default-image

‘কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’—এটা হচ্ছে বাঙালি জীবনের বহুল শ্রুত একটি প্রবাদ। কিন্তু এই প্রবাদ উল্টে দিয়েছে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর। সঞ্চয় অধিদপ্তরের কর্মকাণ্ডে এখন বলতে হবে ‘কাজির গরু গোয়ালে আছে, কেতাবে নেই’।

কীভাবে—এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, সঞ্চয়পত্রে এখন সর্বোচ্চ কত টাকা বিনিয়োগ করা যায়, তা কাগজে-কলমে লেখা নেই কোথাও। অধিদপ্তর এক বছরের বেশি সময় ধরে চেষ্টা করেও সর্বোচ্চ বিনিয়োগসীমার প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারেনি, অথচ বাস্তবে গ্রাহকেরা নির্দিষ্ট একটি সীমার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে পারছেন না। সঞ্চয় অধিদপ্তর বরং ‘সঞ্চয় আমানত সংশ্লিষ্ট তথ্য সংবলিত সহায়ক পুস্তিকা’ এবং ওয়েবসাইটে বিভ্রান্তিকর ও অসম্পূর্ণ তথ্য দিয়ে রেখেছে। যেমন অধিদপ্তর বলছে, ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র একক নামে ৩০ লাখ ও যুগ্ম নামে ৬০ লাখ টাকার কেনা যায়। এমনকি নাবালকের নামেও কেনা যায়। ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রও কেনা যায় একক নামে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ ও যুগ্ম নামে ৬০ লাখ টাকার। পেনশনার সঞ্চয়পত্র কেনা যায় শুধু একক নামে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকার। এদিকে পরিবার সঞ্চয়পত্র কেনা যায় একক নামে সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকার।

বিজ্ঞাপন

অধিদপ্তর আরও বলছে, এগুলো হারিয়ে গেলে, পুড়ে গেলে বা নষ্ট হলে ডুপ্লিকেট সঞ্চয়পত্র ইস্যু করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক, সঞ্চয় অধিদপ্তরের শাখা, ডাকঘর ইত্যাদি যেসব জায়গা থেকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা হয়, সেসব জায়গায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন নাবালকের নামে সঞ্চয়পত্র কেনা যায় না। সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে কোনো সনদও দেওয়া হয় না এখন। ফলে হারিয়ে গেলে, পুড়ে গেলে বা নষ্ট হলে ডুপ্লিকেট সঞ্চয়পত্র ইস্যু করার প্রশ্নই ওঠে না।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘সঞ্চয় অধিদপ্তর খামখেয়ালি করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ওয়েবসাইট থেকে সাধারণ তথ্যগুলো জানতে পারলে মানুষের উপকার হয়, কিন্তু সে উপায় তারা রাখেনি। সিদ্ধান্ত যেহেতু আছে, একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে দিলেই হয়ে যায়। কেন করছে না, সে রহস্য অধিদপ্তরই ভালো জানে।’

বাস্তবে বিনিয়োগসীমা কত

একজন গ্রাহক একক নামে এখন ৫০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন। একক নামে কেউ না কিনতে চাইলে যৌথ নামে কিনতে পারেন এক কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র। পেনশনার সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকের ক্ষেত্রে এই ঊর্ধ্বসীমা ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

অথচ এ কথা বলা নেই কোথাও। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি), অর্থ বিভাগ ও সঞ্চয় অধিদপ্তর—কেউ এ ব্যাপারে কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করেনি। বিষয়টি আছে শুধু অর্থ বিভাগের আওতায় চালু ‘জাতীয় সঞ্চয়স্কিম অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ শীর্ষক সফটওয়্যারে। এ সফটওয়্যারের সহায়তায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা হচ্ছে ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে।

বিজ্ঞাপন

একক ও যৌথ নামে কী পরিমাণ সঞ্চয়পত্র কেনা যাবে, এ নিয়ে একটি নির্দেশনা জারির চেষ্টা চলছে ২০১৯ সালের ১ আগস্ট থেকে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত অর্থ বিভাগের নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনা কমিটির (সিডিএমসি) বৈঠকে এ নিয়ে সঞ্চয় অধিদপ্তরকে তাগিদ দেওয়া হয়।

বৈঠকে বলা হয়, ‘৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ও পরিবার সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা বিদ্যমান নীতিমালায় যা-ই থাকুক না কেন, তিনটি স্কিম মিলে একক নামে ৫০ লাখ অথবা যৌথ নামে ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করার বিষয়ে নির্দেশনা জারি করতে হবে।’ একটি সূত্র জানায়, নির্দেশনা জারির আগেই যেহেতু ঊর্ধ্বসীমার সঞ্চয়পত্র কেনা যাচ্ছে, তাই এ নিয়ে কারও গরজ নেই।

সঞ্চয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সামছুন্নাহার বেগম গত ২৭ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোকে বলেন, ‘নির্দেশনা জারির চেষ্টা চলছে। একটু সময় লাগেই।’

মন্তব্য পড়ুন 0