এসএমই ঋণের জন্য হাহাকার

ঋণ না পাওয়ায় ব্যবসা চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের।

করোনার ক্ষতি কাটাতে চাহিদা অনুযায়ী প্রণোদনা ঋণ পাওয়ার দাবি।

রেজওয়ানা রশীদ ম্যাজিক রুটি মেকার নামে একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ধরনের আচার তৈরি করে। করোনাভাইরাসের প্রভাবে তাঁর ব্যবসা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। কারখানা ভাড়া, শ্রমিকের মজুরিসহ বিভিন্ন খরচ মেটাতে তাঁকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় তিনি সরকারি প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ১৫ লাখ টাকার ঋণ চেয়েছেন, তবে পেয়েছেন ১০ লাখ। চাহিদার পুরোটা পেলে আরও ভালো হতো বলে জানান এই নারী উদ্যোক্তা।

মোফাকখার হোসেন ইকবাল ১৯৯৬ সাল থেকে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে গরম কাপড়ের (সোয়েটার) ব্যবসা করছেন। করোনাভাইরাসের প্রভাবে ব্যবসায়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। চলমান বিধিনিষেধের কারণে তাঁর কারখানা এখন বন্ধ। তাই প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ২০ লাখ টাকা পেতে একটি বেসরকারি ব্যাংকে আবেদন করেন, কিন্তু ঋণ মিলেছে ১০ লাখ টাকা। এই টাকা দিয়েই আপাতত কোনোমতে ব্যবসা চালিয়ে নিতে চান তিনি।

নোয়াখালীর চাটখিলে পারলারের ব্যবসা করছেন মারজাহান আক্তার। করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ব্যাংক থেকে আট লাখ টাকা ঋণ চেয়ে তিনি পেয়েছেন ছয় লাখ টাকা।
রেজওয়ানা, ইকবাল ও মারজাহানের মতো অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) উদ্যোক্তা সরকারঘোষিত প্রণোদনা ঋণ পেতে ব্যাংকে আবেদন করে চাহিদার অর্ধেক কিংবা তিন ভাগের এক বা দুই ভাগ পেয়েছেন। কিন্তু বহু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ঋণ চেয়ে পাননি। পুরো খালি হাতে ফিরেছেন।

সরকারের দ্বিতীয় দফায় ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজে এসএমই খাতের জন্য বরাদ্দ করা তিন হাজার কোটি টাকার মধ্যে এসএমই ফাউন্ডেশনকে দেওয়া হয় ৩০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সদ্য বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ১০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়। বাকি ২০০ কোটি টাকা চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরের ১১ মে থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে ১১৫ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। প্রণোদনার বাইরে ১৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে এসএমই ফাউন্ডেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে।

আমাদের বরাদ্দ কম, কিন্তু চাহিদা বেশি। আমরা স্বচ্ছতার সঙ্গে ১১৫ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছি। আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাকি ২০০ কোটি টাকা বিতরণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
মফিজুর রহমান, এমডি, এসএমই ফাউন্ডেশন

জানা গেছে, বিদায়ী অর্থবছরে তিন হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রণোদনা ঋণের জন্য আবেদন করেন। তাঁদের মোট চাহিদার পরিমাণ ছিল প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ৪৪ জন উদ্যোক্তাকে মোট ১১৫ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়। অন্যদিকে ১ হাজার ৯৫৬ জন আবেদনকারী ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের বরাদ্দ কম, কিন্তু চাহিদা বেশি। আমরা স্বচ্ছতার সঙ্গে ১১৫ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছি। আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাকি ২০০ কোটি টাকা বিতরণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আমরা যদি স্বচ্ছতার সঙ্গে ঋণ বিতরণ করতে পারি, তাহলে সরকারের কাছ থেকে আরও টাকা চাইব। আশা করি, তখন বাড়তি টাকা পাব।’

জানা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এসএমই ফাউন্ডেশন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মাঝে মোট ঋণ বিতরণ করেছে ১২০ কোটি টাকা। অথচ গত দেড় মাসেই ঋণ বিতরণ হয়েছে ১১৫ কোটি টাকা। এতে সংস্থাটির ঋণ বিতরণের সক্ষমতা প্রমাণিত হয় বলে কর্মকর্তারা দাবি করেন।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এসএমই উদ্যোক্তাদের ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার কথা। এই ঋণের সুদের হার ৪ শতাংশ। দুই বছরে ২৪ কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। গড়ে একজন গ্রাহক ঋণ পাচ্ছেন সাড়ে নয় লাখ টাকার মতো।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা জানান, তাঁদের আরও ঋণের প্রয়োজন। কিন্তু চাহিদার আলোকে ঋণ দিতে পারছে না এসএমই ফাউন্ডেশন। তাই ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর দাবি তাঁদের।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ঋণ বিতরণ করছে ১২টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে গত ১১ মে থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ব্র্যাক ব্যাংক ৪০ কোটি টাকা, আইডিএলসি ফাইন্যান্স ৩০ কোটি টাকা, ব্যাংক এশিয়া ১৪ কোটি টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ৫ কোটি, আইপিডিসি ফাইন্যান্স ৫ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংক ১০ কোটি, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স ৫ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে।

কারা পাচ্ছে ঋণ

যেসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন কাজে সম্পৃক্ত, তাঁরাই কেবল এই ঋণ পাবেন। জানা গেছে, এই সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। উদ্যোক্তাদের ঢাকায় আসতে হবে না ঋণের জন্য। নিজ জেলায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে ঋণের টাকা তুলতে পারবেন। এই ঋণ নিতে জামানত লাগে না।