default-image

আলোচিত প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদার দেশছাড়া। নামসর্বস্ব যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে টাকা বের করেছিলেন, তার কয়েকটি হঠাৎ নাই হয়ে গেছে। যেসব ভবনে তাঁর অফিসগুলো ভাড়া ছিল, সেগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আর অন্য যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তার কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়েছে। কর্মকর্তাদের কেউ কেউ জেলে, অন্যরা অফিস করছেন না।

আর যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান পি কে হালদার দখল করেছিলেন, তা এখনো নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। তাঁর মনোনীত পর্ষদ ও কর্মকর্তারা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করছেন। তবে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারছেন না। এরপরও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আর পি কে হালদারের কিছু সহযোগী ধরা পড়লেও বেশির ভাগ এখনো বহাল তবিয়তে। এই হলো একনজরে পি কে হালদারের কর্মকাণ্ডের সবশেষ পরিস্থিতি।

বিজ্ঞাপন

পি কে হালদার হলেন রিলায়েন্স ফাইন্যান্স ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। আর এসব কাজে তাঁকে সব ধরনের সমর্থন ও সহায়তা দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা। ফলে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখনো পি কে হালদারের নিয়ন্ত্রণে রয়ে গেছে। কোনো ধরনের উন্নতিও হচ্ছে না।

এর বাইরে নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে পি কে হালদার গড়ে তুলেছেন একাধিক প্রতিষ্ঠান। কাগজে-কলমে এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় আছেন পি কে হালদারের মা লীলাবতী হালদার, ভাই প্রীতিশ কুমার হালদার ও তাঁর স্ত্রী সুস্মিতা সাহা, খালাতো ভাই অমিতাভ অধিকারী, অভিজিৎ অধিকারীসহ আত্মীয়স্বজন। আবার ব্যাংক এশিয়ার সাবেক এমডি ইরফানউদ্দিন আহমেদ ও সাবেক সহকর্মী উজ্জ্বল কুমার নন্দীও আছেন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায়। এর মধ্যে উজ্জ্বল কুমার নন্দী দুদকের রিমান্ড শেষে এখন কারাগারে।

হঠাৎ উধাও সব প্রতিষ্ঠান

ঋণ নিতে ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে কাগজে-কলমে যত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়, তার বেশির ভাগের ঠিকানা ছিল পুরানা পল্টনের ইস্টার্ন ট্রেড সেন্টারের ১০ তলা। ইস্টার্ন ট্রেড সেন্টারের ১০ তলায় সুকুমার মৃধা প্রায় ২২ বছর ধরে আইনি ব্যবসা করছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম সুকুমার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস। এটি কর ও কোম্পানি আইনবিষয়ক প্রতিষ্ঠান। আর এ সুযোগেই তাঁর হাত ধরেই গড়ে ওঠে পি কে হালদারের বিভিন্ন নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান।

দীর্ঘদিন ধরে পি কে হালদার ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কর ফাইলের কাজ করেন সুকুমার মৃধা। এ সূত্র ধরেই ওই ভবনের ১০ তলার পুরোটাই পি কে হালদারের বেনামি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ওই ১০ তলার ঠিকানা ব্যবহার করেই হাল ইন্টারন্যাশনাল, হাল এন্টারপ্রাইজ, সুখাদা লিমিটেড, সন্দ্বীপ ইন্টারন্যাশনাল, উইন্টেল ইন্টারন্যাশনাল, বর্ণা, ইমেক্সো, আরবি এন্টারপ্রাইজ, এসএ এন্টারপ্রাইজসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন করা হয়। আর এমন ৩০টি প্রতিষ্ঠানের নামেই ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে বের করা হয় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা।

পি কে হালদার নিয়ে অনুসন্ধানের জন্য ২০১৯ সালে ইস্টার্ন ট্রেড সেন্টারে গেলে সুকুমার মৃধার সঙ্গে কথা হয়েছিল। তখন ট্রেড সেন্টারের পুরো ১০ তলাতেই তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলোর সাইনবোর্ড ঝোলানো ছিল। এখন সুকুমার মৃধা মেয়েসহ কারাগারে।

বিজ্ঞাপন

উইন্টেল ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক সুকুমার মৃধার মেয়ে অনিন্দিতা মৃধা। ওই প্রতিষ্ঠান এফএএস ফাইন্যান্স থেকে ৪০ কোটি টাকা ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ৬০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আর পরিশোধ করছে না। আবার সুকুমার মৃধার মেয়ের নামে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিআইএফসির শেয়ারও কেনা হয়।

এই ইস্টার্ন ট্রেড সেন্টারে গত বুধবার গিয়ে দেখা যায়, সুকুমার মৃধার কার্যালয় ছাড়া পি কে হালদারের আর কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। পি কে হালদারের প্রতিষ্ঠানের জন্য যে কক্ষগুলো ভাড়া নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে নতুন প্রতিষ্ঠানও ভাড়া এসে গেছে। নতুনদের কেউ জানে না আগে কারা ভাড়া নিয়েছিল।

এর মধ্যে টিকিট বিক্রেতা আজগর আলী জানান, আগে কে ভাড়ায় ছিল, তা জানেন না।

সুকুমার মৃধার চেম্বারে প্রায় ১০ বছর ধরে কাজ করেন মো. জুয়েল। তিনি বলেন, ‘অন্য অফিসগুলো করোনা শুরু হওয়ার পরই ছেড়ে দিয়েছে। আসলে এগুলো কোনো অফিস ছিল না। শুরুতে কিছু নথিপত্র তৈরি হতো। পরে কেউ আসতেন না। আমরাই সকালে এসব কক্ষের তালা খুলে দিতাম। এর বেশি কিছু জানি না।’

একই অবস্থা ডিএইচ টাওয়ারের

কারওয়ান বাজারের ডিএইচ টাওয়ারের ৮ ও ১৪ তলা জুড়ে ছিল রেপটাইলস ফার্ম, আনন কেমিক্যাল, নর্দান জুট, রহমান কেমিক্যাল, আজিজ ফাইবারসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়। এর সবই পি কে হালদারের। ২০১৯ সালের ২১ ডিসেম্বরে ডিএইচ টাওয়ারে কথা হয়েছিল উজ্জ্বল কুমার নন্দীর সঙ্গে। এখন উজ্জ্বল কুমার নন্দী কারাগারে। আর ফাঁকা হয়ে গেছে এসব প্রতিষ্ঠান। কর্মচারী ছাড়া তেমন কোনো কর্মকর্তা অফিসে আসছেন না।

গত বৃহস্পতিবার ডিএইচ টাওয়ারে গিয়ে দেখা যায়, ৮ম তলা ছেড়ে দিয়েছে পি কে হালদারের প্রতিষ্ঠানগুলো। ওই তলার সব অফিস ১৪ তলায় স্থানান্তর করা হয়েছে।

পিঅ্যান্ডএল সিকিউরিটির কর্মীরা পাহারা দিচ্ছেন। কথা বলার মতো কেউ নেই বলে জানান।

উজ্জ্বল কুমার নন্দী ২০১০ সাল পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইআইডিএফসির কোম্পানি সচিব ছিলেন। ২০১৩ সালের অক্টোবরে তাঁকে এফএএস ফাইন্যান্সের পরিচালক করেন পি কে হালদার। এরপর তাঁকে আনন কেমিক্যাল ও পিপলস লিজিংয়ের চেয়ারম্যান করা হয়। একই সঙ্গে উজ্জ্বল নন্দীকে নর্দান জুট, রহমান কেমিক্যাল, ক্লিউইস্টন ফুডের চেয়ারম্যানের পদ দেন পি কে হালদার। কক্সবাজারের নির্মাণাধীন র‌্যাডিসন হোটেলে ক্লিউইস্টন ফুডের মালিকানাধীন, যার মালিকানার বড় অংশই পি কে হালদারের।

নিরাপত্তারক্ষী সিদ্দিকুর রহমান জানান, ‘কোনো স্যার অফিসে আসেন না। সব অফিস মিলে ২৫-৩০ জন আছেন। কথা বলার মতো কেউ নেই।’

default-image

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হালচাল: বিআইএফসি ও পিপলস লিজিং

শেয়ারবাজার থেকে শেয়ার কিনে চারটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেন পি কে হালদার। বিআইএফসির নিয়ন্ত্রণ সুকুজা ভেঞ্চার ও কাঞ্চি ভেঞ্চার নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের হাতে। সুকুজা ভেঞ্চারের শেয়ার সুখাদা লিমিটেড ও সুকুমার মৃধার মেয়ে অনিন্দিতা মৃধার হাতে। এর মধ্যে অনিন্দিতা মৃধার শেয়ারই ৯০ শতাংশ। আর সুখাদা লিমিটেডের মনোনীত পরিচালক ব্যাংক এশিয়ার সাবেক এমডি ইরফানউদ্দিন আহমেদ। আর কাঞ্চি ভেঞ্চারের ৯৫ শতাংশ শেয়ার হাল ইন্টারন্যাশনালের হাতে, যার প্রতিনিধিও ইরফানউদ্দিন আহমেদ। ২০১৭ সাল থেকে পি কে হালদারের প্রতিনিধিরাই বিআইএফসি পরিচালনা করে। সম্প্রতি আদালত চেয়ারম্যান ও কয়েকজন পরিচালক নিয়োগ দিয়েছেন। বিআইএফসির ঋণের ৯৮ শতাংশ খেলাপি। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ নেন সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান।

বিআইএফসিতে গিয়ে দেখা যায়, দুজন আমানতকারী টাকার জন্য অপেক্ষা করছেন। ২০১৪ সাল থেকে টাকা ফেরত পাচ্ছেন না।

বিআইএফসির এমডি (চলতি দায়িত্বে) এ কে এম আশফাকুর রহমান চৌধুরী বলেন, আদালতের আদেশে পর্ষদে পরিবর্তন এসেছে। তবে আর্থিক অবস্থান আগের মতোই রয়ে গেছে।

পিপলস লিজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ ছিল আনন কেমিক্যাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের। আবার আনন কেমিক্যালের ৯৪ শতাংশ শেয়ার প্রীতিশ কুমার হালদারের হাতে। টাকা ফেরত দিতে না পারায় লিজিংটিতে অবসায়ক নিয়োগ দিয়েছেন আদালত।

বিজ্ঞাপন

এফএএস ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং

এফএএস ফাইন্যান্সের নিয়ন্ত্রণ পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল ও রেপটাইলস ফার্মের হাতে। আবার রেপটাইলস ফার্মের মালিকানায় আছে পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল, কেএইচবি সিকিউরিটিজের এমডি রাজীব সোম ও তাঁর স্ত্রী শিমু রায়। সবকিছুর মালিক মূলত পি কে হালদারই। ২০১৫-১৭ সালের মধ্যে বিভিন্ন নামে প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ১৮১ কোটি টাকার সুবিধাভোগী পি কে হালদার একাই, যে টাকা আর ফেরত আসছে না, গ্রাহকদেরও টাকা ফেরত দিতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।

গত রোববার এফএএসের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, জিএসপি ফাইন্যান্সের এক কর্মচারী অপেক্ষা করছেন। টাকার জন্য কয়েকবার এসেছেন।

পি কে হালদারের দখল করা এফএএস ফাইন্যান্সের এমডি হয়েছেন প্রীতিশ কুমার সরকার। তিনি বলেন, ‘পি কে হালদারের সংশ্লিষ্ট কোনো ঋণ আদায় হচ্ছে না। অন্য ঋণ কিছু আদায় হচ্ছে। গত বছর ৪০ কোটি টাকা আদায় হয়েছে ও ৩৮ কোটি টাকা গ্রাহকদের শোধ করা হয়েছে। এখন নতুন কেউ প্রতিষ্ঠানটির মালিকানায় যুক্ত হলে ভালো হয়।’

আর ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ হাল ইন্টারন্যাশনাল, বিআর ইন্টারন্যাশনাল, নেচার এন্টারপ্রাইজ, নিউ টেক এন্টারপ্রাইজের হাতে। এসব প্রতিষ্ঠান ২০১৫ সালে কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। হাল ইন্টারন্যাশনালের ৭০ শতাংশ শেয়ারের মালিক পি কে হালদার। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং একসময় ভালো চলছিল। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরই প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে পড়ে। প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠানের নামে বের করে নেওয়া হয় ২ হাজার ২৯ কোটি টাকা। এর সব কটির সুবিধাভোগীও পি কে হালদার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আদালতের নির্দেশে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন সাবেক সচিব নজরুল ইসলাম খান। তবে পি কে হালদারের পক্ষের পরিচালক ও কর্মকর্তারাই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন। এসব পরিচালক ও কর্মকর্তার ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ টাকা লেনদেন হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে এসেছে।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘প্রায় ৬০ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে। ছোট আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ৩৫১ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন ও আত্মসাতের অভিযোগে পি কে হালদারসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা করেছে দুদক। এ মামলায় অন্যতম আসামি ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পরিচালক আনোয়ারুল কবীর, মো. নুরুল আলম, নাসিম আনোয়ার, মো. নুরুজ্জামান, মোহম্মদ আবুল হাসেম, জহিরুল আলম, নওশেরুল ইসলাম, মিজানুর রহমান, বাসুদেব ব্যানার্জি ও তাঁর স্ত্রী পাপিয়া ব্যানার্জি। এ ছাড়া লিজিংয়ের ভারপ্রাপ্ত এমডি সৈয়দ আবেদ হাসান, ভাইস প্রেসিডেন্ট নাহিদা রুনাই, অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আল মামুন সোহাগ, সিনিয়র ম্যানেজার রাফসান রিয়াদ চৌধুরী এবং কোম্পানি সেক্রেটারি রফিকুল ইসলাম খানকেও মামলায় আসামি করা হয়েছে। মামলার আসামিদের বেশির ভাগই পি কে হালদারের মনোনীত। ফলে লিজিংটি এখনো পুরোপুরি তাঁর নিয়ন্ত্রণে রয়ে গেছে।

ব্যাংক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন