বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সরেজমিন টেকনাফ উপজেলার সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ, নয়াপাড়া, লেদা, বাহারছড়া, হ্নীলা, হোয়াইক্যং, কাঞ্জরপাড়া হাটে ঘুরে দেখা গেছে, সর্বত্রই চড়ামূল্যে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির পশু। গরুর ওজন আড়াই থেকে তিন মণ হলে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার, ৪ থেকে ৫ মণ হলে ১ লাখ ৪৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং ৮ থেকে ১০ মণ ওজনের ক্ষেত্রে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে।
টেকনাফ পৌরসভার প্যানেল মেয়র আবদুল্লাহ মুনির প্রথম আলোকে বলেন, মিয়ানমারের পশু আমদানি বন্ধ থাকায় স্থানীয় গরু-মহিষের দাম অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিটি গরু-মহিষের বিপরীতে ৩০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত আদায় হচ্ছে। প্রতি কেজি মাংসের দাম সর্বোচ্চ ১ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত পড়ছে। ফলে অনেকে চাহিদামতো কোরবানির পশু কিনতে পারছেন না।

মিয়ানমারে আটকা ২০ হাজার পশু

জেলা চোরাচালান প্রতিরোধ টাস্কফোর্স কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৫ জুলাই থেকে শাহপরীর দ্বীপ করিডর দিয়ে পশু আমদানি বন্ধ করা হয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন টেকনাফের অর্ধশতাধিক পশু ব্যবসায়ী। কারণ, কোরবানি উপলক্ষে তাঁরা মিয়ানমারে অন্তত ২২ হাজার গরু-মহিষ কিনেছিলেন। এর মধ্যে আনতে পেরেছেন মাত্র ২ হাজার ৪৭১টি গরু ও মহিষ। এর বিপরীতে সরকার রাজস্ব (প্রতিটি পশুতে ৫০০ টাকা) পেয়েছে ১২ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা।

জানতে চাইলে টেকনাফের কাস্টমস সুপার আবদুন নূর বলেন, ৯ থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত ৯ দিনে শাহপরীর দ্বীপ করিডর দিয়ে কোনো পশু আমদানি হয়নি। মিয়ানমারে আটকে থাকা পশুগুলো আনার জন্য ব্যবসায়ীরা ধরনা দিয়ে চলেছেন, কিন্তু এখনো অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি।

এই করিডর দিয়ে ১০ বছর ধরে মিয়ানমারের পশু আমদানি করছেন টেকনাফের গুদার বিলের ব্যবসায়ী আবু ছৈয়দ। এবারও তিনি মিয়ানমারে ১ হাজারের বেশি গরু-মহিষ কিনেছিলেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে তিনি পশুগুলো টেকনাফে আনতে পারছেন না বলে জানান।

একইভাবে মিয়ানমারে আটকা আছে টেকনাফ পৌরসভার ব্যবসায়ী সোহেল রানার ৫০০টি, শহীদুল ইসলামের ৪৫০টি, মো. আলমগীরের ৭০০টি, চৌধুরী পাড়ার ম ম চিং–এর ৭০০টি গরু ও মহিষ।

ব্যবসায়ী শহীদুল ইসলাম বলেন, মিয়ানমারের পশু আমদানি বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাজারে সংকট দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত দামে পশু বিক্রি হওয়ায় সাধারণ মানুষ তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী পশু কিনতে পারছেন না।

শাহপরীর দ্বীপ করিডর পশু ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ কাসিম প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবছর কোরবানির সময় দেশে পশুর সংকট দেখা দেয়। সেই সংকট পূরণের জন্য সরকারিভাবে মিয়ানমার থেকে পশু আমদানিতে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করা হয়। গত বছর কোরবানির সময় এই করিডর দিয়ে অন্তত ৩০ হাজার পশু আনা হয়েছিল। এবারে ব্যবসায়ীরা মিয়ানমারে অন্তত ২২ হাজার গরু-মহিষ কিনেছেন। কিন্তু হঠাৎ করিডর বন্ধ করায় অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী বিপাকে পড়েছেন। মিয়ানমারে পশু কেনার টাকা এখন ফেরত আনা ব্যবসায়ীদের জন্য অনেক কঠিন হবে।

শাহপরীর দ্বীপ করিডর চালু হয় ২০০৩ সালে। গত মার্চ–জুন চার মাসে এই করিডর দিয়ে ৪৪ হাজার ৪৩৬টি পশু আমদানি হয়েছে। এর বিপরীতে সরকার রাজম্ব পেয়েছে ২ কোটি ২২ লাখ ১৮ হাজার টাকা।

জেলার ৬৩ হাটেই সংকটের শঙ্কা

কক্সবাজার জেলার উখিয়া, কক্সবাজার সদর, রামু, চকরিয়া, পেকুয়াসহ বিভিন্ন উপজেলার ৬৩টি হাটবাজারে গত শুক্রবার থেকে কোরবানির পশু বিক্রি জমে উঠেছে। তবে সব জায়গাতেই পশুর দাম চড়া।

রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি হাটে প্রায় ৮ মণ ওজনের একটি গরু নিয়ে এসেছেন স্থানীয় কৃষক আবু ছৈয়দ। তিনি গরুটির দাম হাঁকিয়েছেন সাত লাখ টাকা। কয়েকজন ক্রেতা গরুটি ৩ লাখ ৫৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বলেছেন। আবু ছৈয়দ জানান, তিনি পাঁচ লাখ টাকার কমে এই গরু বিক্রি করবেন না। কারণ, বাজারে এ রকম নাদুসনুদুস গরুর সংকট রয়েছে।

কক্সবাজার সদর উপজেলার খরুলিয়াবাজারে ৬ থেকে ৮ মণ ওজনের বড় গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে পাঁচ থেকে ১২ লাখ টাকা। অবশ্য এ রকম বড় গরুর ক্রেতা কম। এই বাজারে গরু কিনতে আসা শহরের টেকপাড়ার ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন বলেন, মিয়ানমারের পশু আমদানি বন্ধ না হলে স্থানীয় পশুর দাম নিয়ন্ত্রণে থাকত।
এদিকে ১১ লাখ রোহিঙ্গার জন্য কয়েক হাজার পশু কেনা হচ্ছে। এটিও বাজারে কোরবানির পশুর সংকট দেখা দেওয়ার আরেকটি বড় কারণ।

অন্যদিকে সংকটের শঙ্কা নেই জানিয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) অসীম বরণ সেন প্রথম আলোকে বলেন, পুরো কক্সবাজারে কোরবানির পশুর চাহিদা ১ লাখ ৬৫ হাজার। প্রায় ৮ হাজার খামারির কাছে পশু মজুত আছে ১ লাখ ৭৩ হাজার। এর মধ্যে গরু ১ লাখ ৯ হাজার ৮২৩টি, মহিষ ৫ হাজার ৯৮টি, ছাগল ৪৬ হাজার ৮৭টি এবং ভেড়া ১২ হাজার ৫১১টি। পশুর রোগবালাই পরীক্ষার জন্য ২২টি মেডিকেল টিম মাঠে নামানো হয়েছে।

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, সরকারি সিদ্ধান্তে শাহপরীর দ্বীপ করিডর দিয়ে মিয়ানমারের পশু আমদানি বন্ধ করা হয়েছে। এতে স্থানীয় খামারিরা পশুর ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন