default-image

করোনার দ্রুত সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারের দেওয়া বিধিনিষেধে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন ছোট ব্যবসায়ীরা। এবারের বিধিনিষেধে কলকারখানা খোলা রাখার সুযোগ দেওয়া হলেও বিপণিবিতান, রেস্তোরাঁ, সবজি বিক্রেতাসহ কম পুঁজির ব্যবসায়ীদের ওপর তুলনামূলক কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সীমিত পরিসরে অফিস, ব্যাংক খোলা রাখা হলেও খড়্গ পড়েছে লাখ লাখ ছোট ব্যবসায়ীর ওপর। ইতিমধ্যে দোকানপাট খোলা রাখার দাবিতে রাজধানী ও ঢাকার বাইরে ব্যবসায়ীরা মাঠে নেমেছেন।

সরকারের পক্ষ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, হোটেল, রেস্তোরাঁ খোলা থাকবে। তবে সেখানে বসে খাওয়া যাবে না। এর ফলে রেস্তোরাঁ ব্যবসায় ধস নামতে পারে। সীমিত পরিসরে খোলা রাখলেও কর্মীদের বেতনভাতাসহ পরিচালন খরচ কমবে না। রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সরকারের এই বিধিনিষেধের কারণে বেচাকেনা ৬০-৭০ শতাংশ কমতে পারে।

ঢাকা শহরের একটি মাঝারি মানের অর্থাৎ ৩০-৪০ সিটের একটি রেস্টুরেন্টে গড়ে ৩০ জন কর্মী কাজ করেন। তাঁদের বেতনভাতা বাবদ ৪ লাখ টাকার মতো খরচ হয়। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস বিল তো আছে। জানা গেছে, কর্মীদের খরচ উঠিয়ে আনার জন্যও অনেক রেস্তোরাঁ খোলা রাখা হবে। বর্তমানে ঢাকা শহরে আট হাজার রেস্তোরাঁ আছে। কয়েক লাখ কর্মী কাজ করেন এই খাতে।

বিজ্ঞাপন

গুলিস্তান এলাকার জিরো পয়েন্টের পাশে ইয়েমেনি রেস্তোরাঁ। এই রেস্তোরাঁর গ্রাহক মূলত ওই এলাকার বিভিন্ন বিপণিবিতানের ক্রেতা-কর্মীরা। বিপণিবিতান বন্ধের ঘোষণায় বিপাকে পড়েছেন রেস্তোরাঁটির মালিক খন্দকার রুহুল আমিন।

তিনি বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি। খন্দকার রুহুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনার প্রথম ঢেউয়ের পর আমরা যখন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিলাম, তখনই নতুন এ বিধিনিষেধ আমাদের পথে বসিয়ে দেবে।’ তিনি সুপারিশ করেন অন্তত স্বাস্থ্যবিধি মেনে দূরত্ব বজায় রেখে রেস্তোরাঁয় বসে খাওয়ার সুযোগ দেওয়ার। তাঁর মতে, রেস্তোরাঁয় এসে খাবার নিয়ে যাবেন, বাসায় খাবেন—এটা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ, অনলাইন খাবার অর্ডার করলে ফুডপান্ডার মতো সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাসায় খাবার পৌঁছে দেয়।

সরকার বলেছে, শপিং মলসহ সব ধরনের দোকানপাট বন্ধ থাকবে। তবে অনলাইনে পণ্য বিক্রি করা যাবে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবে, রাজধানীতে দোকানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার লাখ। মাত্র হাতে গোনা কয়েক শ প্রতিষ্ঠান শুধু অনলাইনে পণ্য বিক্রির মতো সক্ষমতা আছে। আর শপিং মল রয়েছে দেড় শতাধিক।

দোকান ও শপিং মল বন্ধের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ কর্মীকে বেকার বসে থাকতে হবে। জানা গেছে, একটি মাঝারি মানের শপিং মলের একটি দোকানের ভাড়া, কর্মীদের বেতনভাতা, গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ বিলসহ প্রতি মাসে খরচ হয় দুই থেকে তিন লাখ টাকা। দোকান বন্ধ থাকলেও এই টাকা খরচ হবেই।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বইমেলা খোলা রাখা গেলে কেন কয়েক ঘণ্টার জন্য দোকান খোলা যাবে না, তা আমাদের বোধগম্য নয়। দুই দিন ধরে দিনে দুই-তিন ঘণ্টা দোকান খোলা রাখার জন্য সরকারের বিভিন্ন মহলে চেষ্টা করে বিফল হয়েছি।’ তিনি জানান, গতবার পয়লা বৈশাখ ও দুই ঈদে বেচাকেনা হয়নি বললেই চলে। তখন একবার পুঁজি নষ্ট হয়েছে। এখন আবারও পুঁজি নষ্টের পথে। তাই অনেকের জীবিকা ঠিক রাখতে সীমিত পরিসরেও দোকান খোলার রাখার সুপারিশ করেন মো. হেলাল উদ্দিন।

কাঁচাবাজার খোলা থাকবে প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত। কিন্তু কঠিন শর্ত মেনে বেচাকেনা করতে হবে। শর্ত হলো, খোলা ও উন্মুক্ত স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বেচাকেনা করতে হবে। কিন্তু রাজধানীর উত্তরা, গুলশান, বনানী, মহাখালীসহ এমন অনেক বাজার আছে, যেখানে শাকসবজির দোকানগুলো স্থায়ী অবকাঠামোয় তৈরি। তাদের পক্ষে খোলা উন্মুক্ত স্থানে শাকসবজি, মাছ-মাংসের দোকান সরিয়ে নেওয়া কঠিন। এ কারণে শত শত সবজি বিক্রেতাকে বসে থাকতে হবে। গতবারের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, এমন পরিস্থিতিতে শাকসবজির সরবরাহ কম থাকে, দামও চড়া হয়।

দেশের পোশাক ব্যবসাটি মূলত ঈদুল ফিতর ও পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করেই হয়। দুটি উৎসবই সামনে। এ খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, দেশের ফ্যাশন হাউসগুলোর বার্ষিক বেচাকেনার প্রায় ৭৫ শতাংশ হয় এই দুটি উৎসবে।

বিজ্ঞাপন

করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারের বিধিনিষেধ আরোপের ফলে বিপাকে পড়েছে ফ্যাশন হাউসগুলো। দেশের পাঁচ হাজার ফ্যাশন হাউসের দোকান বন্ধ থাকবে। বসে থাকবেন প্রায় ৫০ লাখ কর্মী। অনলাইনে বিক্রির সুযোগ থাকলেও সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা আছে।

ফ্যাশন হাউস মালিকদের সংগঠন ‘ফ্যাশন উদ্যোগ’-এর সাবেক সভাপতি আজহারুল হক প্রথম আলোকে বলেন, এবার বৈশাখ ও ঈদে গতবারের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে ওঠার আশা করেছিলাম। সেই আশা গুড়ে বালি। ফ্যাশন হাউস মালিকদের বাঁচাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকানগুলো খোলার সুযোগ দেওয়া উচিত।

মার্কেট ও দোকান খোলা রাখার দাবিতে বিক্ষোভ

এদিকে শপিং মল-দোকানপাট খোলা রাখার দাবিতে গতকাল রোববার রাজধানীতে বিক্ষোভ হয়েছে। রাজধানীর নিউমার্কেটের সামনে মিরপুর রোডে প্রায় আড়াই ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন আশপাশের বিপণিবিতানের ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, বিধিনিষেধ শিথিল করে হলেও দোকানপাট খোলা রাখার সুযোগ দেওয়া হোক।

বেলা আড়াইটার দিকে নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি দেওয়ান আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল ব্যবসায়ী মানববন্ধন করেন। বিক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা এ সময় সড়ক অবরোধ করেন। এর ফলে পাঁচটা পর্যন্ত মিরপুর সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। এই সময় নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজট দেখা দেয়।

এদিকে দোকানপাট খোলা রাখার দাবি জানিয়েছে রাজশাহী ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদ। দাবি না মানলে আন্দোলনের ঘোষণা দেন তাঁরা। গতকাল নগরের আরডিএ মার্কেটে সংগঠনের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন রাজশাহী ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক ফরিদ মামুদ হাসান।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন