বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, দেশে মূল্যস্ফীতি এখন ঊর্ধ্বমুখী ধারায় রয়েছে। সর্বশেষ গত মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ।

এদিকে, ক্রেডিট কার্ডে মানুষের ঋণ করার প্রবণতা বেশি বেড়েছে গত মার্চ থেকে। ওই মাসে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আড়াই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ। এরপর গত এপ্রিলে ক্রেডিট কার্ডের ঋণের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় উঠে যায়। এপ্রিলে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা। সর্বশেষ মে মাসে এ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বেশ কয়েকটি কারণে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে। প্রথমত গত বছরের তুলনায় এ বছর সব ধরনের পণ্যমূল্যই বেড়ে গেছে। তাতে একই ধরনের পণ্য কিনতে মানুষকে গত বছরের চেয়ে বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। এ ছাড়া গত বছরের তুলনায় বিদেশ যাত্রাও বেড়েছে এ বছর। তাতেও ক্রেডিট কার্ডের লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে থাকতে পারে। অর্থাৎ ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন বৃদ্ধির পেছনে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির একটি বড় প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা। এপ্রিল–মে মাসে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন বৃদ্ধির পেছনে ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটাও বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন তাঁরা।

সাধারণত ক্রেডিট কার্ডে কেনাকাটার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিনা সুদে ঋণসুবিধা মেলে। এ ছাড়া ইলেকট্রনিক সামগ্রীসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য কেনার ক্ষেত্রে মেলে কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুবিধা। আবার বিদেশ যাত্রায় বা দেশের ভেতরে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নানা ধরনের ছাড়ও পাওয়া যায় ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের ক্ষেত্রে। এ কারণে মানুষ খরচের চাপ কমাতে বা নানা ধরনের ছাড়ের সুবিধা নিতে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, করোনার কারণে গত কয়েক বছরে মানুষের মধ্যে অনলাইন লেনদেনের আগ্রহ বেড়েছে। আবার করোনা–পরবর্তী সময়ে সব ধরনের পণ্যমূল্য বেড়ে গেছে। মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে একই পণ্য কিনতে আগের চেয়ে বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার এটিও একটি কারণ। এ ছাড়া ক্রেডিট কার্ডে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সুবিধা থাকে। পাশাপাশি কিস্তিতে পণ্য কেনাসহ নানা ধরনের ছাড়ের সুবিধাও থাকে। এসব কারণে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে।

তবে গত ৯ জুন ঘোষিত বাজেটে ক্রেডিট কার্ড গ্রহণের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থাৎ এখন থেকে ক্রেডিট কার্ড নিতে শুধু কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন থাকলেই চলবে না, রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্রও জমা দিতে হবে। এর ফলে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যাংকাররা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন–সংক্রান্ত তথ্যে জুনের হিসাবটি এখনো যুক্ত হয়নি। তাই সর্বশেষ মাসটিতে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ বাড়ল নাকি কমল, তা এখনই জানা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, মে মাস শেষে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৪১ হাজার ১৬২। এপ্রিলে এ সংখ্যা ছিল ১৯ লাখ ২২ হাজার ২৭৩। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৯ হাজার।

গত বছরের মে মাসের তুলনায় এ বছরের মে মাসে এসে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ ৩৯ শতাংশ বাড়লেও এ সময়ে ডেবিট কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে মাত্র ১৬ শতাংশ। গত বছরের মে মাসে ডেবিট কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। সর্বশেষ গত মে মাসে তা বেড়ে হয়েছে ২৬ হাজার ৫১ কোটি টাকা। তাতে দেখা যাচ্ছে, শতাংশের বিচারে ডেবিট কার্ডের তুলনায় ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণের বেশি।

বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্যাংকের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের নেটওয়ার্ক সরবরাহকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান মাস্টারকার্ডের এ দেশীয় ব্যবস্থাপক বা কান্ট্রি ম্যানেজার সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, মানুষের মধ্যে দিন দিন ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে। কারণ, ক্রেডিট কার্ডে কেনাকাটায় কিস্তি সুবিধা যেমন আছে, তেমনি মেলে নানা ধরনের ছাড়। এ ছাড়া ক্রেডিট কার্ড লেনদেন বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত বিনা সুদে ঋণসুবিধা পাওয়া যায়।

ব্যাংক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন