এদিকে অস্তিত্বসংকটে পড়ায় রিজার্ভ থেকে সোনালী ব্যাংককে দেওয়া ৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার (৩৯৬ কোটি টাকা) ফেরত চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ, সোনালী ব্যাংক ওই অর্থ নিয়ে ব্যবসার জন্য সোনালী ব্যাংক ইউকে লিমিটেডকে দিয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এখনই এই অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব নয় বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানিয়েছে সোনালী ব্যাংক। কারণ, এতে এপিআই লাইসেন্স পেতে বাধা তৈরি হতে পারে।

সোনালী ব্যাংক ইউকের এই পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে চাননি এটির মালিকানার সঙ্গে যুক্ত সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান প্রধান। এর আগে তিনি লন্ডন সোনালী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ছিলেন। এ বিষয়ে কথা বলতে আইনি নিষেধাজ্ঞা আছে বলে জানিয়েছেন সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী। তিনি সোনালী ব্যাংক ইউকের পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন পরিচালক হিসেবে। আর সোনালী ব্যাংক ইউকের চেয়ারম্যান ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাবেক সচিব আসাদুল ইসলামও এ নিয়ে কথা বলতে চাননি।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, ব্যাংকটির লাইসেন্স যেকোনো সময় অকার্যকর হয়ে যেতে পারে, এমন তথ্য আমরা জেনেছি। তবে এ জন্য সময় দেওয়া হয়েছে।

প্রবাসীদের রেমিট্যান্স সেবা দিতে ১৯৯৯ সালে যুক্তরাজ্যে কার্যক্রম শুরু করে সোনালী ট্রেড অ্যান্ড ফাইন্যান্স। পরে ২০০১ সালের তা ব্যাংকে রূপান্তর হয়। প্রবাসী আয়ের পাশাপাশি ঋণপত্রের নিশ্চয়তা দেওয়া শুরু করে। যার নাম হয় সোনালী ব্যাংক ইউকে লিমিটেড। এরপর ব্যাংকটি আমানত সংগ্রহ ও ঋণ কার্যক্রম শুরু করে। এতেই ঘটে বড় দুর্ঘটনা। ব্যাংকটির মালিকানার ৫১ শতাংশ রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের হাতে। আর ৪৯ শতাংশ সোনালী ব্যাংকের হাতে। ব্যাংকটি চালাতে দফায় দফায় সরকার ও সোনালী ব্যাংক মিলে মূলধন জোগান দিয়েছে। আবার ব্যবসা করতে দেশের রিজার্ভ থেকে টাকা দেওয়া হয়েছে। কয়েক দফায় মূলধন জোগান দেওয়ার পর এখন ব্যাংকটির মূলধন ৬ কোটি ৩৮ লাখ পাউন্ড, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬৮৭ কোটি টাকা। তবে এর বাইরে সোনালী ব্যাংক ইউকেতে ৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার দিয়েছে সোনালী ব্যাংক, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে নেওয়া হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে ব্যাংকটি ঋণপত্রের নিশ্চয়তা, অগ্রিম মূল্য পরিশোধ, বিল ডিসকাউন্টিং ব্যবসা করে আসছে। এরপরও ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না।

নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৩ সালের ২ জুন সোনালী ব্যাংক ইউকের ওল্ডহ্যাম শাখা থেকে সুইফট কোড জালিয়াতির মাধ্যমে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়। যুক্তরাজ্যের ওল্ডহ্যাম শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক ইকবাল আহমেদ ব্যাংকের ভল্ট থেকে অর্থ চুরি, গ্রাহকের হিসাব থেকে অবৈধভাবে অর্থ উত্তোলন ও গ্রাহকের অর্থ হাতিয়ে নেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর শাখাটি বন্ধ করে দেয় দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০১৭ সাল থেকে চালু আছে শুধু লন্ডন ও বার্মিংহাম শাখা।

এদিকে ২০১০ সালের ২০ আগস্ট থেকে ২০১৪ সালের ২১ জুলাই সময়ে অর্থ পাচার প্রতিরোধব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সোনালী ব্যাংক ইউকে লিমিটেডকে ৩২ লাখ পাউন্ড জরিমানা করে দেশটির আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল কনডাক্ট অথরিটি (এফসিএ)। বন্ধ করে দেয় নতুন হিসাব খোলা। এ ছাড়া সোনালী ব্যাংক ইউকের মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ বিভাগের প্রধান স্টিভেন স্মিথকে এ ধরনের চাকরিতে নিষিদ্ধ ও ১৮ হাজার পাউন্ড জরিমানা করা হয়। এ সময় ব্যাংকটির প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন খোন্দকার মো. ইকবাল ও আতাউর রহমান প্রধান। তাঁরা দুজনই পদোন্নতি পেয়ে পরে বেসিক ও সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হয়েছেন।

সোনালী ইউকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে কর–পূর্ববর্তী লোকসান ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার পাউন্ড, ২০১৭ সালে যা কমে হয় ১ লাখ ২৫ হাজার পাউন্ড। তবে ২০১৮ সাল থেকে মুনাফায় ফেরে। ওই বছর কর–পূর্ববর্তী মুনাফা হয় ৬৮ হাজার ৯৭৩ পাউন্ড। তবে ২০২১ সালে আবার লোকসানে চলে যায়। গত বছর লোকসান হয় ৫ লাখ ৭৯ হাজার ৯৯০ পাউন্ড।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবীব প্রথম আলোকে বলেন, সোনালী ব্যাংক ইউকেতে যা হয়েছে, তা খুবই দুঃখজনক। দেশের বাইরের ব্যাংকটি বন্ধ হয়ে গেলে বিদেশিদের কাছে খুবই খারাপ বার্তা যাবে। এতে সরাসরি ক্ষতি না হলেও ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। দেশের ভাবমূর্তির স্বার্থে নিয়মকানুন মেনে ব্যাংকটি পরিচালনার দরকার ছিল।

ব্যাংক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন