বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এত দিন সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালীসহ সব সরকারি ব্যাংকের সঙ্গে এপিএ করে আসছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এবার নিয়ন্ত্রক সংস্থার দিকে হাত বাড়িয়েছে বিভাগটি। রাষ্ট্র খাতের ব্যাংকগুলো তদারকির জন্য ২০১০ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ে নতুন করে তৈরি করা হয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, এখন যা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। অথচ ১৯৯৪ সালে বিএনপি আমলে শুরু হওয়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ বিভাগটি ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারই বাতিল করে দিয়েছিল। এখন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ শুধু সরকারি ব্যাংক নয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংককেও তদারকি করতে শুরু করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাওয়ার বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালিত হয় বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার অনুযায়ী। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলো পরিচালিত করে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী। পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পৃথক আইন ও আরও বেশ কিছু আইন রয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাস্তবায়ন করে।

আইনে কী আছে

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২ অনুযায়ী, শুরু থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সরকারের হাতে ছিল। তবে স্বায়ত্তশাসন বাড়াতে ২০০৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের ৯(১) ধারাটি প্রত্যাহার করে সেই ক্ষমতা বাতিল করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার অনুযায়ী, কো–অর্ডিনেশন কাউন্সিল রয়েছে, যার প্রধান অর্থমন্ত্রী। এই কাউন্সিল রাজস্বনীতি, মুদ্রানীতি ও মুদ্রা বিনিময় হারের নীতি সমন্বয়ের জন্য কাজ করবে। এর সদস্য হবেন বাণিজ্যমন্ত্রী, গভর্নর, অর্থসচিব, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব এবং পরিকল্পনা কমিশনের একজন সদস্য। এই সমন্বয় কমিটি সামষ্টিক অর্থনীতির যে কাঠামো প্রণয়ন করবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিতে তার প্রতিফলন থাকতে হবে।

তিন মাস পরপর অনুষ্ঠিত এ সভায় অনুষ্ঠিত হবে। ওই সভার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা সম্প্রসারণ, ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ সম্পর্কে তথ্য উপস্থাপন করবে। পাশাপাশি লেনদেন ভারসাম্য ও মুদ্রা সরবরাহ বিবেচনায় নিয়ে সরকারের আর্থিক নীতিকৌশল মূল্যায়ন জমা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এর বাইরে সরকারের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিয়ন্ত্রণের কোনো ক্ষমতা নেই। যদিও এখন অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নিয়মিত বিভিন্ন নির্দেশনা ও নীতিকৌশল চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যাতে সুবিধা পাচ্ছে বিশেষ কয়েকটি ব্যবসায়িক গ্রুপ।

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২ অনুযায়ী, বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল কাজ ছয়টি। যেমন, মুদ্রানীতি প্রণয়ন, বৈদেশিক বিনিময় বাজারে হস্তক্ষেপের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, মুদ্রানীতির আলোচনায় সরকারের অন্যান্য নীতির ওপর প্রভাব ও সমন্বয়ের জন্য সরকারকে পরামর্শ দেওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রাখা ও ব্যবস্থাপনা, নোট ইস্যু ও স্থিতিশীল বিনিময় হার ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ব্যাংক কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদারি ও তদারকি করা।

বাংলাদেশ ব্যাংকেরও উন্নয়ন ও জবাবদিহির প্রয়োজন আছে। তবে সেটা অর্থ মন্ত্রণালয় বা কোনো মন্ত্রণালয়ের কাছে নয়। অন্য দেশের গভর্নররা সিনেটে গিয়ে জবাবদিহি করে। বাংলাদেশে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে গভর্নর জবাবদিহি করতে পারেন। অর্থ মন্ত্রণালয় এমন উদ্যোগ নিলে সেটা একেবারেই গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ, আইনে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তদারকির ক্ষমতা কারও নেই।
সালেহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

চিঠিতে যা বলা হয়েছে

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক পরিচালিত এপিএ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারের সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য এ বিভাগের এপিএ প্রণয়নে আর্থিক খাতের কৌশলগত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যমাত্রাগুলো সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের ওপর নির্ধারণ হয়ে থাকে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলোর মধ্যে এপিএতে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল, ই-গভর্ন্যান্স, তথ্য অধিকার, অভিযোগ নিষ্পত্তি ও সিটিজেনস চার্টারসংক্রান্ত কার্যক্রম ও কর্মপরিকল্পনা উল্লেখ করা আছে, যা সরকারি সব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়নের নির্দেশনা রয়েছে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি ও আইডিআরএ–কে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (এপিএ) প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকেরও উন্নয়ন ও জবাবদিহির প্রয়োজন আছে। তবে সেটা অর্থ মন্ত্রণালয় বা কোনো মন্ত্রণালয়ের কাছে নয়। অন্য দেশের গভর্নররা সিনেটে গিয়ে জবাবদিহি করে। বাংলাদেশে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে গভর্নর জবাবদিহি করতে পারেন। অর্থ মন্ত্রণালয় এমন উদ্যোগ নিলে সেটা একেবারেই গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ, আইনে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তদারকির ক্ষমতা কারও নেই।’

যা হচ্ছে

বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা এখন দুইভাবে মূল্যায়ন করা হয়। যেমন, নীতি গ্রহণের স্বাধীনতা ও পরিচালনার স্বাধীনতা। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর সরকার নতুন ব্যাংক দেওয়ার ঘোষণা দেয়। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৩১ ধারা অনুযায়ী, নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ জানিয়ে দেয় যে বাংলাদেশে নতুন করে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার দরকার নেই। কিন্তু রাজনৈতিক চাপে এই বাংলাদেশ ব্যাংকই পরে উল্টো যুক্ত দিয়ে নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নেয়। আর এখন তো কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নানা নির্দেশনা দিচ্ছে, ডেপুটি গভর্নরদের ডেকে বিভিন্ন সিদ্ধান্তও দিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক–সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ফেরাতে প্রয়োজন বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এ ছাড়া খাতটি সঠিক পথে ফিরবে না।

ব্যাংক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন