বিজ্ঞাপন
default-image

সমঝোতা ব্যর্থ, তাই নির্বাচন

বিজিএমইএতে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয় ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সে সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল সম্মিলিত পরিষদ ও ফোরাম। তারপরের নির্বাচনের আগেই সমঝোতার মাধ্যমে সংগঠনের পরিচালনা পর্ষদ চূড়ান্ত করতে চুক্তি করে এই দুই জোট।

দুই মেয়াদের জন্য সেই সমঝোতার প্রথম দফায় অর্থাৎ ২০১৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সম্মিলিত পরিষদের সিদ্দিকুর রহমানের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটিতে সম্মিলিত পরিষদ ৪ সহসভাপতিসহ ১৪ পরিচালক এবং ফোরাম ৩ সহসভাপতিসহ ১৩ পরিচালকের পদ পায়। দুই বছরের জন্য গঠিত সেই কমিটি নানা অজুহাতে ৩ দফায় ১৯ মাস বাড়তি দায়িত্ব পালন করে। পরে তৎকালীন সভাপতি আবার সময় বাড়ানোর চেষ্টা করলেও তা রুখে দেন সংগঠনের সাবেক সভাপতিরা। বিজিএমইএর সভাপতির পদ ছাড়তে হলেও সংগঠনটির মনোনয়নে সিদ্দিকুর রহমান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি হন।

সিদ্দিকুর রহমান দায়িত্ব ছাড়ার পর সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী কমিটি করার উদ্যোগ নেয় ফোরাম ও সম্মিলিত পরিষদ। কিন্তু হঠাৎ করে ডিজাইন অ্যান্ড সোর্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে স্বাধীনতা পরিষদ নামের নতুন জোট নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। তাদের নানাভাবে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন অপর দুই জোটের নেতারা। জাহাঙ্গীর আলমের সদস্যপদ নিয়েও টান দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা পরিষদ ঢাকায় প্রার্থী দেয়। সে কারণে নিয়ম রক্ষার ভোট হয় ২০১৯ সালে। সব কটি পদেই জয়ী হয় ফোরাম-সম্মিলিত পরিষদ প্যানেল। ফোরামের রুবানা হকের নেতৃত্বে বিজিএমইএর কমিটি হয়। এতে ফোরাম ৪ সহসভাপতিসহ ১৪ পরিচালক এবং সম্মিলিত পরিষদ ৩ সহসভাপতিসহ ১৩ পরিচালকের পদ পায়।

আগামী নির্বাচন সামনে রেখে ফোরামের নেতারা আবারও সমঝোতার মাধ্যমে কমিটি করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এবার সায় দেননি সম্মিলিত পরিষদের নেতারা। পরে বর্তমান কমিটি ৬ মাস মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা করলে সেটিও ব্যর্থ হয়। অবশ্য সমঝোতা না হওয়া ও কমিটির মেয়াদ বৃদ্ধি না হওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে সাবেক সভাপতিরা। সেখানে সম্মিলিত পরিষদের পাল্লা ভারী। ১৪ জন সাবেক সভাপতির মধ্যে ১১ জনই এই জোটের।

সমঝোতা না হওয়ার জন্য সম্মিলিত পরিষদের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী আব্দুস সালাম মুর্শেদী গত সোমবার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘দুবার সমঝোতার মাধ্যমে যোগ্যদের নিয়ে পরিচালনা পর্ষদ করা হয়েছিল। তবে সদস্যরা প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা পাননি। সে কারণে সদস্যরা নির্বাচন চেয়েছেন। নির্বাচন হলে পরিচালনা পর্ষদের মধ্যে দায়বদ্ধতা থাকে।’ অবশ্য ওই দিন জোটের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ফোরাম সাংগঠনিকভাবে অগোছালো। তাই নির্বাচনে সম্মিলিত পরিষদের জেতার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এ কারণে ফোরামের সঙ্গে সমঝোতা হয়নি।

গত ২০১৩ সালের নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৩ হাজার ১৯৬ জন। ভোট দেন ২ হাজার ৮১৩ জন। সেবার সম্মিলিত পরিষদের দলনেতা আতিকুল ইসলাম সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭০০ ভোট পান। ফোরামের দলনেতা মাহমুদ হাসান খান পেয়েছিলেন ১ হাজার ৩৭৭ ভোট। ঢাকা ও চট্টগ্রামের ২৭ পরিচালক পদের ২১টিতে জয়লাভ করেছিল সম্মিলিত পরিষদ। ফোরাম জয় পায় ৬ পদে।

জানতে চাইলে ফোরামের নেতা মাহমুদ হাসান খান গত মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০১৫ সালে নির্বাচনে জিততে পারবে না বলেই সম্মিলিত পরিষদ সমঝোতা করেছিল। এখনো আমাদের অবস্থান ভালো। আশা করি, নির্বাচনে আমরা জিততে পারব।’

গত ২০১৩ সালের নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৩ হাজার ১৯৬ জন। ভোট দেন ২ হাজার ৮১৩ জন। সেবার সম্মিলিত পরিষদের দলনেতা আতিকুল ইসলাম সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭০০ ভোট পান। ফোরামের দলনেতা মাহমুদ হাসান খান পেয়েছিলেন ১ হাজার ৩৭৭ ভোট। ঢাকা ও চট্টগ্রামের ২৭ পরিচালক পদের ২১টিতে জয়লাভ করেছিল সম্মিলিত পরিষদ। ফোরাম জয় পায় ৬ পদে।

ডিজিটাল কার্ড জটিলতা


বিজিএমইএর বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনে স্বচ্ছতা আনতে সদস্যদের ভোট প্রদানে ডিজিটাল বা বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেয়। স্বাধীনতা পরিষদ বিষয়টিকে স্বাগত জানালেও সম্মিলিত পরিষদ তীব্র বিরোধিতা করায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ভোটে ডিজিটাল কার্ড বাধ্যতামূলক করার ব্যাপারে সুর কিছুটা নরম করেছেন পর্ষদের নেতারা।

সংগঠনের বোর্ড সভায় গত ডিসেম্বরে সরকারের প্রণোদনা প্রাপ্তি ও সংগঠনের বিভিন্ন সেবা প্রদানে বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র করার সিদ্ধান্ত হয়। তাতে সদস্যের ছবি, আঙুলের ছাপসহ সব তথ্যই অন্তর্ভুক্ত থাকবে। গত ১৬ জানুয়ারি কার্যক্রম সদস্যদের বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্রের জন্য ছবি, স্বাক্ষর ও আঙুলের ছাপ নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। ইতিমধ্যে ১ হাজার ৬০০ সদস্যের বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্রের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

প্রচারণায় মন্ত্রী-মেয়র-এমপি

বিজিএমইএর আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে এরই মধ্যে প্রচার-প্রচারণায় নেমেছে তিন জোট। গুলশানে সম্মিলিত পরিষদের নির্বাচনী কার্যালয়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গত সোমবার উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই সম্মিলিত পরিষদের সভাপতি। তা ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামও ছিলেন। বর্তমানে তিনি সম্মিলিত পরিষদের সাধারণ সম্পাদক। বিজিএমইএর আরেক সাবেক সভাপতি ও সাংসদ শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন নিয়মিতই ফারুক হাসানের নির্বাচনী সভায় হাজির হচ্ছেন। আরেক সাংসদ ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী সম্মিলিত পরিষদের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে নির্বাচনী মাঠে ফোরামের পক্ষে মন্ত্রী, সাংসদের উপস্থিতি নেই।

জানতে চাইলে ফোরামের দলনেতা এ বি এম সামছুদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাননীয় মন্ত্রী ও সাংসদ সকলের জন্যই কাজ করেন। তাঁদের ভূমিকাকে একটি ব্যবসায়িক গ্রুপের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তাঁদের পদমর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা হবে। কাজেই মন্ত্রী ও সাংসদদের কোনো নির্দিষ্ট গ্রুপের পক্ষে প্রচারণা না চালাতে অনুরোধ করি।’

কাঁদা-ছোড়াছুড়ি চলছে

গত ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর একটি হোটেলে ফোরামের দলনেতা ঘোষণার অনুষ্ঠানে জোটের একজন সমর্থক অভিযোগ করেন, সম্মিলিত পরিষদ থেকে ক্ষমতায় এলে তাকিয়ে থাকেন কবে মন্ত্রী-এমপি হবেন। সভাপতি হওয়ার পর পোশাক ব্যবসা তাঁদের কাছে গৌণ হয়ে যায়। বিজিএমইএর সভাপতির পদ ব্যবহার করে সম্মিলিত পরিষদের একজন নেতা ড্রেজারসহ বিভিন্ন ঠিকাদারি ব্যবসা করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পাল্টা জবাবে গত সোমবার আব্দুস সালাম মুশের্দী বলেন, জামানত হারানোর ভয় থেকে ফোরামের নেতারা উল্টোপাল্টা কথা বলছেন।

স্বাধীনতা পরিষদও পিছিয়ে নেই। গত রোববার সংবাদ সম্মেলনে জোটটির দলনেতা জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগ করেন, গত নির্বাচনে কারচুপি হয়েছিল। নির্বাচনের দিন যাঁরা দেশের বাইরে ছিলেন, তাঁদেরও ভোট দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই অভিযোগ অবশ্য সম্মিলিত পরিষদ ও ফোরাম উভয় জোটের ঘাড়েই গিয়ে পড়েছে। কারণ গতবার তারা যৌথভাবে নির্বাচন করেছিল।

দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে। বর্তমানে ৪ জন মন্ত্রী ও ১৪ জন সাংসদ পোশাক খাতের। সর্বশেষ ৪ সভাপতির মধ্যে ২ জন সাংসদ ও ১ জন মেয়র হয়েছেন।

টানাটানিতে ‘স্বাধীনতা পরিষদ’

২০১৯ সালের নির্বাচনে স্রোতের বিপরীতে ভোট করেও স্বাধীনতা পরিষদের দলনেতা জাহাঙ্গীর আলম ৪০০-র বেশি ভোট পেয়েছিলেন। তাই আগামী নির্বাচনে জিততে নতুন এই জোটকে নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করছে সম্মিলিত পরিষদ ও ফোরাম। এদিকে একক বা যৌথভাবে নির্বাচনে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন স্বাধীনতা পরিষদ।
জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের চিন্তাভাবনা ও কর্মসূচির সঙ্গে ঐকমত্য হলে যেকোনো জোটের সঙ্গে যৌথভাবে নির্বাচন করতে পারি। এখনো এককভাবে নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেভাবে এগোচ্ছি।’ তবে ঢাকায় ২৬ জন থাকলেও চট্টগ্রামে প্রার্থী দেওয়ার মতো ৯ জন ব্যবসায়ীকে এখনো পাননি বলে স্বীকার করেন তিনি।

স্বাধীনতা পরিষদের সঙ্গে ঐকমত্য হবে কি না, সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করলেও সম্মিলিত পরিষদ ও ফোরাম উভয় জোটের নেতারা বলছেন, আলোচনা হচ্ছে।

ভোটের উৎসব হবে তো!

দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে। বর্তমানে ৪ জন মন্ত্রী ও ১৪ জন সাংসদ পোশাক খাতের। সর্বশেষ ৪ সভাপতির মধ্যে ২ জন সাংসদ ও ১ জন মেয়র হয়েছেন। এ ছাড়া বর্তমান কমিটির সহসভাপতি এস এম মান্নান ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

নির্বাচনে প্রার্থী হবেন এমন কয়েকজন উদ্যোক্তার আশঙ্কা, জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে প্রভাবশালী উদ্যোক্তারা বিজিএমইএর নির্বাচনেও প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। অবশ্য ভোট শান্তিপূর্ণ হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন সম্মিলিত পরিষদের দলনেতা ফারুক হাসান। অন্যদিকে বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক বলেন, ভোট স্বচ্ছ হবে। কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনার শঙ্কা নেই।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন