করোনায় ভালো নেই খুলনার ব্যবসায়ীরা

সারা দেশের মতো খুলনার ব্যবসায়ীরাও করোনার কারণে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। চলমান বিধিনিষেধে স্তব্ধ হয়ে আছে ব্যবসা-বাণিজ্য। এসব নিয়েই প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন খুলনা শিল্প ও বণিক সমিতির পরিচালক মো. মফিদুল ইসলাম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেখ আল-এহসান, খুলনা।

মফিদুল ইসলাম

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: করোনাকালীন ও বর্তমান বিধিনিষেধে খুলনার ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি কেমন?

মো. মফিদুল ইসলাম: প্রায় দেড় বছর ধরে আমরা করোনাকাল অতিবাহিত করছি। এর মধ্যে স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে প্রায় চার মাস কঠোর বিধিনিষেধের মধ্য দিয়ে গেছে। খুলনায় বিশেষ করে দুই ঈদ, নববর্ষ, পূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবকে কেন্দ্র করে জিনিসপত্রের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু ওই উৎসবের সময়গুলোতে চলাচলে বিধিনিষেধ থাকায় খুলনার মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প এবং ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিধিনিষেধের সময় মানুষের আয়ের সব পথ বন্ধ থাকে, কিন্তু খোলা থাকে ব্যয়ের পথ। কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, ব্যাংকঋণ থেকে শুরু করে সব ব্যয়ই করতে হয় এ সময়। এ কারণে ব্যবসায়ীদের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে ব্যাংকের ঋণে জর্জরিত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। করোনাকালীন পরিস্থিতিতে খুলনার অধিকাংশ ব্যবসায়ী এখন ঋণখেলাপি। অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: সরকারের কোনো প্রণোদনা কি খুলনার ব্যবসায়ীরা পাননি?

মো. মফিদুল ইসলাম: ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা হিসেবে সরকার ব্যাংকের মাধ্যমে কম সুদে ঋণ দেওয়ার কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন ব্যাংকে গিয়ে ব্যবসায়ীরা খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, ব্যাংক কোনো সুবিধা দিতে রাজি নয়। আগের মতোই জামানত ছাড়া তারা কোনো ঋণ দিচ্ছে না। ঋণ নিতে ব্যাংকগুলো যে শর্ত দেয়, তা পূরণ করে ঋণ নিতে গেলে ব্যবসায়ীদের সব বিক্রি করে পথে বসতে হবে। সরকার যদি অন্য কোনোভাবে ব্যবসায়ীদের বিশেষ প্রণোদনা দিত, তাহলে ভালো হতো। এ ছাড়া সরকারি ছুটির দিন ও বিধিনিষেধের দিনগুলোতে ব্যাংকের সুদ মওকুফ করা উচিত। কারণ, ওই সময়ে দোকানপাট, শিল্পকারখানা—সবই বন্ধ থাকে।

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: খুলনার রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি কেমন?

মো. মফিদুল ইসলাম: খুলনা অঞ্চলে রপ্তানির বড় দুটি খাত—পাট ও চিংড়ি। দুটিই এখন ধংসের পর্যায়ে চলে এসেছে। একসময় খুলনায় পাটের রমরমা ব্যবসা ছিল, কিন্তু এখন সরকারি পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তা আর নেই। কিছু বেসরকারি পাটকল থাকলেও তারাও ধুঁকে ধুঁকে চলছে। বিশেষ করে বহির্বিশ্বে আমাদের পাটের বাজার দখল করে নিয়েছে ভারত। অন্যদিকে কাঁচামালের সংকটে চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে। চিংড়ি চাষের জমি কমে আসা, প্রতিবছর ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে চিংড়ি চাষে ব্যাপক ক্ষতি, বহির্বিশ্বে চিংড়ির দাম কমে যাওয়ায় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে শিল্পটির অবস্থাও খুব বেশি ভালো নয়। এমন পরিস্থিতিতে কম খরচে বেশি উৎপাদনের জন্য দেশে ভেনামি চিংড়ি চাষের অনুমতি দেওয়া উচিত। এতে খাতটি কিছুটা হলেও রক্ষা পাবে।

এ ছাড়া উন্নত দেশগুলোতে যখন বিধিনিষেধ ছিল, তখন আমাদের দেশে ছিল না। তখন আমাদের দেশের পণ্য ও চিংড়ি রপ্তানি করা যেত না। আবার এখন উন্নত দেশগুলো বিধিনিষেধ তুলে

দিয়ে পুরোদমে ব্যবসা পরিচালনা করছে। আর আমরা বিধিনিষেধের কারণে এখন রপ্তানি করতে পারছি না।

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: খুলনায় ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে সরকারের করণীয় কী বলে আপনি মনে করেন?

মো. মফিদুল ইসলাম: ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের বিশেষ প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসা যেতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংকঋণ মওকুফ করা গেলে ব্যবসায়ীরা কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। পাশাপাশি ট্রেড লাইসেন্স ফি, আয়কর ফি, বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য পরিষেবা বিলের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া উচিত। সুবিধাগুলো যেন ব্যবসায়ীরা সরাসরি পেতে পারেন, সে ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে।