সারা দেশে আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণের জন্য ২০১৪ সালে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। তখন খরচ ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা। কিন্তু জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় দুবার প্রকল্পটির ব্যয় বাড়ানো হয়। ঠিকাদারও কাজ শেষ করতে পারেননি। গত মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির ব্যয় সংশোধন করে ৩ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা করা হয়। গত জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন তা ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে শেষ হবে। প্রকল্পটির মেয়াদ তিন বছর এবং খরচ প্রায় ৮৬ শতাংশ বাড়ল।

default-image

২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের বাল্লা স্থলবন্দর উন্নয়নের প্রকল্প নেওয়া হয়। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৪৯ কোটি টাকা। জমি অধিগ্রহণ ও অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে প্রকল্পটি গত জুন মাসে শেষ করার কথা ছিল। ঠিকাদারও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখনো জমি অধিগ্রহণের কাজই শেষ হয়নি। সব মিলিয়ে প্রকল্পের মাত্র ১৪ শতাংশ কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রকল্পটির মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে প্রকল্পটির ব্যয়ও অবধারিতভাবেই বাড়ানো হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা সীমান্ত এলাকার সড়ক নির্মাণে ২০১৬ সালে ৪৫৭ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়, যা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৯ সালের জুন মাসে। কিন্তু ঠিকাদারকে কাজ দিতেই অনেক সময় চলে যায়। তাই সময়মতো ঠিকাদার কাজ শেষ করতে পারেননি। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ আরও আড়াই বছর বাড়িয়ে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। শুধু তা-ই নয়, প্রকল্পের খরচও প্রায় ১০৩ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৫৬০ কোটি টাকা করা হয়।

প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগ করতেই অনেক সময় চলে যায়, ঠিকাদারেরাও সময়মতো কাজ শেষ করতে পারেন না, কাজের মানও ঠিক থাকে না—এমন শত শত প্রকল্প আছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি)। বিশ্বব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৭০ শতাংশ ঠিকাদার ঠিক সময়ে কাজ শেষ করতে পারেন না। এ জন্য প্রকল্পের খরচ বাড়ে। ফলে বাড়তি অর্থ ব্যয়ে করেও প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাওয়া যায় না। বিশ্বব্যাংক আরও বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর ক্রয় পরিকল্পনা থাকে না। প্রকল্পভিত্তিক বিশ্লেষণ না থাকায় খরচ বাড়ে। অনেক সময় দরপত্র প্রক্রিয়ায় দুর্বলতার কারণেও পরবর্তী সময়ে আবার নতুন দরপত্র আহ্বান করতে হয়।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বব্যাংক ‘অ্যাসেসমেন্ট অব বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট সিস্টেম’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সরকারি কেনাকাটার দুর্বলতা ও অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় বিশ্বব্যাংক সমীক্ষা চালিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। এতে ইলেকট্রনিক উপায়ের ২ লাখ ৯৭ হাজার কেনাকাটা (ই-জিপি) এবং সনাতন পদ্ধতির ১২ হাজার কেনাকাটার তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশজুড়ে বিভিন্ন অংশীজনের মতামতও নেওয়া হয়েছে। মোটা দাগে বলা চলে, ই-জিপি চালুর পরও সরকারি কেনাকাটায় কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছতা আসেনি।

সময়মতো প্রকল্প শেষ না হওয়া প্রসঙ্গে গত মঙ্গলবার একনেক সভা শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি, রেট শিডিউল পরিবর্তন, কাজের গাফিলতির কারণে সময়মতো প্রকল্প শেষ হয় না। এতে খরচ ও সময় বাড়ে। তা কমানোর চেষ্টা চলছে।

পরিদর্শনে আগ্রহ বেশি, কাজের মানে নয়

ঠিকাদারেরা কীভাবে কাজ করছেন, কাজের মান কেমন—এসব দেখার দায়িত্ব প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার। এ সম্পর্কে বিশ্বব্যাংক বলছে, সরকারি কর্মকর্তাদের শুধু পরিদর্শনেই বেশি আগ্রহ বেশি, কাজের মান তদারকিতে নয়। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৮০ শতাংশ ঠিকাদার জানিয়েছেন, রাস্তাঘাট, ভবন নির্মাণসহ পূর্ত কাজ যেন সময়মতো শেষ হয়, তা দেখতে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার কর্মকর্তারা। এত ঘন ঘন পরিদর্শনের পরও প্রকল্পের কাজের মান নিশ্চিত হয় না। মাত্র ৩০ শতাংশ ঠিকাদার সময়মতো কাজ শেষ করতে পারেন।

এ ছাড়া ১৪ শতাংশ ঠিকাদার জানিয়েছেন, তাঁদের প্রকল্প প্রতি দুই সপ্তাহে একবার করে পরিদর্শন করেছেন সরকারি কর্মকর্তারা। আর ৪ শতাংশ ঠিকাদারের উত্তর, মাসে একবার প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরিদর্শন করেছেন।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় কর্তা প্রকল্প পরিচালকেরা এলাকায় থাকেন না। এ নিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান একাধিকবার অভিযোগ করেছেন। তিনি প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করতে পরিচালকদের প্রকল্প এলাকায় থাকার নির্দেশও দিয়েছেন। এমনকি সিসি ক্যামেরা দিয়ে তা তদারকির কথাও বলেছেন।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় কর্তা প্রকল্প পরিচালকেরা এলাকায় থাকেন না। এ নিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান একাধিকবার অভিযোগ করেছেন। তিনি প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করতে পরিচালকদের প্রকল্প এলাকায় থাকার নির্দেশও দিয়েছেন। এমনকি সিসি ক্যামেরা দিয়ে তা তদারকির কথাও বলেছেন।

‘দরসীমা’ নিয়ে আপত্তি

২০১৬ সালে সরকারি ক্রয় আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। যেকোনো সরকারি কেনাকাটায় একটি প্রাক্কলিত দাপ্তরিক দর থাকে এবং তা গোপন রাখতে হয়। ক্রয় আইনের ওই সংশোধনী অনুযায়ী, উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় কোনো পণ্য বা সেবার প্রাক্কলিত দাপ্তরিক দর যদি ১০০ টাকা হয়, তাহলে দরপত্রে অংশ নেওয়া ঠিকাদারেরা যদি ওই দরের ১০ শতাংশ কম বা বেশির মধ্যে দর না দেন, তাহলে ওই ঠিকাদারকে অযোগ্য বিবেচনা করা হবে, যা দরসীমা বা ‘প্রাইস ক্যাপ’ হিসেবে পরিচিত। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে এই প্রাইস ক্যাপের বিষয়ে তীব্র আপত্তি তোলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাক্কলিত দাপ্তরিক দর একটি গোপনীয় বিষয়। কিন্তু উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রাইস ক্যাপ দেওয়ায় প্রকৃত সর্বনিম্ন দরদাতা বাতিল হয়ে যেতে পারেন। আর দাপ্তরিক দর নির্ধারণের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সে জন্য বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো দাতা সংস্থাগুলোর সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পে এ ধরনের প্রাইস ক্যাপের দরপত্র গ্রহণযোগ্য নয়।

বিশ্বব্যাংক মনে করে, উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় দরসীমা ঠিক করায় সরকারি কেনাকাটায় নানা সমস্যা হচ্ছে। এতে দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা কমেছে, বড় ঠিকাদারেরা বেশি কাজ পাচ্ছেন।

প্রাক্কলিত দাপ্তরিক দর অস্বাভাবিকভাবে বেশি ধরার বড় উদাহরণ হিসেবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে বালিশকাণ্ড ঘটেছে। করোনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রকল্পে অস্বাভাবিক দামে স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী কেনা হয়েছে। আবার বাজারদরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের যন্ত্রপাতি।

বিজ্ঞাপন

প্রতিযোগিতা কমেছে

সরকারি কেনাকাটার ৮০ শতাংশই উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে হয়। কিন্তু উন্মুক্ত দরপত্রে প্রতিযোগী ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ কমেছে। উন্মুক্ত দরপত্রে আগে গড়ে ৪ দশমিক ২টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নিত। এখন তা কমে দুইয়ে নেমে এসেছে। এ ছাড়া দরপত্রে শুধু একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫০ শতাংশ হয়েছে।

বড় ঠিকাদারদের পোয়াবারো

বর্তমানে সরকারি কেনাকাটা প্রক্রিয়ায় বড় ঠিকাদারদেরই রাজত্ব চলছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, সরকারি কেনাকাটার বাজারটি বড় ঠিকাদারদের দখলে চলে গেছে। সরকারি কেনাকাটার বাজারে সবচেয়ে বড় ৫ শতাংশ ঠিকাদারের অংশীদারত্ব ২১ শতাংশ বেড়েছে। আর সবচেয়ে ছোট ১০ শতাংশ ঠিকাদারের বাজার অংশীদারত্ব কমেছে ৪০ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দাপ্তরিক দর গোপনে পছন্দের ঠিকাদারকে বলে দেওয়ার কারণে দুর্নীতির আশঙ্কা বাড়ছে।

ঠিকাদারদের সিন্ডিকেটের কারণে দরপত্রে অনেক ছোট ঠিকাদার অংশ নিতে পারেন না। দরপত্রে কারা অংশ নেবেন, তা ঠিকাদার সমিতির মাধ্যমে ঠিক করে দেওয়া হয়
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) সাবেক মহাপরিচালক ফারুক হোসেন

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) সাবেক মহাপরিচালক ফারুক হোসেন সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ঠিকাদারদের সিন্ডিকেটের কারণে দরপত্রে অনেক ছোট ঠিকাদার অংশ নিতে পারেন না। দরপত্রে কারা অংশ নেবেন, তা ঠিকাদার সমিতির মাধ্যমে ঠিক করে দেওয়া হয়।

ব্যাংক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন