গত জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়েছে। টানা হরতাল-অবরোধসহ সহিংসতায় ব্যবসা-বাণিজ্য কমে গেছে। পণ্য পরিবহনে দেখা দিয়েছে সংকট। এর ফলে পুরো জানুয়ারি মাসেই কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় হয়নি।
হরতাল-অবরোধ শুরুর আগে গত ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত অর্থবছরের প্রথমার্ধেই (জুলাই-ডিসেম্বর) দুই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে। এখন টানা অবরোধের ফলে এ ঘাটতি ক্রমশ বাড়ছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও আয়কর মিলিয়ে মোট ৫৯ হাজার ১১৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৬১ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। এ বছর এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। এখন সেই লক্ষ্য অর্জন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম থেকেই রাজস্ব আদায়ে ঘাটতিতে পড়ে এনবিআর। যতই সময় গেছে এই ঘাটতি শুধুই বেড়েছে বলে জানা গেছে। তবে এখনো জানুয়ারি মাসের আদায়ের হিসাব চূড়ান্ত করেনি এনবিআর।
এদিকে ঢাকা চেম্বার এক সমীক্ষায় দেখিয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়ীদের প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। গত ৩৬ দিনের (১১ জানুয়ারি পর্যন্ত) বিপরীতে ৭ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে।
তবে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন করতে বিভিন্ন কমিশনারেটের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন এনবিআরের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান। এ ছাড়া বিভিন্ন মামলার কারণে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আদায় করা যাচ্ছে না। এখন সেসব মামলা না চালিয়ে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতির মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। এডিআর হলো দুই পক্ষের সমঝোতার মাধ্যমে বকেয়া রাজস্ব আদায় করা। এনবিআরের সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, শুল্ক, মূলক ও আয়কর সংক্রান্ত ১২ হাজার ৫৩৮টি মামলায় ২ হাজার ৮৬১ কোটি টাকার রাজস্ব আটকে আছে। এডিআরে কিছু মামলা নিষ্পত্তি করা গেলে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি কিছুটা কমানো যাবে বলে মনে করেন রাজস্ব কর্মকর্তারা।
এনবিআরের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন করতে বিভিন্ন কমিশনারেটের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। এসব সভায় রাজস্ব আদায়ের কৌশল নির্ধারণ করা হচ্ছে। হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি মোকাবিলা করতে সরকারও ব্যবস্থা নিচ্ছে। আশা করি, শিগগিরই এ ধরনের পরিস্থিতি কেটে যাবে।’
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ প্রথম আলোকে বলেন, হরতাল-অবরোধে দোকানপাট খোলেনি, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পারেননি। আমদানি-রপ্তানি শ্লথগতিতে রয়েছে। তাই রাজস্ব আদায়েও এর প্রভাব পড়ছে।
রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার ঘাটতি থাকলেও গত বছরের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় ১৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে। গত অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৫০ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা। তবে চলতি অর্থবছরে প্রায় ২২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাজস্ব আদায় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই গতিতে রাজস্ব আদায় করা যাচ্ছে না। গত ছয় মাসের মধ্যে কোনো মাসেই রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ১৬ শতাংশের বেশি অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
আদায় পরিস্থিতি: চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আমদানি পর্যায়ে আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক), সম্পূরক শুল্ক, রপ্তানি শুল্ক আদায়ের পরিমাণ ১৭ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১৫ হাজার ৭০১ কোটি টাকা। এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ২৭ শতাংশ।
স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণত মূল্য সংযোজন কর, আবগারি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও টার্নওভার ট্যাক্স আদায় করা হয়। জুলাই-ডিসেম্বর মাসে এ খাতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২২ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বেশি আদায় হয়েছে। চলতি অর্থবছরের আলোচ্য সময়ে এই খাতে প্রবৃদ্ধি ১৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
তবে আয়কর খাতে অন্য বছরের ধারাবাহিকতায় প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়নি। অন্য বছরে আয়কর খাতে ২০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি থাকত। এবার তা কমে ১৭ দশমিক ৭৮ শতাংশে নেমে এসেছে। জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে আয়কর আদায় হয়েছে ১৮ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। গত বছর একই সময়ে ১৫ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা আদায় হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন