এক বছরে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বেড়ে তিন গুণ

২০১৯-২০ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা।

এক বছরের ব্যবধানে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বেড়ে তিন গুণ হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ১ লাখ ১২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। একই সময়ে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের মুনাফা-আসল বাবদ ৭০ হাজার ২২৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। সে হিসাবে গত অর্থবছরের সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ ৪১ হাজার ৯৫৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। মোট বিক্রি থেকে মুনাফা ও আসল বাবদ পরিশোধ করা অর্থ বাদ দিয়ে এ নিট হিসাব করা হয়।

অধিদপ্তরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১২ মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিট বিক্রি হয়েছে জানুয়ারিতে ৫ হাজার ২১৫ কোটি টাকার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নিট বিক্রি হয় অর্থবছরের শেষ মাস জুনে। এ মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ছিল ৪ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। আর মে মাসে ছিল ২ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা ও এপ্রিল মাসে ১ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা।

অর্থবছরের বাকি মাসগুলোর মধ্যে মার্চে ৩ হাজার ৮৯১ কোটি, ফেব্রুয়ারিতে ৩ হাজার ৬০৯ কোটি, ডিসেম্বরে ১ হাজার ৪৪২ কোটি, নভেম্বরে ৩ হাজার ৪০২ কোটি, অক্টোবরে ৪ হাজার ৩৪ কোটি, সেপ্টেম্বরে ৪ হাজার ১৫২ কোটি, আগস্টে ৩ হাজার ৭৪৬ কোটি এবং জুলাইয়ে ৩ হাজার ৪০৮ কোটি টাকার নিট বিক্রি হয়।

স্বল্প আয়ের একশ্রেণির মানুষ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভর করে সংসার চালান। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালান। তাঁদের কথা চিন্তা করে উচ্চ মুনাফার পক্ষে অনেকে মত দেন। কিন্তু মন্ত্রী, সাংসদ, সচিব, ব্যবসায়ীরাও এই উচ্চ মুনাফা ভোগ করছেন। এ নিয়ে অর্থ বিভাগের নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠকে আলোচনা হলেও অজ্ঞাত কারণে তা থেমে গেছে। সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সরকার যে পরিমাণ টাকা সংগ্রহ করতে চায়, গ্রাহকদের চাপ থাকে বলে প্রতিবছরই তা বেড়ে কয়েক গুণ হয়ে যায়। এই চাপ কমাতে মাঝখানে সরকার কিছু নীতি-পদক্ষেপ নিলেও হাত দেয়নি মুনাফার হারে।

সঞ্চয়পত্র বিক্রির লাগাম টানতে ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে কড়াকড়ি আরোপ করতে থাকে সরকার। বিক্রি করা হচ্ছে অর্থ বিভাগের অধীনে ‘জাতীয় সঞ্চয় স্কিম অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ শীর্ষক সফটওয়্যারের সহায়তায়। ওই সময় থেকেই সঞ্চয়পত্রে মুনাফার ওপর উৎসে করের হার বাড়ানো হয়।

ব্যাংকে স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) সুদের হারের চেয়ে সঞ্চয়পত্রে প্রায় দ্বিগুণ মুনাফা মিলছে। এই সুবিধা ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে মন্ত্রী, সাংসদ ও সচিবরাও পান। তবে সঞ্চয়কারীদের জন্য যা বিনিয়োগ, সরকারের কাছে তা ঋণ। তাও আবার উচ্চ সুদের ঋণ। গত অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের মোট ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা পরিশোধ করা হয়েছে। জনগণের করের টাকায় এ মুনাফা দেওয়া হয়।

তাই সঞ্চয়পত্র বিক্রির লাগাম টানতে ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে কড়াকড়ি আরোপ করতে থাকে সরকার। বিক্রি করা হচ্ছে অর্থ বিভাগের অধীনে ‘জাতীয় সঞ্চয় স্কিম অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ শীর্ষক সফটওয়্যারের সহায়তায়। ওই সময় থেকেই সঞ্চয়পত্রে মুনাফার ওপর উৎসে করের হার বাড়ানো হয়। নিয়ম করা হয় ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উৎসে কর ৫ শতাংশ। আর বিনিয়োগ ৫ লাখ টাকার বেশি হলেই উৎসে কর ১০ শতাংশ।

তবে ১ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকা, ব্যাংক হিসাব থাকা ইত্যাদি বাধ্যতামূলক করা হয় তখন। এ বছরের ১ জুলাই থেকে যদিও একটু শিথিল করে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

নীতিনির্ধারকদের নিজেদের স্বার্থের কারণে প্রতিবছর সঞ্চয়পত্রের সুদের উচ্চ বোঝা জনগণকে বইতে হচ্ছে। গরিব ও বয়স্কদের কথা বলে এই উচ্চ সুদ বজায় রাখা হচ্ছে।
আহসান এইচ মনসুর, নির্বাহী পরিচালক, পিআরআই

বর্তমানে পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০১৫ সালের ২৩ মের পর থেকে এই হার কার্যকর রয়েছে।

সঞ্চয়পত্রের পুরো পরিস্থিতি নিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘নীতিনির্ধারকদের নিজেদের স্বার্থের কারণে প্রতিবছর সঞ্চয়পত্রের সুদের উচ্চ বোঝা জনগণকে বইতে হচ্ছে। গরিব ও বয়স্কদের কথা বলে এই উচ্চ সুদ বজায় রাখা হচ্ছে। তবে আমরা গবেষণা করে অনেক আগেই দেখিয়েছি যে কোটিপতি গ্রাহকেরাই মূলত সঞ্চয়পত্রের উচ্চ সুদের বড় সুবিধাভোগী।’