default-image

ব্যাংকের শাখাগুলোই বিক্রি করে দেবে বিমা পলিসি। এ জন্য গ্রাহকদের বিমা কোম্পানিতে যেতে হবে না, ব্যাংকের শাখায় গেলেই চলবে। অর্থাৎ ব্যাংক তার নিজের গ্রাহকের কাছে ব্যাংক পণ্য তো বিক্রি করবেই, বিমা পণ্যও বিক্রি করবে। বিমা নিয়ে মানুষের নেতিবাচক মনোভাব দূর করতে সরকার এমন উদ্যোগ নিয়েছে। সে জন্য ‘ব্যাংকাস্যুরেন্স’ নামের নতুন ধারণা নিয়ে সরকার এগোচ্ছে।

উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে বিমা খাতের ব্যাপক প্রসার হবে। কিন্তু নীতিমালার অভাবে নতুন এই আর্থিক পণ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগছে না। অথচ ব্যাংক খাতের মাধ্যমে বিমা খাতের উন্নতির অনেক উদাহরণ রয়েছে উন্নত বিশ্বে। এমনকি নিকট প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাও এতে সফল হয়েছে। অথচ ৬০টি ব্যাংক ও ৭৮বিমা কোম্পানি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে।

বিজ্ঞাপন

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) শেষ পর্যন্ত ব্যাংকাস্যুরেন্স–সংক্রান্ত খসড়া নীতিমালা তৈরি করেছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকও একমত হয়েছে। মতামতের জন্য সরকারি দুই সংস্থাসহ সব বেসরকারি কোম্পানিকে খসড়াটি পাঠিয়েছে আইডিআরএ।

ব্যাংকাস্যুরেন্স ফরাসি শব্দ। ব্যাংকের মাধ্যমে বিমা পণ্য বিক্রির যে পদ্ধতি, সেটাই ব্যাংকাস্যুরেন্স। ১৯৮০ সালের দিকে ফ্রান্স
ও স্পেনে প্রথম এটি চালু হয়। ইউরোপের বেশির ভাগ দেশে ব্যাংকের মাধ্যমে জীবনবিমা বিক্রি হয়। এশিয়ার দেশগুলোতেও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে এটি।

বিমা খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যাংকাস্যুরেন্স চালু হলে বিমা কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম সংগ্রহের খরচ কমবে। বাড়তি খরচ ছাড়াই বিমা পণ্য বিক্রি করতে পারবে ব্যাংক। যেহেতু বিমার তুলনায় ব্যাংকের ওপর গ্রাহকদের আস্থা বেশি, সেহেতু ব্যাংকাস্যুরেন্সের আওতায় বিমা পলিসি কেনার প্রতিও তাঁদের আগ্রহ বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যাংকের মোট শাখা এখন ১০ হাজারের বেশি। আর বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের এক হিসাব বলছে, দেশে ব্যাংক হিসাবধারীর সংখ্যা ৯ কোটির মতো।

ব্যাংকাস্যুরেন্স নিয়ে অবশ্য দেশে ভালো গবেষণা হয়েছে বলে আইডিআরএ তথ্য দিতে পারেনি। তবে ব্যাংকাস্যুরেন্সের ওপর লেখা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) শিক্ষক মোহাম্মদ জেড মামুনের একটি প্রবন্ধে দেখা যায়, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, স্পেন, নেদারল্যান্ডসের মতো দেশের ব্যাংকগুলো নিজস্ব পণ্যের পাশাপাশি বিমা পণ্যও বিক্রি করে।

প্রবন্ধে বলা হয়, অদূর ভবিষ্যতে ব্যাংকাস্যুরেন্সের বিশাল সম্ভাবনা আছে। ব্যাংকের যেহেতু বড় একটা গ্রাহক শ্রেণি রয়েছে, সেহেতু নিজেদের গ্রাহকদের মধ্যেই তারা বিমা পণ্য বিক্রি করতে পারে। করপোরেট গ্রাহক এবং কোম্পানির বেতন হয় যেসব ব্যাংকের মাধ্যমে, শুরুর দিকে সেসব ব্যাংক বিমা পণ্য বিক্রিতে এগিয়ে আসতে পারে।

আইডিআরএ চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ব্যাংকাস্যুরেন্স সময়ের দাবি। এতে ব্যাংক ও বিমা কোম্পানি শুধু লাভবান হবে না, গ্রাহকেরাও উপকৃত হবেন। পরীক্ষামূলকভাবে গার্ডিয়ান লাইফ ইনস্যুরেন্স কাজটি শুরুও করেছে। আশার কথা হলো, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় ব্যাংকাস্যুরেন্সের প্রবৃদ্ধি ভালো। খসড়া নীতিমালা যেহেতু তৈরি হয়ে গেছে, আশা করছি শিগগির এটা চূড়ান্ত হয়ে যাবে।’

বিজ্ঞাপন

খসড়ায় বলা হয়েছে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করে এমন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকাস্যুরেন্সের এজেন্ট হতে পারবে। সে জন্য তাদের বিমা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। আরও বলা হয়, কোনো ব্যাংকাস্যুরেন্স এজেন্ট তিনটির বেশি জীবন বা সাধারণ বিমা কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে না। এ জন্য বিমা কোম্পানিকে আইডিআরএর অনুমোদন নিতে হবে। আর ব্যাংকাস্যুরেন্স এজেন্টকে অনুমোদন নিতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের।

ফাউন্ডেশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব লাইফ অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ডের (এফএএলআইএ) ২০১৬ সালের এক জরিপে বিভিন্ন দেশের ব্যাংকাস্যুরেন্স বাজারের চিত্র উঠে আসে। বলা হয়, ১৩টি দেশের মধ্যে ব্যাংকের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ৭৯ শতাংশ পলিসি বিক্রি হয় তুরস্কে, ভারতে এই হার ২০ দশমিক ৮ শতাংশ।

বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ কবির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চাই সারা দেশে ব্যাপকভাবে ব্যাংকাস্যুরেন্স চালু হোক। এটি গোটা বিমা খাতকেই নাড়া দেবে বলে বিশ্বাস করি। ব্যাংকেরও ভালো আয় হবে এতে।’

মন্তব্য পড়ুন 0