default-image

করোনাভাইরাসের কারণে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিতে পড়লেও বেশির ভাগ ব্যবসায়ী কিস্তি পরিশোধ করেছেন। যাঁরা সব কিস্তি পরিশোধ করেননি, তাঁরাও কিছু টাকা শোধ করে গেছেন। কারণ, ঋণ শোধ না করে খেলাপি থেকে রক্ষা পেলেও সুদ বৃদ্ধি পায়। এদিকে ঋণ শোধ না করে খেলাপি থেকে মুক্ত থাকার সুযোগটি আর বাড়ায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক।

তবে মেয়াদি ঋণের যে মেয়াদ বাকি আছে, তা পরিশোধের সময় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ বাড়ানোর সুযোগ দিয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্ক বিবেচনায় ঋণের মেয়াদ বাড়াতে পারবে। এতে কমে আসবে কিস্তির পরিমাণও। এভাবে ব্যবসায়ীদের ঋণ পরিশোধে স্বস্তি দেওয়ার নতুন এই কৌশল বেছে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু ঋণ পরিশোধের সময় কোনোভাবেই দুই বছরের বেশি হবে না। গতকাল এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, এই সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত। তবে এসএমই ও পোশাক খাতের জন্য সুবিধাটা রাখতে পারলে ভালো হতো। কারণ, এই দুই খাত এখনো লড়াই করে যাচ্ছে। করোনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আর ঋণের মেয়াদ সব ক্ষেত্রে বাড়ানোর সুযোগ দিলে ভালো হয়। কারণ, মেয়াদি ঋণে ছাড় পেলে চলতি মূলধন ঋণে পাবে না কেন?

আহসান এইচ মনসুর আরও বলেন, এখন বাজারে অনেক তারল্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত বছর ব্যাংকগুলোকে যে টাকা দিয়েছে, তা তুলে নিলে ভালো হয়। এতে বাজারে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে। ব্যাংকগুলোও ঋণ আদায়ে তৎপরতা বাড়াবে।

গত বছর করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হওয়ার পরিস্থিতিতে ঋণ পরিশোধ না করলেও কোনো গ্রাহক খেলাপি হবেন না, এমনকি ঋণের মানেরও অবনমন হবে না—এই সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি খেলাপি কোনো গ্রাহক ঋণ শোধ করলে তার জন্য খেলাপিমুক্ত হওয়ার সুযোগও রাখা হয়। ২০২০ সালজুড়ে এই সুযোগ পান ব্যাংকের গ্রাহকেরা। ফলে অনেক গ্রাহক ঋণ পরিশোধে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এতে অনেক ব্যাংকও সমস্যায় পড়ে। কারণ, কাগজে-কলমে ঋণ ও সুদ হিসাব করলেও বাস্তবে টাকার দেখা পায়নি ব্যাংকগুলো। এর পরিপ্রেক্ষিতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক গ্রাহকদের খেলাপি না হওয়ার সুযোগ নতুন করে আর না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়।

গতকালের প্রজ্ঞাপনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় ২০২০ সালে সব ধরনের ঋণ শ্রেণিকরণে বিলম্ব সুবিধা প্রদান করা হয়েছিল, যা গত পয়লা জানুয়ারি থেকে আর না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন ঋণের কিস্তি পরিশোধ সহজ করার লক্ষ্যে পয়লা জানুয়ারি তারিখে বিদ্যমান অশ্রেণিকৃত ঋণের ওপর করোনাভাইরাসের প্রভাব ও ঋণের বকেয়া স্থিতির পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে কেবল নতুন সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে মেয়াদি ঋণের হিসাবের অবশিষ্ট মেয়াদের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করা যাবে। তবে বর্ধিত সময়সীমা কোনোভাবেই দুই বছরের বেশি হবে না। এ ছাড়া অন্যান্য ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নীতিমালা এবং বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় প্রদত্ত ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রণোদনা প্যাকেজের নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ৪০টি ব্যাংকের তথ্য সংগ্রহ করে দেখেছে, করোনার মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের কিস্তি পরিশোধ হয়নি। এই অর্থ বিতরণ করা মোট ঋণের ২২-২৩ শতাংশের মতো। যেসব গ্রাহক কিস্তি শোধ করেছেন, তাঁদের দেওয়া অর্থের পরিমাণ ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। বাকি গ্রাহকেরা নিয়মিত কিস্তি শোধ করেছেন। তাঁরা বিশেষ সুবিধা নেননি। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন করে সময় না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

এদিকে নতুন করে ঋণ খেলাপি হওয়ার সুযোগ বন্ধ হওয়ায় গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৪ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। তবে এই সুযোগ না দেওয়া হলে খেলাপি ঋণ দ্বিগুণ হয়ে যেত বলে মনে করেন অনেক ব্যাংকার।

বিজ্ঞাপন

কেন্দ্রীয় ব্যাংক গ্রাহকদের মেয়াদি ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ দেওয়ার ফলে গ্রাহকেরা স্বস্তি পাবেন বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, বিতরণ করা ঋণের ৭০ শতাংশই মেয়াদি ঋণ।

ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মঈনউদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, সুযোগ পেলেও ভালো গ্রাহকেরা ঋণ শোধ করে গেছেন। তাঁরা কেন সুদের চাপ নেবেন? এই সুবিধা খারাপ ব্যবসায়ীদের জন্য ভালো হয়েছিল। নতুন করে সময় না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত যৌক্তিক। মেয়াদি ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ দেওয়ায় কিস্তির পরিমাণ কমে আসবে। এতে ব্যবসায়ীরা স্বস্তিতে থাকবেন। তবে এতে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে আসতে পারে।

করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হলে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মিলে কম সুদের এক লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। বড়, ছোট সব ধরনের ব্যবসার জন্য দেওয়া হয় এই ঋণসুবিধা। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বাজারে তহবিল জোগান দেয়।

ব্যাংক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন