গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান ঘেঁটে অর্থনীতিতে শিল্প-সাহিত্য–বিনোদন খাতের অবদান বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবছরই এই খাতে মূল্য সংযোজন হচ্ছে। এর মানে টাকার অঙ্ক তথা আর্থিক মূল্যায়নে প্রতিবছরই আগের বছরের চেয়ে সৃজনশীল শিল্পকর্ম বাড়ছে, যা প্রকারান্তরে দেশের অর্থনীতির আকার বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত ২০২০-২১ অর্থবছরে স্থির মূল্যে শিল্প-সাহিত্য ও বিনোদনজগৎ থেকে মোট ৩ হাজার ৯০৭ কোটি টাকার মূল্য সংযোজন হয়েছে। অর্থাৎ এর সমপরিমাণ টাকা ওই বছর দেশের অর্থনীতিতে যোগ হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ২১৩ কোটি টাকা বেশি। আগের ২০১৯-২০ অর্থবছরে শিল্প-সাহিত্য ও বিনোদনজগৎটি অর্থনীতিতে ৩ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকার জোগান দিয়েছে। এ ছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩ হাজার ৩২২ কোটি টাকা ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩ হাজার ১৫৮ কোটি টাকার অবদান রাখে এই খাত।

বিবিএস সূত্রে জানা গেছে, জিডিপিতে শিল্প-সাহিত্য ও বিনোদনজগতের অবদান আরও পূর্ণাঙ্গভাবে নিরূপণ করতে ইতিমধ্যে এই সংস্থা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। নতুনভাবে গণনা তথা হিসাব করার জন্য এই খাতের কিছু পটভূমিপত্র তৈরি করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়ছে। শিক্ষিতের হারও বাড়ছে। এতে শিল্প-সাহিত্য ও বিনোদনজগতের সম্প্রসারণ হচ্ছে। কারণ, মধ্যবিত্তরাই হলেন শিল্প-সাহিত্যের বড় ভোক্তা।’ এ ছাড়া সমাজের কেউ চাইলেই একটি মিউজিক ভিডিও বানিয়ে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

কয়েক বছর আগেও গান, নাটক, টেলিফিল্ম, টক শো ও সিনেমার জগৎটি ছিল সীমিত। নাটক ছিল স্যাটেলাইট চ্যানেল ও ঈদের মতো উৎসবনির্ভর। এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। নতুন নতুন স্যাটেলাইট চ্যানেলের সংখ্যা বেড়েছে। আবার অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোও এখন সম্প্রচারমাধ্যম হিসেবে যুক্ত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, দেশে এখন বছরে গড়ে এক হাজারের মতো নাটক তৈরি হয়। এসব নাটক ঘিরে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়ে থাকে। আগে বছরে ৫০০-৬০০টি নাটক হতো। আইপি টিভিতেও নতুন নতুন নাটক হচ্ছে। ইউটিউবেও অসংখ্য নাটক ও গান সম্প্রচার করা হচ্ছে। নাটকের পাশাপাশি মিউজিক ভিডিও, টেলিফিল্ম, টক শোসহ নানা ধরনের অনুষ্ঠান তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে সিনেমাজগতেও পরিবর্তন ঘটেছে। অভিজাত সিনেপ্লেক্স, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, আইপিটিভি এসেছে। করোনার মধ্যেও সারা বছর অন্তত ২৫-৩০টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। মূলধারার সিনেমা হলে মুক্তির পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও মুক্তি পাচ্ছে সিনেমা। দেশে অনেকগুলো সিনেপ্লেক্স নির্মাণ হওয়ায় সিনেমার প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। সিনেজগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন আলাপকালে প্রথম আলোকে জানান, সারা দেশে ৩০০টির মতো সিনেপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। এ জন্য সরকার ইতিমধ্যে কর ছাড় যেমন দিয়েছে, তেমনি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রাপ্তিও সহজ করেছে।

কবিতা, গল্প, উপন্যাস, আত্মজীবনী ও ভ্রমণকাহিনি—এসবই হলো সাহিত্যের মূল নির্যাস। সারা দেশে সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশনী আছে আড়াই শর মতো। এসব প্রকাশনা সংস্থা থেকে বছরে বিভিন্ন ধরনের সাড়ে সাত থেকে আট হাজার বই প্রকাশিত হয়। বিশেষ করে একুশে বইমেলায় করোনার আগে প্রকাশিত হতো সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার। চলতি বছর সাড়ে তিন হাজার বই প্রকাশিত হয়েছে। এসব বই প্রকাশের জন্য কাগজ ও কালি কিনতে হয়। আবার প্রেস তথা ছাপাখানার খরচও আছে। সেই সঙ্গে লেখকের সম্মানীও অর্থনীতিতে যুক্ত হয়।

কীভাবে অর্থনীতিতে অবদান রাখে

গান, নাটক, সিনেমা বেশি নির্মাণ হওয়া মানে বেশি কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাওয়া। কারণ, নতুন জনবলেরও বেতন–ভাতা বা পারিশ্রমিক দিতে হয়। আবার অভিনেতা-অভিনেত্রী, কলাকুশলীরাও অধিক হারে কাজের সুযোগ পান। আবার লাইট-ক্যামেরা ইত্যাদি যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এ ক্ষেত্রেও খরচ বাড়ে।

একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ১০ লাখ টাকার বাজেটের একটি এক ঘণ্টার নাটক বানানো হলো। ৩৫ জন অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীর সম্মানী বাবদ পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হলো। চারটি গাড়ি ও দুটি ক্যামেরা ক্রেনের পাঁচ দিনের ভাড়া বাবদ গেল এক লাখ টাকা। পুবাইলের একটি শুটিং বাড়ির জন্য ভাড়া দিতে হলো আরও ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া সেট নির্মাণ, আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতিতে খরচ আরও ৭৫ হাজার টাকা। ডাবিং, সম্পাদনা করার জন্য স্টুডিও ভাড়া বাবদ পাঁচ শিফটে খরচ ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া শুটিং চলাকালে খাওয়াদাওয়াসহ আনুষঙ্গিক খরচ হলো এক লাখ টাকা। আর প্রযোজনা সংস্থার নিজস্ব খরচ আছে আরও ৫০ হাজার টাকা। এভাবে নানা ধরনের কাজে টাকা খরচ করা মানে অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন ঘটছে। তাই এককথায় বলা যায়, যত বেশি নাটক–সিনেমা নির্মাণ ও বই–পুস্তক প্রকাশিত হবে তত বেশি অর্থ খরচ হবে, যা অবধারিতভাবে জিডিপিতে মূল্য সংযোজন ঘটাবে।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন