রাজধানী জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড থেকে ট্যানারি মোড় পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটারের মধ্যে অর্ধশতাধিক ওষুধের দোকান। স্থানীয় দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব দোকানের মধ্যে ২৫ শতাংশ গড়ে উঠেছে গত দুই বছরে, করোনাকালে। এ সড়কে একসময় ছিল সুপারশপ মীনা বাজারের একটি শাখা। করোনার মধ্যে সেটি বন্ধ হয়ে সেখানে গড়ে উঠেছে ওষুধের দোকান। সম্প্রতি সরেজমিনে কথা হয় ট্যানারি মোড়ের মাহিন ফার্মেসির স্বত্বাধিকারী মিজানুর রহমানের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনার মধ্যে বেচাকেনা বেশ ভালো ছিল। এমনও দিন গেছে, দিনে এক লাখ টাকার ওষুধ বিক্রি করেছি। এ কারণে এই এলাকায় গত দুই বছরে ওষুধের দোকানের সংখ্যা বেড়েছে। তবে এখন বেচাকেনা কম।’

দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফার্মেসির বাইরে আরও লাখখানেক ফার্মেসি রয়েছে। যাদের অনেকে হয়তো নিয়মকানুন মেনে চলেন না। তাই এসব ফার্মেসিকে তদারকির আওতায় আনার কাজ করছি আমরা।
মোহাম্মদ ইউসুফ, মহাপরিচালক, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর

শুধু শহর নয়, গ্রামে-গঞ্জেও বেড়েছে ফার্মেসির সংখ্যা। পুরোনো ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি তরুণেরাও এখন এ ব্যবসায় ঝুঁকছেন। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন বাজারে করোনার আগে ওষুধের দোকান ছিল তিনটি। গত দুই বছরে সেখানে নতুন দুটি ফার্মেসি চালু হয়েছে। চার মাস আগে এ বাজারে ওষুধের দোকান চালু করেন তৌহিদ হাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনার সময় ফার্মেসির ব্যবসা ভালো হয়েছে দেখে নতুন করে এ ব্যবসায় যুক্ত হলাম।’

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) ২০১৯-২০ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে এখন সাধারণ দোকান ও মডেল ফার্মেসি মিলিয়ে সনদপ্রাপ্ত ফার্মেসির সংখ্যা ১ লাখ ৫৫ হাজার ৫৮৯। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬২৯। অর্থাৎ করোনার প্রথম ধাপে দেশে ফার্মেসির সংখ্যা বেড়েছে ২১ হাজার ৯৬০টি। তবে সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরের হালনাগাদ তথ্য সংস্থাটি জানাতে পারেনি। এর আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে ফার্মেসির সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ৪৮৯। ডিজিডিএর তথ্যানুযায়ী, দেশে এখন মডেল ফার্মেসির সংখ্যা ৭৩৯, যার অধিকাংশই ঢাকায় অবস্থিত।

করোনার মধ্যে ওষুধের ব্যবসা বেশ ভালো হয়েছে। এ সময়ে আমাদেরও ব্যবসা বেড়েছে। গত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে ৩০টির বেশি নতুন শাখা খুলেছে লাজ ফার্মা।
মোহাম্মদ লুত্ফর রহমান, প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী, লাজ ফার্মা

জানতে চাইলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফার্মেসির বাইরে আরও লাখখানেক ফার্মেসি রয়েছে। যাদের অনেকে হয়তো নিয়মকানুন মেনে চলে না। তাই এসব ফার্মেসিকে তদারকির আওতায় আনার কাজ করছি আমরা।’

এদিকে করোনাকালে নতুন কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠান যেমন ফার্মেসি ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি পুরোনো প্রতিষ্ঠিত করপোরেটরাও এ খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম এ কে এস ফার্মেসি, তামান্না ফার্মেসি, আলেশা ফার্মেসি, ইউনাইটেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ওয়েল বিং ও প্রাণ-আরএফএলের বেস্ট বাই ফার্মেসি।

ফার্মেসি ব্যবসায় দেশের সবচেয়ে বড় রিটেইল চেইন গড়ে তুলেছে লাজ ফার্মা। দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের ৬৯টি মডেল ফার্মেসি রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ লুত্ফর রহমান বলেন, ‘করোনার মধ্যে ওষুধের ব্যবসা বেশ ভালো হয়েছে। এই সময়ে আমাদেরও ব্যবসা বেড়েছে। গত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে ৩০টির বেশি নতুন শাখা খুলেছে লাজ ফার্মা।’ লুত্ফর রহমান জানান, দেশে মডেল ফার্মেসির শুরুটা তাদের হাত ধরেই। তাদের দেখাদেখি এখন অনেক বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ফার্মেসি ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে।

করোনার মধ্যেই ফার্মেসি ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের বেস্ট বাই শোরুমে ওষুধের জন্য আলাদা কর্নার চালু করেছে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৫টি শোরুমে ওষুধের কর্নার সংযোজন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

জানতে চাইলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনার মধ্যেই আমরা ফার্মেসি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। গ্রাহকদের ভালো সাড়া পাচ্ছি। আগামী এক বছরের মধ্যে ঢাকায় ৫০টির মতো বেস্ট বাই ফার্মেসি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। পর্যায়ক্রমে ঢাকার বাইরেও বেস্ট বাইয়ের শোরুমে ওষুধের ফার্মেসি চালুরও পরিকল্পনা রয়েছে।’

দোকানের পাশাপাশি অনলাইনেও এখন ফার্মেসি ব্যবসা পরিচালনা করছে অনেকে। ফেসবুক বা অনলাইনভিত্তিক এসব প্রতিষ্ঠান মূলত হোম সার্ভিস দিয়ে থাকে। অনেক প্রতিষ্ঠিত ফার্মেসিও এখন অনলাইন সেবা চালু করেছে।

আইন ছাড়াই চলছে অনলাইন ফার্মেসি

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করোনার মধ্যে বেশ কিছু অনলাইনভিত্তিক ওষুধ বিক্রির প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। করোনার মধ্যেই অনলাইনভিত্তিক এ ব্যবসার বেশি সম্প্রসারণ হয়েছে। অনলাইনকেন্দ্রিক ফার্মেসির মধ্যে রয়েছে বাংলামেডস ডটকম, ফার্মেসি ডটকম, ওষুধওয়ালা ডটকম, ই-ফার্মা ডটকম, খিদমত ড্রাগ অনলাইন, আরোগ্য ডটকম, ওষুধপত্র ডটকম ও প্রাভা অনলাইন ফার্মেসি ইত্যাদি। অনলাইনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ওষুধ বিক্রি করলেও এখনো তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। এ জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আইনও নেই। ফলে প্রচলিত ধারার ওষুধের দোকানকে যত সহজে তদারকি করা যায়, অনলাইনের ক্ষেত্রে তা অনেকটা কষ্টসাধ্য। তা ছাড়া ক্রেতারা যখন অনলাইনে ওষুধের চাহিদা জানান, তখন ব্যবস্থাপত্র নিয়েও তৈরি হয় নানা জটিলতা।

এ ক্ষেত্রে দ্রুত আইন প্রণয়ন জরুরি বলে মনে করেন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফ। তিনি বলেন, ‘যখন মডেল ফার্মেসির অনুমোদন দেওয়া হয়, তখন কিছু অনলাইন প্রতিষ্ঠানকেও ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। পরে কিছু জটিলতা সামনে এলে আমরা আপাতত অনলাইনে ব্যবসার অনুমতি প্রদান বন্ধ রেখেছি। তবে এটিকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনতে আইন প্রণয়নসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে সরকার।’