এখানকার কারিগরদের তৈরি সেমাইয়ের কদর এতটাই জনপ্রিয় যে ড্যানিশ, বনফুলসহ অনেক নামীদামি কোম্পানিও এখানে কারখানা স্থাপন করেছে। করোনার কারণে গত দুই বছর সেমাইয়ের ব্যবসায় মন্দা ছিল। এবার চাঙা ভাব বিরাজ করছে।
মাফুজুল ইসলাম, সহসভাপতি, জেলা চেম্বার

বগুড়ার প্রবীণ শিক্ষাবিদ বজলুল করিম জানান, ত্রিশের দশকে কলকাতার নাখোদা মসজিদকেন্দ্রিক লাচ্ছা সেমাইয়ের প্রচলন ছিল। সেই নাখোদা মসজিদ থেকে ঈদের আগে ট্রেনযোগে সেমাই নিয়ে এসে বগুড়ায় বিক্রি করা হতো। এরপর ধীরে ধীরে এখানে লাচ্ছা সেমাই তৈরির ছোট-বড় কারখানা গড়ে ওঠে। জেলার কাহালু উপজেলার শেখাহারে গড়ে ওঠা শতাধিক কারখানা থেকে ঈদ উৎসবে কয়েক হাজার টন লাচ্ছা সেমাই সরবরাহ করা হয় রাজধানী ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বড় বড় শহরে।

বগুড়া জেলা বেকারি মালিক সমিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দেশের চাহিদাকে কেন্দ্র করে জেলায় লাচ্ছা সেমাই তৈরির দেড় শতাধিক কারখানা গড়ে উঠেছে। বড় কারখানায় প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজার কেজি লাচ্ছা সেমাই তৈরি হয়। এ ছাড়া ছোট আকারের ৮৫০ কারখানায় দৈনিক গড়ে ৬২ লাখ কেজি সেমাই উৎপাদিত হয়।

বগুড়ার প্রসিদ্ধ রাজা লাচ্ছা সেমাই কারখানার মালিক রাজা মিয়া বলেন, লাচ্ছা সেমাইয়েরও প্রসার ঘটে চল্লিশের দশকে। শুরুর দিকে কলকাতা ও হুগলি থেকে এনে বিক্রি করা হতো। ষাটের দশকে বগুড়ার চিকন ও লাচ্ছা সেমাইয়ের সুনাম দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। আশির দশকের পর বৈচিত্র্যময় স্বাদ ও মানের লাচ্ছা সেমাই তৈরিতে খ্যাতি ছড়ায় আকবরিয়া ও এশিয়া সুইটসের।

এশিয়া সুইটসের কারখানায় দুই দশক ধরে লাচ্ছা সেমাই তৈরির প্রধান কারিগর হিসেবে কাজ করছেন আবদুল কাদের। তিনি বলেন, বর্তমানে এশিয়া ডালডা লাচ্ছা ও ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাই তৈরি করছে। এ কাজ করে দৈনিক ১ হাজার ২০০ টাকা পারিশ্রমিক পান।

চল্লিশের দশকে ভারত ও পাকিস্তান থেকে কয়েকজন কারিগর এসে বগুড়া শহরতলির চারমাথা–গোদারপাড়া এলাকায় চিকন সেমাই বানানো শুরু করেন। পরে শ্যাঁওলাগাতি গ্রামের দুলু মিয়া তাঁর এলাকায় প্রথম চিকন সেমাই তৈরি শুরু করেন। তাঁর হাত ধরে আশপাশের গ্রামের অনেকেই চিকন সেমাই তৈরির সঙ্গে যুক্ত হন। অল্পদিনেই কয়েকটি গ্রাম মিলে এ এলাকা ‘চিকন সেমাইপল্লি’ হিসেবে খ্যাতি পায়। বগুড়ার চিকন সেমাই কারিগরদের মধ্যে জনপ্রিয় বেজোড়া গ্রামের মাকসুদা বেগম। তিনি বলেন, বেজোড়া, ঘাটপাড়া, শ্যাঁওলাগাতিসহ আশপাশের ৮–১০টি গ্রামের নারীদের হাতে প্রায় ৫০ বছর ধরে তৈরি হচ্ছে চিকন সেমাই।

এদিকে চলতি মৌসুমে লাচ্ছা ও চিকন সেমাইয়ের দাম গত বছরের তুলনায় কেজিপ্রতি ৫০ টাকা বেড়েছে। বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত বছর এশিয়া সুইটস, আকবরিয়া, শ্যামলী, কোয়ালিটি, খাজা বেকারি, ফুড ভিলেজসহ নামীদামি ব্র্যান্ডের ডালডায় ভাজা লাচ্ছা সেমাইয়ের প্রতি কেজির দাম ছিল ২২০ টাকা। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬০ থেকে ২৮০ টাকা। ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাইয়ের প্রতি কেজির দাম গত বছর ছিল ৮০০ টাকা। এ বছর তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। আর গত বছর প্রতি কেজি চিকন সেমাইয়ের দাম ছিল ১০০ টাকা। এ বছর তা বেড়ে হয়েছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা।

বাড়তি দামের বিষয়ে জানতে চাইলে খাজা কনফেকশনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বায়েজিদ শেখ বলেন, আগের বছর পাম তেলের দাম ছিল প্রতি ড্রাম ১৭ হাজার টাকা। এখন সেই পাম তেলের ড্রাম কিনতে হচ্ছে সাড়ে ২৮ হাজার টাকায়। বেড়েছে ময়দা, ডালডা ও ঘিয়ের দামও। কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে গত বছরের চেয়ে এবার প্রায় দ্বিগুণ দামে লাচ্ছা সেমাই বিক্রি করতে হচ্ছে।

বগুড়ার সেমাইয়ের ব্যবসা সম্পর্কে জেলা চেম্বারের সহসভাপতি মাফুজুল ইসলাম বলেন, এখানকার কারিগরদের তৈরি সেমাইয়ের কদর এতটাই জনপ্রিয় যে ড্যানিশ, বনফুলসহ অনেক নামীদামি কোম্পানিও এখানে কারখানা স্থাপন করেছে। করোনার কারণে গত দুই বছর সেমাইয়ের ব্যবসায় মন্দা ছিল। এবার চাঙা ভাব বিরাজ করছে।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন