নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংকে ঋণপত্র খোলার সময় ব্যাংকাররা স্থানীয় বাজারদর পর্যালোচনা করেন। যে পণ্য আমদানির ঋণপত্র খোলা হবে, তা বিশ্ববাজার থেকে আমদানি করলে কত খরচ হবে, তার হিসাব বের করেন ব্যাংকাররা। এরপর স্থানীয় বাজারদর দেখেন। স্বাভাবিকভাবে স্থানীয় বাজারে দর কম থাকলে ব্যাংকাররা ঋণপত্র খুলতে আগ্রহী হওয়ার কথা নন। কারণ, আমদানি করা পণ্যে লোকসান হলে ব্যাংকের টাকা উঠে আসবে না। সয়াবিন তেলের বাজারে এখন ঠিক এমনটাই হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, সয়াবিন তেলের সরবরাহ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। বেসরকারি খাতের পাশাপাশি এখন সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমেও দ্রুত পরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি করা দরকার। প্রয়োজনে আপৎকালীন সময়ের জন্য পরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানিতে শুল্ক–কর তুলে দেওয়া উচিত। সরকারি ও বেসরকারি দুই খাতে যদি আমদানি হয়, তাহলে সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা থাকবে না।

আপৎকালীন সময়ের জন্য পরিশোধিত সয়াবিন আমদানিতে শুল্ককর তুলে দেওয়া উচিত। সরকারি ও বেসরকারি দুই খাতে যদি আমদানি হয়, তাহলে সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা থাকবে না।
মাহবুবুল আলম, সভাপতি, চট্টগ্রাম চেম্বার।

আমদানি কত, খরচ কত

ঋণপত্র তথা এলসির হিসাব ছেড়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ঘুরে আসা যাক। চলতি সপ্তাহে বন্দরে একটি জাহাজ থেকে প্রায় ২১ হাজার টন সয়াবিন তেল খালাস হয়েছে। এর মধ্যে বসুন্ধরা গ্রুপ ৮ হাজার ৮২০ টন, টিকে গ্রুপ ৮ হাজার টন ও সিটি গ্রুপ ৪ হাজার ১৫২ টন এনেছে।

টিকে গ্রুপ প্রতি টন ১ হাজার ৮৬৯ ডলার করে সয়াবিন তেল আমদানি করেছে। মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) পরিশোধ শেষে খালাসের পর লিটারে খরচ দাঁড়িয়েছে ১৬০ টাকা। এরপর পরিশোধন, পরিবহন ও আনুষঙ্গিক খরচ যোগ করা হলে দাম আরও বেশ কয়েক টাকা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা।

জানতে চাইলে টিকে গ্রুপের পরিচালক তারিক আহমেদ বলেন, এই তেল বাজারজাত করতে কেজিতে খরচ পড়বে ১৯০ টাকা (লিটারে ১৭৪ টাকা)। নতুন করে ঋণপত্র খোলা হলেও প্রায় কাছাকাছি দর পড়বে।
সিটি গ্রুপ অবশ্য টিকে গ্রুপের আগে ঋণপত্র খোলায় তাদের আমদানি খরচ তুলনামূলক কম হয়েছে। তারা প্রতি টন সয়াবিন তেল আমদানি করেছে ১ হাজার ৭৬০ ডলারে। মূসক পরিশোধ করে খালাসের পর তাদের লিটারে খরচ পড়বে ১৫০ টাকা। আর বাজারজাত করা পর্যন্ত কেজিতে খরচ দাঁড়াবে ১৬৫ টাকা।

এদিকে সরকার মিলগেটে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল ১৩৬ টাকায় ও বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৬০ টাকায় নির্ধারণ করে দিয়েছে। এখন যেভাবেই সয়াবিন তেল বিক্রি হোক, তাতে কিন্তু ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হবে।

খুচরা ও পাইকারিতে যা দেখা গেল

ঢাকা ও চট্টগ্রামের কয়েকটি খুচরা দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ থাকলেও তা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কম। রোজার কেনাকাটার সময় বেশির ভাগ ভোক্তা পুরো মাসের সয়াবিন তেল কেনায় এখন বাজারেও অবশ্য তেমন চাপ নেই। তবে ঈদের পর বাজারে ক্রেতার ভিড় বাড়লে চাপ তৈরি হবে।

শুধু খুচরায় নয়, চট্টগ্রামের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জেও সয়াবিন তেলের মজুত কমে আসছে। সেখানে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বেচাকেনা হচ্ছে ১৫০-১৫১ টাকায়। এমন দরের কথা শোনা গেলেও সয়াবিন তেল লেনদেন খুবই সীমিত আকারে হচ্ছে বলে পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান।

জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জের পাইকারি প্রতিষ্ঠান আরএম এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার শাহেদ উল আলম বলেন, পরিশোধন কারখানা থেকে সয়াবিন তেলের সরবরাহ কম। এ কারণে পাইকারিতে বেচাকেনাও কমেছে।

চাহিদা বনাম আমদানি

গত ২০২০-২১ অর্থবছরে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে ৭ লাখ ৮৫ হাজার টন। আর প্রায় ২৪ লাখ টন সয়াবিন বীজ থেকে পাওয়া যায় ৪ লাখ ৩৩ হাজার টন। অপচয় বাদ দিলে কমবেশি ১২ লাখ টন সয়াবিন আমদানি হয়েছে বলা যায়। গত অর্থবছরের উদাহরণ আমলে নিলে অপরিশোধিত আকারে প্রতি মাসে ৬৫ হাজার টন ও সয়াবিন বীজের মাধ্যমে ৩৬ হাজার টন মিলিয়ে মাসে প্রায় এক লাখ টনের চাহিদা রয়েছে।

দেশে ছয়টি প্রতিষ্ঠান অপরিশোধিত আকারে সয়াবিন এনে তা পরিশোধন করে বাজারে ছাড়ে। আর কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সয়াবীজ আমদানি করে তা প্রক্রিয়াকরণের পর সয়াবিন তেল বাজারজাত করে। দুভাবেই দেশে বছরে ১২-১৩ লাখ টন সয়াবিনের চাহিদা পূরণ হয়। তবে দাম বাড়লে চাহিদা কিছুটা কমে।

সামনে কী হবে?

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগে থেকেই বিশ্ববাজারে সয়াবিন তেলের দাম চড়া ছিল। যুদ্ধ শুরুর পর সয়াবিন তেলের দামে অস্বাভাবিক উত্থান হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কমোডিটি এক্সচেঞ্জ শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে (সিবিওটি) দেখা যায়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে দাম বেড়ে ১১ মার্চ প্রতি টন সয়াবিন তেলের দর ১ হাজার ৮১১ ডলারে উঠে যায়। এরপর থেকে কোনো দিন কমে, আবার কোনো দিন বাড়ে এভাবে চলছে। মাঝে কিছুদিন কমার পর আবার বেড়ে গত মঙ্গলবার ১ হাজার ৬৬২ ডলারে ওঠে। টনপ্রতি ১৪৯ ডলার কমলেও যুদ্ধের আগের চেয়ে এখনো দর বেশি।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখন সয়াবিন আমদানি করলে প্রতি টনের দর পড়বে ১ হাজার ৮৬০ ডলারের মতো, যা যুদ্ধের আগের চেয়ে বেশি। দাম যা–ই হোক, আমদানি না বাড়ালে সামনে সংকট তৈরি হবে।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন