বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় এটি ছিল একটি বিরল ঘটনা। কারণ, এখন বিশ্বের কোনো দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার বেঁধে দেয় না। বাজারব্যবস্থার ওপরই সুদহার ওঠানামা করে।

দেশে ঋণের সুদহার বেঁধে দেওয়া ও করোনার প্রকোপ শুরু হয় গত বছরের একই সময়ে। ফলে ঋণের চাহিদা একেবারে কমে যায়। ব্যবসায়ীরাও নতুন বিনিয়োগ বন্ধ করে দেন। আর বিদেশ ভ্রমণ কমে যাওয়া, প্রবাসী আয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোতে তারল্য বা অলস অর্থ বেড়ে যায়। তার প্রভাবে কোনো কোনো ব্যাংকের ঋণের সুদ সাড়ে ৬ শতাংশ পর্যন্ত নেমে আসে। আর কোনো কোনো ব্যাংকে আমানতের সুদহার নেমে আসে আড়াই শতাংশে।

ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের সুদহার কত হবে, এ সময়ে এসে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়ার কথা নয়। সুদহারের বিষয়টি অনেক আগেই বাজারব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আর্থিক খাতের সংস্কার শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সাল থেকে। বিশ্বব্যাংকের ঋণসহায়তার একটি প্রকল্পের মাধ্যমে। ওই প্রকল্পের অন্যতম পদক্ষেপ ছিল বাজারভিত্তিক সুদব্যবস্থা চালু করা। শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের একটি পরিসীমা ঠিক করে দিত, সেই সীমার মধ্যেই সুদহার ওঠানামা করত। পরে ওই সীমাও তুলে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর তখন থেকে ব্যাংকগুলো তার চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে সুদহার ঠিক করে আসছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব ছিল কেবল পরামর্শ দেওয়া। আর ঋণ ও আমানতের সুদহারের পার্থক্য (স্প্রেড) ঠিক করে দেওয়া।

কিন্তু গত বছর নেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বিপাকে পড়েন আমানতকারীরা। আগের সেই ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল দিতে আরেকটি ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ঋণের পর এবার আমানতের সুদহারও বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তিন মাসের মূল্যস্ফীতির গড়ের চেয়ে আমানতের সুদ কম হতে পারবে না বলে নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে গতকাল রোববার। এতে সাময়িকভাবে আমানতকারীরা হয়তো বর্তমানের চেয়ে একটু বাড়তি সুদ পাবেন। কিন্তু ঋণের সুদ বেঁধে দেওয়ার ফলে ব্যাংকগুলোতে যে হযবরল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, একইভাবে এবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যাংকাররা। কারণ, আমানতের সুদ বাড়ালেও হঠাৎ করে ঋণের সুদ বাড়াতে পারবে না ব্যাংকগুলো। এ জন্য অপেক্ষা করতে হবে নতুন ঋণ প্রদান পর্যন্ত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্ত ব্যাংক খাতে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে—এ নিয়ে জানতে চাইলে ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী আজ সোমবার সকালে বলেন, ‘হঠাৎ আমানতের সুদ বেঁধে দেওয়ায় আমাদের বছরে ২০০ কোটি টাকা আয় কমে যাবে। কারণ, আগের চেয়ে আমানতকারীদের বেশি সুদ দিতে হবে। ঋণের সুদ ৯ শতাংশের বেশি নেওয়া যাবে না। আগে সাধারণ আমানতকারীরা ঠকলেও ব্যবসায়ীরা লাভবান হয়েছেন। এখন ব্যবসায়ীদের সুদ কিছুটা বেড়ে সাধারণ আমানতকারীরা লাভবান হবেন।’

নতুন এই সিদ্ধান্ত আমানতকারীদের জন্য আপাত ভালো হয়েছে মন্তব্য করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এভাবে সুদহার নির্ধারণ করে দেওয়া ঠিক নয়। তিনি বাজারব্যবস্থার ওপর ‘সুদহার’ ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন।

সুদহারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দিয়ে ব্যাংক সংস্কার ও ব্যাংক খাতের ঋণ অনিয়ম বন্ধ এবং অর্থ পাচার ঠেকাতে মনোযোগ দিতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অনানুষ্ঠানিকভাবে আমানত ও ঋণের সুদহার তদারকি করতে পারে, যেভাবে ডলারের দাম স্থির করে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এটাই এখন সবার চাওয়া।

ব্যাংক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন