বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে করপোরেট করহার আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছিল। করোনার কারণে বছরজুড়েই ব্যবসা-বাণিজ্যের গতিও ছিল মন্থর। অথচ বছর শেষে দেখা গেল, আগেরবারের চেয়ে ৯ হাজার কোটি টাকা বা ২১ শতাংশ বেশি করপোরেট কর আদায় হয়েছে। নিশ্চয়ই ভাবছেন, এই সফলতার নেপথ্য কী? শুনুন তাহলে, মেগা প্রকল্পগুলো থেকে উৎসে কর যেমন বেশি হয়েছে, তেমনি মোবাইল ফোন অপারেটর ও ওষুধ খাতের ব্যবসায় চাঙা থাকার কারণেই মূলত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আদায় আগের ২০১৯-২০ অর্থবছরের তুলনায় করপোরেট কর বেশি আদায় হয়েছে।

সরকারি প্রকল্প বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ পাঁচ মেগা প্রকল্পে গত অর্থবছরে ৩৮ হাজার কোটি টাকার মতো খরচ হয়েছে। এসব প্রকল্পের ঠিকাদারদের বিল পরিশোধের সময় ২ থেকে ৫ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখা হয়েছে। ফলে বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে সব মিলিয়ে ১ লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকার মতো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে। আবার উৎসে করের প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি এসেছে শুধু সরকারি প্রকল্পের ঠিকাদারদের কাছ থেকেই। এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পণ্য বা সেবার বিপরীতে নানা পর্যায়ে উৎসে কর কেটে রাখা হয়। এভাবে উৎসে কর থেকে সার্বিকভাবে ৩০ হাজার কোটি টাকার মতো এসেছে। করোনার সময়ে বিশেষ করে মোবাইল ফোন অপারেটর ও ওষুধ খাতের ব্যবসাও চাঙা ছিল। এসব খাতে বছরজুড়ে ভ্যাট আদায় পরিস্থিতি ভালো ব্যবসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, বিদায়ী অর্থবছরে সব মিলিয়ে ৫২ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকার করপোরেট কর আদায় হয়েছে। এটি মোট আয়করের প্রায় ৬২ শতাংশ এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরের ৪৩ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার করপোরেট করের চেয়ে প্রায় ২১ শতাংশ বেশি। বিদায়ী অর্থবছরে বিভিন্ন কমিশনারেটে নিবন্ধিত প্রায় ৩০ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান করপোরেট কর দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের আমদানি, উৎপাদন ও সরবরাহসহ বিভিন্ন পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ উৎসে করও যোগ হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে ২৫ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান করপোরেট কর দিয়েছিল।

বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে সব ধরনের করপোরেট করহার আড়াই শতাংশ কমানো হয়। ফলে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার দাঁড়ায় ২৫ শতাংশ। আর শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির ক্ষেত্রে তা সাড়ে ৩২ শতাংশ। এ ছাড়া ব্যাংক, সিগারেট কিংবা মোবাইল ফোন কোম্পানির করপোরেট সাড়ে ৩৭ থেকে ৪৫ শতাংশ।

আলোচ্য অর্থবছরে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের লাভ না হলেও বার্ষিক লেনদেন ৩ কোটি টাকা ছাড়ালেই এর বিপরীতে দশমিক ৫ শতাংশ কর দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে অবশ্য করপোরেট কর ও লাভ-লোকসান নির্বিশেষে করের হার কমেছে।

কারা বেশি কর দিল

এবার দেখা যাক, গত ২০২০-২১ অর্থবছরে কারা করপোরেট কর বেশি দিয়েছে। এই বছরে আদায়কৃত করের প্রায় অর্ধেকই দিয়েছে বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) ২৮১টি কোম্পানি। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক, শাহ সিমেন্ট, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট, প্রিমিয়ার সিমেন্ট, সেভেন রিং সিমেন্ট, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো; ডাচ্-বাংলা ও ইসলামী ব্যাংক এবং ওষুধ খাতের স্কয়ার, বেক্সিমকো ও ইনসেপ্‌টা ইত্যাদি। এসব এলটিইউ তথা বড় কোম্পানি ও তাদের ৭০৬ জন পরিচালক মোট ২৪ হাজার ১১ কোটি টাকা কর দিয়েছেন। তবে বেশির ভাগ কোম্পানির পরিচালকদের নিজেদের নামের বাড়ি-গাড়ি কোম্পানির নামে থাকে। ফলে পরিচালকদের কাছ থেকে অবশ্য খুব বেশি কর পাওয়া যায় না।

বিদায়ী অর্থবছরে করহার কমা ও করোনার কারণে ব্যবসায় মন্দা থাকার পরও করপোরেট কর আদায় বেড়েছে। এই বিষয়ে মতামত জানতে যোগাযোগ করা হয় এনবিআরের সাবেক সদস্য আমিনুর রহমানের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, করোনার কারণে এমনিতে ব্যবসা-বাণিজ্য খারাপ গেছে। কিন্তু সরকারের বড় বড় প্রকল্প যেমন পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পায়রা বন্দরের কাজ দ্রুত এগিয়েছে। এসব বড় প্রকল্পের ঠিকাদারদের বিপুল অঙ্কের টাকার বিল পরিশোধ করতে হয়েছে। ওই বিলের বিপরীতে যে উৎসে কর কাটা হয়েছে, তা করপোরেট করে যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া করোনার সময়ে মোবাইল ফোনে কথা বলার পাশাপাশি ডেটা ব্যবহারও বেড়েছে। ফলে মোবাইল ফোন কোম্পানির কাছ থেকে বেশি কর পাওয়ার কথা। এ ছাড়া ওষুধ খাতের কোম্পানির ব্যবসা ভালো হয়েছে।

আমিনুর রহমান আরও বলেন, করপোরেট করের আরেকটি বড় উৎস ব্যাংক থেকে তেমন একটা কর আদায় হওয়ার কথা নয়। কারণ, যেসব ব্যবসায়ী ঋণ নিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য মন্দা থাকায় ঋণ শোধ করতে পারেননি। ঋণ পরিশোধ না করলে ব্যাংক মুনাফা করবে কোথা থেকে?

এবারও আদায় বৃদ্ধির আশা

যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের পরিদপ্তর (আরজেএসসি) থেকে নিবন্ধন নিয়ে যেসব কোম্পানি কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নেয়নি, সেসব কোম্পানিকে খুঁজে বের করতে গত বছরের আগস্ট মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) করপোরেট কমপ্লায়েন্স টাস্কফোর্স গঠন করে। টাস্কফোর্স গঠনের আগে পর্যন্ত মাত্র ৭৮ হাজার ১০৫টি কোম্পানির টিআইএন ছিল। গত এক বছরে এনবিআর নতুন ৮০ হাজার কোম্পানির সন্ধান পায়, যাদের টিআইএন দেওয়া হয়েছে। ওই সব কোম্পানির সবাই চলতি অর্থবছরে রিটার্ন দেবে এবং করের আওতায় আসবে। ফলে করপোরেট কর আদায় বাড়বে বলে মনে করেন এনবিআরের কর্মকর্তারা।

এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, সবকিছু স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় চলে যাচ্ছে। নতুন আয়কর আইনও হচ্ছে। এর ফলে আগামী দু-এক বছরের মধ্যে করপোরেট কর আদায় বেশ বাড়বে।

যেকোনো প্রতিষ্ঠান ব্যবসা শুরু করার আগে করের হারকে বেশি মূল্যায়ন করে থাকে। বিশেষ করে বিদেশি কোম্পানিগুলো করপোরেট করহারসহ সার্বিক করব্যবস্থা মূল্যায়ন করে তবেই একটি দেশে বিনিয়োগ করে। অর্থাৎ করপোরেট করহারও বিনিয়োগ আকর্ষণে ভূমিকা পালন করে।

করপোরেট সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন