default-image

ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ির ‘রাজধানী খ্যাত’ পাথরাইল ইউনিয়নে এবারে ঈদের আমেজ নেই। সরকারের চলমান বিধিনিষেধ বা ‘লকডাউনের’ কারণে তাঁতপল্লিতে এখন তাঁতের মাকুর শব্দ নেই। অলস সময় কাটাচ্ছেন শাড়ি তৈরির শিল্পীরা। বাড়িতে বাড়িতে গড়ে ওঠা বিক্রয়কেন্দ্রগুলো বন্ধ। কারণ, ক্রেতারা আসতে পারছেন না। এই অবস্থায় ব্যবসায়ীরা লোকসানের দুশ্চিন্তায় দিশেহারা।

পাথরাইল ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে সারা বছরই শাড়ি তৈরি হয়। তবে ঈদ, পয়লা বৈশাখ ও শারদীয় দুর্গাপূজার সময়ই এখানে পাইকারি ও খুচরা বাজার বেশ জমে ওঠে। করোনার প্রথম ঢেউয়ের কারণে গত বছর পয়লা বৈশাখ ও ঈদের ব্যবসা মার খায়। এতে বড় লোকসানের মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠানগুলো। গত সেপ্টেম্বর থেকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় এবারের বৈশাখ ও ঈদ সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা প্রচুর শাড়ি উৎপাদন ও মজুত করেছেন। কিন্তু চলমান লকডাউনে ব্যবসা বন্ধ। এভাবে পরপর দুই বছর করোনার ধাক্কায় এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
লকডাউনে টাঙ্গাইলের তাঁত শাড়ির ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের লোকসানে পড়েছেন। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন।
গোলাম কিবরিয়া, সাধারণ সম্পাদক, টাঙ্গাইল চেম্বার অব কমার্স

সরেজমিন গত মঙ্গলবার পাথরাইলে গিয়ে কোথাও মাকুর শব্দ শোনা যায়নি। তাঁতপল্লির বাড়িগুলোয় গড়ে ওঠা বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ। অলস সময় কাটাচ্ছেন শাড়ি তৈরির শিল্পী ও ব্যবসায়ীরা। অথচ অতীতে এই সময়ে পাথরাইলে ঢুকলেই তাঁতের মাকুর শব্দ শোনা যেত। পবিত্র রমজান মাস শুরু হতেই দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের ভিড়ে মুখর থাকত পুরো এলাকা। লকডাউনের কারণে পরপর দুই বছর সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা গেল।

যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানির মালিক রঘুনাথ বসাক জানান, গত বছর ঈদ সামনে রেখে পাথরাইলে উৎপাদিত মোট শাড়ির ৮০ শতাংশ অবিক্রীত ছিল। লকডাউন উঠে যাওয়ার পর দুর্গাপূজা ও পরবর্তী সময়ে সেই ৮০ ভাগের ৫০ ভাগ শাড়িও বিক্রি করা যায়নি। তাই এবার ঈদ সামনে রেখে এলাকায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ধেক শাড়ি তৈরি হয়েছে। পয়লা বৈশাখ তথা নববর্ষ ও ঈদের বাজার শুরু হওয়ার আগেই আবার শুরু হলো লকডাউন।রঘুনাথ বসাক মালিক, যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি

ঈদের অন্তত ১৫ দিন আগেও বিধিনিষেধ তুলে দিলে কমবেশি শাড়ি বিক্রি হবে। তাহলে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা কষ্ট করে হলেও টিকে থাকতে পারবেন।
রঘুনাথ বসাক মালিক, যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি

রঘুনাথ বসাক বলেন, ঈদের অন্তত ১৫ দিন আগেও বিধিনিষেধ তুলে দিলে কমবেশি শাড়ি বিক্রি হবে। তাহলে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা কষ্ট করে হলেও টিকে থাকতে পারবেন।

টাঙ্গাইল জেলা শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে পাথরাইল ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল তাঁত শাড়ি উৎপাদন হয়। আড়াই শতাধিক পরিবার সরাসরি শাড়ি তৈরি ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া পরোক্ষভাবে যুক্ত আছে দুই হাজারের বেশি পরিবার।

পাথরাইল গ্রামের সীতানাথ-রঞ্জিত শাড়ি বিতানের পলাশ বসাক বললেন, ব্যাংক ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে বেশির ভাগ ব্যবসায়ী শাড়ি তৈরি করেছেন। গতবারও লকডাউনের কারণে বেচাবিক্রি হয়নি। সেই ধাক্কায় শাড়ি উৎপাদন এবং এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের কোমর ভেঙে গেছে। এবার অল্প কিছু বিক্রি করতে না পারলে সবাইকে পথে বসতে হবে।

একই গ্রামের পরেশ রাজবংশী জানান, তাঁর নিজের সাতটি তাঁত ছিল। গত বছরের লোকসানের পর চারটি তাঁত আর চালাতে পারছেন না। তিনটি তাঁত দিয়েই এবার শাড়ি উৎপাদন করেছেন। সেই শাড়িগুলো বিক্রি করতে না পারলে সব তাঁতই বন্ধ হয়ে যাবে।

জানতে চাইলে টাঙ্গাইল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া প্রথম আলোকে বলেন, লকডাউনে টাঙ্গাইলের তাঁত শাড়ির ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের লোকসানে পড়েছেন। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন
অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন