default-image

একটি শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যম সারির কর্মকর্তা রাফিউল হোসেন প্রায় ১০ বছর ধরে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছেন। তিনি এ কার্ড ব্যবহার করে নিয়মিত বাজার করেন, নিজের ও পরিবারের অন্য সব কেনাকাটাও সারেন। এভাবে যে টাকা খরচ হয়, তা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শোধ করে দেন। ফলে কখনো তাঁকে কার্ড ব্যবহারের জন্য সুদ বা অতিরিক্ত মাশুল দিতে হয়নি। সে জন্য ক্রেডিট কার্ডকে তিনি বিনা সুদে টাকা ধার পাওয়ার সুবিধা বলে মনে করেন।

রাফিউল হোসেন বলেন, ‘সুদের হিসাব না থাকলেও পরিবারের সদস্য কিংবা বন্ধু–সহকর্মীদের কাছ থেকে বারবার টাকা ধার করতে লজ্জা হয়। তাই ক্রেডিট কার্ড হলো আমার জীবনের সঙ্গী। বিপদে-আপদে খরচের পাশাপাশি বিনোদনেও এ কার্ড ব্যবহার করছি।’

বিজ্ঞাপন

বিশ্বের সব উন্নত দেশে ক্রেডিট কার্ড এখন বহুল প্রচলিত একটি আর্থিক পণ্য। নগদ টাকার বিকল্প হয়ে ওঠায় এ কার্ডকে প্লাস্টিক মানিও বলা হয়ে থাকে। প্রতি দেড় মাস পর কেনাকাটা মানে খরচের টাকা পরিশোধ করলে কোনো সুদ দিতে হয় না। সে জন্য পৃথিবীজুড়ে দিন দিন ক্রেডিট কার্ড বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বাংলাদেশেও বাড়ছে ক্রেডিট কার্ডের জনপ্রিয়তা। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৭ লাখ ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে প্রতি মাসে দেড় হাজার কোটি টাকার মতো লেনদেন হচ্ছে। এভাবে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় নগদ টাকা বহনের ঝুঁকি তথা এর মাধ্যমে লেনদেন কমে আসছে।

তবে বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ড এখনো মূলত রাজধানী ও বিভাগীয় শহরগুলোতেই সীমাবদ্ধ। অবশ্য ব্যাংকগুলো ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক বাড়াতে কমবেশি চেষ্টা করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও সময় সময়ে তাদের নীতি–সহায়তা দিচ্ছে।

জানতে চাইলে প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান ও. রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ক্রেডিট কার্ড যেমন খরচের সামর্থ্য বাড়ায়, একইভাবে স্বচ্ছন্দে ব্যবহারের সুযোগ দেয়। তবে ১৬ কোটি মানুষের এ দেশে এখনো ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক খুবই কম। এর কারণ, কার্ড ব্যবহারের অবকাঠামো সেভাবে গড়ে তোলা যায়নি। এ জন্য ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কে প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।’

ক্রেডিট কার্ড যেমন খরচের সামর্থ্য বাড়ায়, একইভাবে স্বচ্ছন্দে ব্যবহারের সুযোগ দেয়। তবে ১৬ কোটি মানুষের এ দেশে এখনো ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক খুবই কম। তাই ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কে প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।
হাসান ও. রশীদ ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রাইম ব্যাংক

বাংলাদেশে ১৯৯৭ সালে তৎকালীন এএনজেড গ্রিন্ডলেজ ব্যাংক (বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড) প্রথম ক্রেডিট কার্ড সেবা নিয়ে আসে। কাছাকাছি সময়ে তৎকালীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ভনিক বাংলাদেশ (এখন লংকাবাংলা ফাইন্যান্স) ও ন্যাশনাল ব্যাংক সেবাটি চালু করে। এরপর এক এক করে অন্য ব্যাংকগুলোও এ সেবায় মনোযোগী হয়। বর্তমানে দেশে ৪০টির মতো ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড সেবা দিচ্ছে। প্রায় সব ব্যাংকেরই রয়েছে ভিসা ও মাস্টারকার্ড ব্র্যান্ডের কার্ড সেবা। তবে এর বাইরে কয়েকটি ব্যাংক কার্ড সেবাকে অভিনবত্ব দিতে অন্য ব্র্যান্ডের কার্ডও এনেছে। যেমন সিটি ব্যাংক অ্যামেক্স, প্রাইম ব্যাংক জেবিসি, ইস্টার্ণ ব্যাংক লিমিটেড (ইবিএল) ডিনার্স ক্লাব, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক নেক্সাস পে ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ইউনিয়ন পে ইন্টারন্যাশনাল কার্ড সেবা দিচ্ছে।

ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে গ্রাহকেরা নির্দিষ্ট পরিমাণ কেনাকাটা ও ঋণ নিতে পারেন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এ দেশের কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে বিদেশেও। তাই টাকার পাশাপাশি ডলারেও ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে। দেশে-বিদেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে হোটেল বুকিং, থাকা–খাওয়া, ভ্রমণ, বিমানভাড়া, রেস্টুরেন্ট ও কেনাকাটার বিল পরিশোধে মিলছে নানা ছাড় ও পয়েন্ট জেতার সুযোগ। অর্থাৎ কার্ড ব্যবহারকারীদের জন্যই বিশেষ সুবিধা বেশি। এর ওপর সময়মতো কার্ডের টাকা পরিশোধ করলে কোনো সুদ দিতে হয় না।

বিজ্ঞাপন
default-image

বর্তমানে দেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবসায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে দেশীয় মালিকানাধীন দি সিটি ব্যাংক। মূলত দেশের বাজারে আমেরিকান এক্সপ্রেস বা অ্যামেক্স কার্ড প্রচলনের সুবাদেই এগিয়ে গেছে ব্যাংকটি। এ ছাড়া ক্রেডিট কার্ডে ভালো ব্যবসা করছে ব্র্যাক, ইস্টার্ণ ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক (এসসিবি)।

করোনাভাইরাসের কারণে গ্রাহকেরা এখন ব্যাংকের শাখার পরিবর্তে অটোমেটেড টেলার মেশিন (এটিএম) ও পয়েন্ট অব সেলসে (পিওএস) গিয়েই টাকা উত্তোলন ও লেনদেন করতে বেশি আগ্রহী। এর বড় কারণ হলো শাখার চেয়ে এটিএম ও পিওএসে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলা বেশি সহজ। এতে কার্ডের ব্যবহার প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

অনেক গ্রাহকই একাধিক কার্ড ব্যবহার করে থাকেন। সব মিলিয়ে গত ফেব্রুয়ারি শেষে দেশে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ছিল ১৭ লাখ ১৩ হাজার ৯০৪টি। ওই মাসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা। ব্যাংকাররা বলছেন, অনেক প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে ব্যবসা বা শাখা বন্ধ করে ফেলছে। এ কারণে পিওএস কমেছে। আবার সিটি ব্যাংক পিওএসের পরিবর্তে কিউআর কোডের মাধ্যমে লেনদেন চালু করেছে। যার কারণে পিওএসের হিসাবে মিশ্র প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

ব্যাংকাররা জানান, আগে অনেক গ্রাহক কার্ড নিতে চাইতেন না। এখন অনেকেই কার্ড নিতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তবে বুঝেশুনেই কার্ড দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য কার্ডের ব্যবহার বেশি বাড়ছে না।

সাউথইস্ট ব্যাংকের কার্ড বিভাগের প্রধান মো. আব্দুছ সবুর খান বলেন, এখন তরুণদের পাশাপাশি বয়োজ্যেষ্ঠরাও কার্ড ব্যবহার করছেন। অনলাইন কেনাকাটায় ঝুঁকছেন। এ জন্য ক্যাশব্যাক, মূল্যছাড়ে কেনাকাটাসহ নানা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কার্ড ব্যবসার প্রসারে আমরা ভবিষ্যতে পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) ব্যবসায় বড় ধরনের বিনিয়োগ করব। প্রাথমিক পর্যায়ে ২ হাজার পিওএস বসানোর ইচ্ছা আছে।

ব্যাংক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন