default-image

বর্তমানে দেশের চাহিদার ৮০ শতাংশই পূরণ করে বাংলাদেশের টাইলস উৎপাদনকারীরা। টাইলস খাতের অবকাঠামোগত সুবিধাগুলো দিয়ে আরও বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারলে এ খাত থেকেও বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সক্ষম হবে বাংলাদেশ। স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে সরাসরি জিডিপিতে অবদান রাখছে। ভূমিসংকটসহ উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খাতটির বিকাশ ঘটছে। বাংলাদেশের টাইলস খাতের সম্ভাবনা, ভবিষ্যৎসহ নানা দিক দিয়ে কথা বলেছেন ডিবিএল সিরামিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার।

বাংলাদেশের সিরামিক টাইলসশিল্প তুলনামূলকভাবে নতুন। এ স্বল্প সময়ের মধ্যে এ শিল্পের অগ্রগতির বিষয়ে কিছু বলেন।

এম এ জব্বার: মাত্র এক দশক আগেও বাংলাদেশকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমদানি করা টাইলসের ওপর নির্ভর করতে হতো। তবে ক্রমবর্ধমানশীল চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশি টাইলসশিল্পে অনেক উৎপাদনশীল কোম্পানি কাজ শুরু করেছে এবং সফলতার সঙ্গে পণ্য উৎপাদন করে যাচ্ছে। এ ছাড়া স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি কিছু বিদেশি বিনিয়োগকারীও বাংলাদেশে এসেছেন, যার ফলে বাজার আরও প্রসারিত হচ্ছে।
বর্তমানে আমাদের স্থানীয় চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই পূরণ হয় বাংলাদেশের টাইলস উৎপাদনকারীদের মাধ্যমে। যদি খাতটি অবকাঠামোগত সুবিধাগুলো দিয়ে আরও বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়, তবে এই খাত থেকেও বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সক্ষম হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের অগ্রগতিশীল অর্থনীতি কীভাবে বিল্ডিং শিল্প এবং আবাসিক বিল্ডিংয়ে প্রভাব ফেলছে? আজকের পরিস্থিতি কী এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনুমান কী?

এম এ জব্বার: বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট পণ্য বাংলাদেশের মোট আর্থসামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে। এই খাতটি বাসস্থান তৈরি, অব্যবহৃত জমির বিকাশ, অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহায়তা, স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে সরাসরি জিডিপিতে অবদান রাখছে। ভূমিসংকটসহ উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খাতটির বিকাশ ঘটছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধমান অর্থনীতি। এর পেছনে মূল কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো আমাদের প্রায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং ফলস্বরূপ বাজারের আকার এখনো বাড়ছে। সুতরাং আসন্ন ভবিষ্যতেও বাণিজ্যিক এবং আবাসিক বিল্ডিংয়ের চাহিদা বাড়বে বলে আমি মনে করি।

প্রায় ১৬ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে টাইলসের ব্যবহার এখনো তুলনামূলকভাবে কম। এর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?

এম এ জব্বার: জনসংখ্যা যথাযথভাবে ব্যবহার করা গেলে যেকোনো দেশের পক্ষে এটি একটি বিশাল শক্তি। আগের তুলনায় বাংলাদেশ এর জনসংখ্যা বৃদ্ধিহার কমেছে, তবে এখনো এটি ১ শতাংশ হারে প্রতিবছর বাড়ছে। ফলস্বরূপ, যথেষ্ট চাহিদা বাজারে বিদ্যমান রয়েছে এবং বিশেষজ্ঞদের মতে পরবর্তী কয়েক দশক ধরে এটি অব্যাহত থাকবে। এই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য আমাদের আরও আবাসন সমাধান প্রয়োজন। ফলে বাংলাদেশের সিরামিক টাইলসের আরও চাহিদা থাকবে বলে অনুমানযোগ্য।
সেই সঙ্গে আরও একটি বিষয় লক্ষ করা উচিত। ক্রমবর্ধমান ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে জনসাধারণের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। একসময় সিরামিক টাইলসকে বাংলাদেশে বিলাসবহুল পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টাইলস শহুরে থেকে গ্রামীণ প্রায় প্রতিটি বাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান হয়ে উঠেছে। ভোক্তারা কেবল গতানুগতিক টাইলস ব্যবহার করছেন তা নয়, বাজারে বিশেষভাবে নকশাকৃত পণ্য যেমন টেকনিক্যাল পোরসেলিন, সুগার ইফেক্ট টাইলস ইত্যাদিরও যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি যে ডিবিএল সিরামিকস এই পণ্যগুলো প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের এনেছে।

default-image

বাংলাদেশের সিংহভাগ টাইলসের চাহিদাই স্থানীয়রাই পূরণ করে। এই চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে এই শিল্পে আরও স্থানীয় বিনিয়োগ আসবে বলে মনে করেন কি? নাকি দেশের বাইরে থেকে টাইলসের আমদানি বাড়বে?

এম এ জব্বার: এই মুহূর্তে বাংলাদেশের টাইলস স্থানীয় চাহিদা প্রায় ৮০ শতাংশ পূরণ করে দেশীয় প্রস্তুতকারকেরা। আমরা পুরোপুরি আশাবাদী যে অনেক শিল্পে বাংলাদেশ আরও অগ্রগতি এবং প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে। এর ফলে বাংলাদেশে টাইলসের আরও স্থানীয় চাহিদা বাড়বে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন খাতেও বাংলাদেশের ব্যাপক অগ্রগতি হচ্ছে (উদাহরণ: মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, মহাসড়কের প্রশস্ত লেন ইত্যাদি)।
বাংলাদেশে আমদানি করা টাইলসগুলো বাজারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে দেখা যায় না। আমদানি করা টাইলসের বাজার গত পাঁচ বছরে খুব বেশি বাড়েনি। আমদানি করা টাইলসগুলোর প্রধান উৎস চীন ছাড়াও কয়েকটি দেশ, যেমন: ইতালি, স্পেন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া থেকে আনানো হয়। এই পরিস্থিতিতে আমি বিশ্বাস করি যে টাইলসশিল্পে বাংলাদেশের স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আরও বেশি বিনিয়োগ হবে। এর ফলে নিঃসন্দেহে বিদেশি আমদানীকৃত অংশের ওপর প্রভাব পড়বে।

বিজ্ঞাপন

উৎপাদনপ্রযুক্তি ও অটোমেশন, পরিবেশগত ব্যবস্থা, গুণগত মান—এই তিনটি দিকে উন্নতি করার জন্য এখনো কিছু করার আছে কি?

এম এ জব্বার: বর্তমানে সিরামিক প্রস্তুতকারকেরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেন, যা উৎপাদনপ্রক্রিয়াতে মানুষের অংশগ্রহণ ব্যাপকভাবে হ্রাস করে। পণ্যের গুণগত মান, বৃহৎ আকারের উৎপাদন এবং বর্জ্য হ্রাস ব্যবস্থাপনার ওপর সচেষ্ট থাকলে পুরো ইন্ডাস্ট্রিতেই আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব।
ডিবিএল সিরামিকস সাস্টেইনেবিলিটিতে বিশ্বাসী। পণ্য উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে দূষণকারী বর্জ্য উৎপন্ন হয়; এই বর্জ্য নির্গমন সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। প্রকৃতি ঠিক থাকলে আমরা বাঁচব, সুস্থভাবে জীবন যাপন করব—এই প্রতিজ্ঞায় আমরা সদা বিশ্বাসী।
ডিবিএল সিরামিকস ক্রমাগতভাবে পণ্যের মান উন্নয়ন করার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে এবং পণ্য তৈরিতে যেসব প্রক্রিয়া চলে, তাতে পরিবেশ ও ভোক্তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব যাতে না পড়ে, সে বিষয়ে আমরা সদা সচেষ্ট। আমাদের আর অ্যান্ড ডি বিভাগ সব সময় পণ্য এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রক্রিয়াগুলো বিশ্লেষণে সক্রিয়ভাবে জড়িত। আমরা দুটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে শতভাগ পানি পুনর্ব্যবহার করে পানি সাশ্রয় করি। শুকানোর জন্য আমরা বার্নার ব্যবহার না করে এক্সস্ট ব্যবহার করার মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করি।

আজকের ডিবিএল সিরামিকস সম্পর্কে কিছু বলুন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করুন।

এম এ জব্বার: দেশের টাইলসের বাজারে এক অন্যতম নতুন পথিকৃৎ হিসেবে যুক্ত হয়েছে ডিবিএল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডিবিএল সিরামিকস। ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে বাজারে পণ্য বাজারজাত শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। উদ্ভাবনী নকশা ও উন্নত মান দিয়ে ক্রেতার মন জয় করার চেষ্টা করছি আমরা। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে টাইলস রপ্তানির পরিকল্পনাও রয়েছে ডিবিএল সিরামিকসের। গাজীপুরের মাওনায় ৩০ একর জমির ওপর ডিবিএল সিরামিকস তৈরি করেছে বাংলাদেশের অন্যতম সর্ববৃহৎ কারখানা। প্রতিদিন ৪৫ হাজার বর্গমিটার টাইলস উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে আমরা নতুন উদ্ভাবনের জন্য সর্বদা সচেষ্ট। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের বাজারে বেশ কিছু পণ্য প্রথমবারের মতো নতুন করে নিয়ে এসেছি। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘টেকনিক্যাল পোরসেলিন’ এবং ‘সুগার কোটেড’ টাইলস। টেকনিক্যাল পোরসেলিন টাইলস ভারী ভারী যন্ত্রপাতি চলে এমন যেকোনো কিছুর ভার নিতে সক্ষম। আর সুগার কোটেড টাইলস দেখতে চিনির দানার মতো মনে হবে। এ ধরনের পণ্য উৎপাদনের জন্য যে ধরনের কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন লোক দরকার, তা আমাদের আছে। দেশের মেধাবী তরুণদের কাজে লাগিয়ে গুণেমানে সেরা টাইলস উৎপাদন করাই ডিবিএল সিরামিকস এর প্রধান লক্ষ্য।
আমরা আসন্ন ভবিষ্যতে আমাদের পণ্যগুলোয় আরও উদ্ভাবনের চেষ্টা করছি। আমরা প্রথম থেকেই এর জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে উদ্ভাবন, নকশা এবং গুণগত মান বজায় রাখা। আমরা বিশ্বাস করি, শিগগিরই আমরা বাংলাদেশের বাজারের বড় অংশ ক্যাপচার করব এবং দেশের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বাইরে যেতেও সক্ষম হব।

করপোরেট সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন