default-image

বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত অনিয়মের আশঙ্কায় কোনো কোনো ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়। আবার কোনো কোনো ব্যাংকে বড় ধরনের অনিয়ম সংঘটিত হওয়ার পর পর্যবেক্ষক বসায়। পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি ঘোষণা দিয়ে ওই সব প্রতিষ্ঠান থেকে পর্যবেক্ষক প্রত্যাহারও করে নেয়। কিন্তু বেসরকারি খাতের চার ব্যাংক থেকে পর্যবেক্ষক প্রত্যাহারও হয়নি, পদ খালি থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন কাউকে দায়িত্বও দেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। এদিকে চার ব্যাংকে নতুন নতুন অনিয়মের খবর পাওয়া যাচ্ছে। ব্যাংক চারটি হলো ইসলামী, আইসিবি ইসলামিক, এবি ও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বা বদলির কারণে ওই চার ব্যাংকে পর্যবেক্ষক পদ শূন্য হয়েছে। পদ খালি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা। কিন্তু ঊর্ধ্বতনদের অনীহার কারণে এ নিয়ে সিদ্ধান্ত হচ্ছে না।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম গত জানুয়ারিতে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘কাকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে, এ নিয়ে আলোচনা চলছে। শিগগির নিয়োগ দেওয়া হবে।’ আলোচনা শেষ হয়েছে কি না ও কবে নিয়োগ দেওয়া হবে, তা জানতে গতকাল শনিবার যোগাযোগ করা হলে তিনি একই উত্তর দেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক বড় ধরনের অনিয়মের আশঙ্কায় ১৯৯৪ সালে প্রথম ওরিয়েন্টাল ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়। এরপরও অনিয়ম ঘটায় ২০০৬ সালে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে এবং প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর ২০০৮ সালে ব্যাংকটির নাম পরিবর্তন করে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক করা হয়। তবে ব্যাংকটি এখনো আগের মতোই ধুঁকছে। এরপর আরও কয়েকটি ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে দেশের ১১টি ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তা ও অন্যান্য ব্যাংকে মহাব্যবস্থাপক পর্যায়ের কর্মকর্তা পর্যবেক্ষক হিসেবে রয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৫ সালে একসঙ্গে রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংক এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডে (বিডিবিএল) পর্যবেক্ষক দেওয়া হয়। আইসিবি ব্যাংকে ১৯৯৪, ন্যাশনাল ও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ২০০৪, রাষ্ট্রমালিকানাধীন বেসিক ব্যাংকে ২০১৩, ইসলামী ব্যাংকে ২০১০, এনআরবি কমার্শিয়াল ও ফারমার্স ব্যাংকে (পদ্মা) ২০১৬ এবং এবি ব্যাংকে ২০১৭ সালে পর্যবেক্ষক বসানো হয়। সর্বশেষ গত বছরের আগস্টে পর্যবেক্ষক বসানো হয় ওয়ান ব্যাংকে।

এবি ব্যাংকে গত বছরের আগস্টের পর আর কেউ পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পাননি। আর ইসলামী ব্যাংক ও কমার্স ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নেই ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে। আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকেও কোনো পর্যবেক্ষক নেই। মূলত পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও বদলির কারণে পদ শূন্য হয়েছে। নতুন করে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

একনজরে

পর্যবেক্ষক আছে * সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বেসিক, কৃষি ও বিডিবিএলে। * বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল, পদ্মা, ওয়ান ব্যাংকে। পর্যবেক্ষক পদ শূন্য * এবি, ইসলামী, কমার্স ও আইসিবি ইসলামিক। পর্যবেক্ষক প্রত্যাহার * মার্কেন্টাইল ও এনআরবি কমার্শিয়াল।

এদিকে এনআরবি কমার্শিয়াল ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় পর্যবেক্ষক প্রত্যাহার করে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, পর্যবেক্ষক না থাকার সুযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পরিচালকেরা বেনামে ঋণ অনুমোদন করিয়ে নিচ্ছেন, যা যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। নথিপত্রের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করার সুযোগও থাকছে না। আবার কোনো কোনো ব্যাংক দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানে টাকা দিয়ে আটকে গেছে। এতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার বলেন, ‘কেন এত দিন পর্যবেক্ষক পদ ফাঁকা থাকল, তার জবাব কেন্দ্রীয় ব্যাংকই দিতে পারবে। এটা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বলতা। এ দুর্বলতার কারণেই বড় বড় অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। আমানতকারীদের মধ্যে কিছুটা অনাস্থা দেখা দেয়। আর এখন তো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারাই অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন। এসব দিকে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।’

কোনো ব্যাংকের পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকলে বা খারাপ হয়ে গেলে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী ওই ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়ম অনুযায়ী, এসব পর্যবেক্ষক ব্যাংকের পর্ষদ, নির্বাহী ও নিরীক্ষা কমিটির সভায় অংশ নিতে পারেন। তবে মতামত দিতে পারেন না। কোনো আপত্তি থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ মতামত দিতে পারেন, যার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তবে অনেক সময় পর্যবেক্ষক থাকার পরও বড় ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকে। যেমন ২০১৫ সাল থেকে জনতা ব্যাংকে পর্যবেক্ষক থাকার পরও ঋণ নিয়ে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। আর ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা খারাপ হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষক যাওয়ার পরই।

পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্য কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বলছেন, অনেক সময় পর্ষদে হঠাৎ ঋণ প্রস্তাব আনা হয়। লিখিত মতামত দিলেও কাজে আসে না। আবার পর্যবেক্ষকদের সবাই তেমন দক্ষ নন। তাই অনিয়ম ধরতে পারছেন না।

বিজ্ঞাপন
ব্যাংক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন