইনে বেশি কেনাকাটা করছেন। বলতে গেলে, আমাদের পিওএসের কেনাকাটাগুলো ই-কমার্সে স্থানান্তর হচ্ছে। এর ফলে ই-কমার্সে আমরা ২১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখতে পাচ্ছি।

বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন