করমুক্ত আয়সীমা হোক ৪ লাখ

করপোরেট কর হ্রাস, শুল্কহার পুনর্বিন্যাস, উৎসে কর ও আগাম কর বিলোপ এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের সুপারিশ।

আসছে বাজেট ২০২২–২৩

কোভিডের কারণে একদিকে আয় কমেছে, অন্যদিকে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। দুটি মিলিয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। আর সার্বিকভাবে জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে। সে জন্য ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের বার্ষিক করমুক্ত আয়ের সীমা ১ লাখ টাকা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করার পরামর্শ দিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। বর্তমানে দেশে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ টাকা।

পাশাপাশি আয়করের হারও পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব করেছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের প্রস্তাবিত করহার হলো—প্রথম ৪ লাখ টাকার জন্য করহার শূন্য রাখা। এর পরের ৩ লাখ টাকার জন্য ৫ শতাংশ, তার পরের ৪ লাখ টাকায় ১০ শতাংশ, পরের ৫ লাখ টাকায় ১৫ শতাংশ, পরের ৬ লাখ টাকায় ২০ শতাংশ এবং অবশিষ্ট টাকার ওপর ২৫ শতাংশ কর আরোপ। এ ছাড়া ঢাকাসহ বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য এলাকার জন্য ন্যূনতম কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। যেমন, ন্যূনতম কর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জন্য ৩ হাজার টাকা, বিভিন্ন সিটির জন্য আড়াই হাজার টাকা এবং অন্যান্য এলাকার জন্য ২ হাজার টাকা করা

আমার খুব কষ্ট হয় যখন অল্প কিছু বিপথগামী শুল্ক-কর কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর জন্য রাজস্ব বিভাগের বদনাম হয়। আমরা উভয়ের মধ্যে বিশ্বাস ও বন্ধুত্ব চাই।
আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, চেয়ারম্যান, এনবিআর

আসন্ন ২০২২–২৩ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই আয়োজিত পরামর্শক সভায় এসব প্রস্তাব–পরামর্শ উঠে আসে। রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা নিজেদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া তুলে ধরেন।

সভায় করপোরেট কর কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এতে এফবিসিসিআই প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির করহার আড়াই শতাংশ কমিয়ে সাড়ে ২৭ শতাংশ করার দাবি জানায়। তাদের যুক্তি হলো—প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সংগতি রেখে করপোরেট করহার নির্ধারণ করা উচিত।

‘ঘুষ দেওয়া যাবে না। যাঁরা ঘুষ দেন, তাঁদের জায়গা হবে জাহান্নামে।’
আ হ ম মুস্তফা কামাল, অর্থমন্ত্রী

ব্যবসায়ীদের যত দাবি

সভায় এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে কিছু সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো রপ্তানিসহ সব শিল্প খাতে উৎসে কর ও আগাম কর ফেরত দেওয়ার পরিবর্তে বিলোপ করা। সেই সঙ্গে শুল্কহার পুনর্বিন্যাস করে তৈরি পণ্যে ২৫ শতাংশ, দেশে উৎপাদিত হয় এমন যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ ও মধ্যবর্তী কাঁচামালে ৭ থেকে ১০ শতাংশ, মৌলিক ও দেশে উৎপাদিত হয় না এমন মধ্যবর্তী কাঁচামালে ১ থেকে ৩ শতাংশ এবং শিল্প খাতের যন্ত্রপাতি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্যে ১ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়। এ ছাড়া চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, ছোলা, বুট, ডাল, লবণ, ভোজ্যতেল ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ পর্যায়ে যে ২ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখা হয়, তা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে এফবিসিসিআই।

যাঁরা ঘুষ দেন, তাঁদের জায়গা জাহান্নামে: অর্থমন্ত্রী

শুল্ক ও কর কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে কাজ করাতে হয়—ব্যবসায়ীদের এমন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘আপনারা ঘুষ দিচ্ছেন কেন? আপনাদের কাছে অনুরোধ ঘুষ দেবেন না।’ এ সময় হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘ঘুষ দেওয়া যাবে না। যাঁরা ঘুষ দেন, তাঁদের জায়গা হবে জাহান্নামে।’

সভায় অনেক ব্যবসায়ী শুল্ক ও কর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করেন। ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের কর দিতে হবে। কর না দিলে পদ্মা সেতু কেমনে হবে? মেগা প্রকল্প শেষ হবে কীভাবে? তিনি আরও বলেন, আগামী বাজেট হবে ‘উইন উইন সিচুয়েশনের’। ব্যবসায়ীরা ঠকবেন না। আপনারা ঠকলে দেশ পিছিয়ে যাবে।

এদিকে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, ‘আমার খুব কষ্ট হয় যখন অল্প কিছু বিপথগামী শুল্ক-কর কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর জন্য রাজস্ব বিভাগের বদনাম হয়। আমরা উভয়ের মধ্যে বিশ্বাস ও বন্ধুত্ব চাই। সমালোচনা নয়, সহযোগিতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে।’

এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি জসিম উদ্দিন করদাতাদের হয়রানি না করার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, ‘ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নিরীক্ষা ও পরিদর্শনসংক্রান্ত সব কার্যক্রম বিধিমোতাবেক পরিচালনা করা উচিত। তাহলে ব্যবসায়ীরা হয়রানিমুক্ত থাকবেন।’

এ ছাড়া সভায় কয়েকজন ব্যবসায়ী কর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ তোলেন। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, অতিক্ষুদ্র দোকানগুলোকেও ভ্যাট নিবন্ধন নিতে হয়। নিবন্ধন নিয়ে রিটার্ন না দিলে ১০ হাজার টাকার করে জরিমানা করা হচ্ছে। এই ধরনের হয়রানি বন্ধ করা উচিত।

কিশোরগঞ্জ চেম্বারের সভাপতি মফিজুর রহমান বলেন, ‘পকেট রাজস্ব’ বন্ধ করতে হবে। ব্যবসায়ীরা যেন হয়রানির শিকার না হন। এসব বন্ধ করলেই শুল্ক-করের সব লক্ষ্য পূরণ হবে।

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য তহবিল দাবি

আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ারুল আলম পারভেজ নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আগামী বাজেটে বিশেষ তহবিল গঠনের সুপারিশ করেছে। এ ছাড়া তৃতীয় লিঙ্গ ও শারীরিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্দিষ্ট সংখ্যায় নিয়োগ দিলে ২ শতাংশ কর ছাড় প্রদানের প্রস্তাব করেন তিনি।