default-image

‘নে বাবা, তোরা এখন নাকে তেল দিয়ে ঘুমা। নো টেনশন।’ আশিয়ান সিটির আলোচিত এই বিজ্ঞাপন দেশে অনেকেরই ঘুম হারাম করেছে। কষ্টের টাকায় প্লট বুকিং দিয়ে আদালতের বারান্দায় বারান্দায় ঘুরে হয়রান হচ্ছেন অনেকেই।

আলোচিত এই প্রকল্প ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানের প্লট বা ফ্ল্যাট কিনে প্রতারিত হয়েছেন ক্রেতারা। অনেক ক্ষেত্রেই ফ্ল্যাট বা প্লট বুঝে পেতে বছরের পর বছর সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাঁদের। তাই প্রতারণার ফাঁদে পা যেন না আটকায়, সে জন্য আগেই ভালোভাবে খোঁজখবর নিন। সবকিছু পরিষ্কার থাকলেই কেবল বিনিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যান। নতুবা শান্তিতে মাথা গোঁজার জন্য যে কাঁড়ি কাড়ি টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট বা প্লট কিনবেন, সেটাই একদিন অশান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

আবাসন প্রকল্পের জমির দলিলে কোনো ভেজাল আছে কি না এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে কি না, তা জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নকশা অনুযায়ী ভবন তৈরি না হলে রাজউক সেই ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলতে পারে।

ফ্ল্যাট-প্লট কিনতে আপনি কত টাকা বিনিয়োগ করবেন, প্রথমে তার একটি হিসাব কষে ফেলুন। তারপর পছন্দমতো ফ্ল্যাট-প্লট খুঁজুন। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নিয়েও ফ্ল্যাট কিনতে পারেন। এসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে ব্যাংকঋণ দিচ্ছে। এমনকি কোনো কারণে আপনি আয়কর নথিতে কোনো বছরের কিছু আয় দেখাতে ভুলে গেছেন, এখন সেই টাকায় ফ্ল্যাট কিনতে পারবেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করবে না।

বিজ্ঞাপন

টাকার সংস্থানের কথা হলো। এবার নিজের চাহিদা অনুযায়ী এলাকায় খোঁজখবর নিন কোন কোন প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প রয়েছে। তারপর সরেজমিনে ঘুরে দেখুন। দাম–দরের বিষয়ে আশপাশে কিছু প্রকল্পেরও খোঁজ নিন। ভবনের নকশা দেখুন। আবাসন প্রতিষ্ঠানটি রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সদস্য কি না, সেটিও যাচাই করুন।

ব্যাটে-বলে মিললে কাগজপত্র যাচাইয়ে নামুন। বিশেষ করে আবাসন প্রকল্পের জমির দলিলে কোনো ভেজাল আছে কি না এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে কি না, তা জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নকশা অনুযায়ী ভবন তৈরি না হলে রাজউক সেই ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলতে পারে। মনে রাখুন, রাজউকের মতো চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও নিজ নিজ প্লট প্রকল্পের অনুমোদন দিয়ে থাকে।

আবাসন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির আগে অবশ্যই চুক্তিপত্র ভালোভাবে পড়ে দেখা প্রয়োজন। নিজে না বুঝলে আইনজীবীর পরামর্শও নেওয়া যেতে পারে।
কনকর্ডের হেড অব ব্র্যান্ড মো. তারিকুল আলম

কোনোভাবেই আবাসন প্রতিষ্ঠানের চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে ফ্ল্যাট কেনায় ঝাঁপ দেবেন না। আবারও বলছি, সতর্ক থাকুন, প্লট প্রকল্পটি রাজউকের ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে পড়েছে কি না, জেনে নিন। আবার যে এলাকায় প্রকল্পটি, সেখানে আদৌ তাদের জমি আছে কি না, সেটাও জানুন।

জানতে চাইলে দেশের শীর্ষস্থানীয় আবাসন প্রতিষ্ঠান কনকর্ডের হেড অব ব্র্যান্ড মো. তারিকুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, আবাসন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির আগে অবশ্যই চুক্তিপত্র ভালোভাবে পড়ে দেখা প্রয়োজন। নিজে না বুঝলে আইনজীবীর পরামর্শও নেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া ভবন নির্মাণের কোয়ালিটি বা মান বোঝার জন্য কী ধরনের রড, সিমেন্ট ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হবে, সেটিও খোঁজ নেওয়া দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে অনুমোদিত প্রকল্প ছাড়া প্লট কেনাবেচা করা যাবে না। তবে রাজধানীর আশপাশে যত প্রকল্প আছে, তার মধ্যে অল্পসংখ্যকেরই অনুমোদন রয়েছে।
রিহ্যাবের সহসভাপতি সোহেল রানা

ফ্ল্যাট-প্লট কিনতে ক্রেতার অবশ্যই কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকতে হবে। টিআইএন ছাড়া ফ্ল্যাট-জমি নিবন্ধন করা যাবে না। আর সেই টিআইএনের বিপরীতে নিয়মিত বার্ষিক কর বিবরণী জমা দিতে হবে।

ঢাকার আশপাশে অনেকগুলো প্লট প্রকল্প গড়ে উঠছে। ক্রেতাদের ভেড়াতে অনেকেই আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। প্লট প্রকল্পগুলোর মধ্যে অনেকগুলোর অবস্থানই রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের আশপাশে। এই সরকারি প্রকল্পে ২৫ হাজারের বেশি আবাসিক প্লট থাকলেও নাগরিক সেবা না থাকায় এখনো বাসযোগ্য হয়নি। অথচ প্রকল্পটির বয়স ২৪ বছর। সরকারি প্রকল্পের এই অবস্থা হলে বেসরকারিগুলোর অবস্থান কোথায়, সেটি সত্যি ভাবার বিষয়। তাই প্লট কেনার আগে অনেক হিসাব–নিকাশ করতেই হবে। নতুবা নিজের একটি বাড়ির স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে যাবে।

অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ভাড়া জমিতে সাইনবোর্ড লাগিয়ে আশপাশের অনেক জমি নিজেদের বলে দাবি করে। তাই প্রকল্পের অনুমোদন আছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে আদৌ জমি আছে কি না সেটি যাচাই করতে হবে। অনেক কোম্পানির প্রতিনিধিরা বলেন, তাঁরা উপজেলা চেয়ারম্যানের অনুমতি নিয়ে ব্যবসা করছেন। কিন্তু উপজেলা চেয়ারম্যান কখনোই নিয়ন্ত্রক সংস্থা নয়। তারপর দেখতে হবে, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানটি রিহ্যাব অথবা বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলডিএ) সদস্য কি না। আইন অনুযায়ী, সংগঠন দুটির সদস্য না হলে ব্যবসা অবৈধ।

জানতে চাইলে রিহ্যাবের সহসভাপতি সোহেল রানা প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে অনুমোদিত প্রকল্প ছাড়া প্লট কেনাবেচা করা যাবে না। তবে রাজধানীর আশপাশে যত প্রকল্প আছে, তার মধ্যে অল্পসংখ্যকেরই অনুমোদন রয়েছে। ফ্ল্যাট ও প্লট প্রকল্প কেনার আগে কোম্পানি সম্পর্কে জানতে চাইলে ক্রেতারা রিহ্যাবের কার্যালয়ে খোঁজ নিতে পারেন বলেও জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন
অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন