বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কিছুক্ষণের মধ্যে আগুন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে। নিতাইগঞ্জের মূল সড়কে ঢুকলাম। দেশের ভোগ্যপণ্যের বড় পাইকারি বাজার ঢাকার মৌলভীবাজার ও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের মতোই একসময় জমজমাট ছিল এই নিতাইগঞ্জ। এখান থেকেই নদীপথে মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, নোয়াখালী, কিশোরগঞ্জ ও সিলেটের ব্যবসায়ীরা ভোগ্যপণ্য নিয়ে যেতেন। দিন বদলেছে। বর্তমানে বড় কোম্পানিগুলো নিজেরাই সারা দেশের ছোট ব্যবসায়ীদের কাছে ভোগ্যপণ্য পৌঁছে দিচ্ছে। যানজটের কারণে অনেকে সরাসরি নিতাইগঞ্জে আসতে চান না। ফলে জৌলুশ হারিয়েছে নিতাইগঞ্জ। তারপরও দিনে নিতাইগঞ্জে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকার বেচাবিক্রি হয়।

, দের একজন শেখ ওয়াজেদ আলী। ১৯৭২ সাল থেকে ব্যবসা করছেন। তাঁর ময়দার মিল আছে। নির্বাচন নিয়ে জানতে চাইলে বললেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ উৎসব করে ভোট দেন। নানা কারণে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে ভোটের সংস্কৃতি কিছুটা ম্লান হলেও নারায়ণগঞ্জ ব্যতিক্রম। সিটি নির্বাচনের শুরুটা বেশ ভালো ছিল। মাঝে রাজনৈতিক নেতা ও প্রার্থীদের উল্টাপাল্টা কথায় মানুষ কিছুটা দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে। তারপরও প্রত্যাশা, ভোট দিতে কোনো সমস্যা হবে না।’ বিএনপি সরাসরি ভোটে অংশ নিলে নির্বাচন আরও উৎসবমুখর হতো বলে মন্তব্য করলেন তিনি।

নিতাইগঞ্জের মূল সড়ক পণ্যবাহী ট্রাকে বোঝাই। কোনোরকমে হাঁটা যাচ্ছে। শ্রমিকেরা আটা-ময়দার বস্তা ট্রাক থেকে নামাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার ক্রেতার ভ্যানে পণ্য তুলে দিচ্ছেন। নির্বাচন নিয়ে কোনো মাতামাতি নেই। সবকিছুই স্বাভাবিক। নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে চাইলে দু-তিনজন ব্যবসায়ী খুব একটা আগ্রহ দেখালেন না।

নিতাইগঞ্জের চার দশকের পুরোনো প্রতিষ্ঠান ইয়াকুব আলী ফ্লাওয়ার মিল। বাবা দাদার হাতে গড়া এই প্রতিষ্ঠান বর্তমানে তৃতীয় প্রজন্মের হাতে। স্বত্বাধিকারী নূর তাসলিম বললেন, আগে বৃষ্টি হলেই নিতাইগঞ্জের মূল সড়কে হাঁটুপানি হতো। তখন ব্যবসায়ীদের কষ্টের সীমা থাকত না। বর্তমান মেয়র সেই সমস্যার সমাধান করেছেন। তবে ট্রাকের যানজট দূর করতে পারেননি। তবে চেষ্টা করেছেন।

বাংলাদেশের মানুষ উৎসব করে ভোট দেন। নানা কারণে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে ভোটের সংস্কৃতি কিছুটা ম্লান হলেও নারায়ণগঞ্জ ব্যতিক্রম। সিটি নির্বাচনের শুরুটা বেশ ভালো ছিল। মাঝে রাজনৈতিক নেতা ও প্রার্থীদের উল্টাপাল্টা কথায় মানুষ কিছুটা দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে। তারপরও প্রত্যাশা, ভোট দিতে কোনো সমস্যা হবে না
শেখ ওয়াজেদ আলী, নিতাইগঞ্জের পুরোনো ব্যবসায়ী

নিতাইগঞ্জ থেকে হোসিয়ারি পোশাকের পাইকারি বাজার নয়ামাটিতে ঢুকতেই মেয়র প্রার্থী নৌকার সমর্থকদের শোভাযাত্রায় আটকে যেতে হলো। কিছুক্ষণ পর ভেতরে যেতেই চোখে পড়ল নির্বাচনী সমাবেশ। সেলিনা হায়াৎ আইভী বক্তব্য দিচ্ছেন। আশপাশের ব্যবসায়ীদের মনোযোগ সেই দিকে। তখনো দোকানগুলোতে ক্রেতার আনাগোনা কম।

গদিতে বসে ছিলেন মা বাবার দোয়া ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী দীন মোহাম্মদ। জানতে চাইলে বললেন, ‘রাস্তাঘাটেরও উন্নতি হয়েছে। তবে ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের ফি কয়েক গুণ বাড়ানোতে আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীরা বিপদে আছেন।’ নির্বাচন নিয়ে বললেন, সেলিনা হায়াৎ আইভী জনগণের মন জয় করেছেন। আবার তৈমুর আলম খন্দকারেরও গ্রহণযোগ্যতা আছে।

গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে নয়ামাটিতে হোসিয়ারি পণ্য উৎপাদন শুরু হয়। শুরুতে শুধু স্যান্ডো গেঞ্জি ও নারী-পুরুষের অন্তর্বাস তৈরি হলেও নব্বইয়ের দশকে যুক্ত হয় ট্রাউজার, টি-শার্ট, পলো শার্ট, সোয়েটার, মাফলার, টুপি, মোজা ও বাচ্চাদের পোশাক। উৎপাদন ও বিক্রি এক জায়গাতেই। সব মিলিয়ে কয়েক হাজার অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও ছোট কারখানা রয়েছে। একেকটি কারখানায় ৫ থেকে ১৫০ জন শ্রমিক কাজ করেন। সারা দেশের ব্যবসায়ীরা পাইকারি দরে এসব পণ্য কিনতে আসেন। বছরে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যবসা হয় বলে জানালেন নয়ামাটির ব্যবসায়ীরা।

সম্রাট ফেব্রিকসের কর্মকর্তা মো. তানভীর বললেন, ব্যবসা-বাণিজ্য বর্তমানে কিছুটা মন্দ হলেও চাঁদাবাজি বা অন্য কোনো সমস্যা নেই। ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পারছেন। নির্বাচনে যে-ই জিতুক না কেন, ভোটাররা নিজেদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবেন, এটাই বড় কথা।

নয়ামাটি থেকে ফেরার সময় বঙ্গবন্ধু সড়কে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকারের নির্বাচনী শোডাউন। বিশাল শোভাযাত্রায় একটি হুডখোলা গাড়িতে চড়ে আশপাশের মানুষদের দিকে হাত নাড়ছিলেন। ততক্ষণের সড়কের দুই পাশে যানজট লেগে গেছে। আটকা পড়েছে আমাকে বহন করা রিকশাটিও।

ততক্ষণে তিন ঘণ্টায় নারায়ণগঞ্জের ছোট, বড় ও মাঝারি বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে কথা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁদের অধিকাংশের বক্তব্য, একসময় শহরের মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরা, প্রত্যেকেই প্রভাবশালী একটি পরিবারের সদস্যদের কাছে জিম্মি ছিলেন। নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। বর্তমানে সেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তাই বর্তমানে ক্ষমতার ভারসাম্যের স্থিতাবস্থা চান তাঁরা। একই সঙ্গে পেশিশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর পাশাপাশি নাগরিক সমস্যা দূর করে নগরবাসীকে স্বস্তি দেবেন, এমন মেয়র চান বলে জানালেন ব্যবসায়ীরা।

নারায়ণগঞ্জ রপ্তানিমুখী নিট পোশাকের বড় কেন্দ্রস্থল। বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ হাজার ৬৯৬ কোটি ডলারের নিট পোশাক রপ্তানি হয়েছে। তার মধ্যে ৫০ শতাংশ করেছে নারায়ণগঞ্জের ছোট-বড় ৮০০ নিট পোশাক কারখানা।

জানতে চাইলে প্লামি ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হক বলেন, ‘আমাদের শহরের সিটি নির্বাচনের পরিবেশ বেশ স্বস্তিদায়ক। তার বড় কারণ হচ্ছে প্রধান দুই মেয়র প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব। তাঁরা কেউই মারামারি বা সংঘাতের সঙ্গে নেই। সে জন্যই নির্বাচনে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় আছে। বর্তমান বাস্তবতা বা দেশের অন্য এলাকার তুলনায় যা অকল্পনীয়।’

নারায়ণগঞ্জ বিসিক সিটি করপোরেশনের বাইরে। তবে সেখানে গিয়ে নির্বাচন নিয়ে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের সঙ্গে কথা হলো। বললেন, ‘নারায়ণগঞ্জে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন করার মতো একটি শক্তি তৈরি হয়েছে। সে কারণেই মানুষ ভয়ডরহীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।’ ভোটের আগের দিন পর্যন্ত সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় থাকবে বলে তাঁর প্রত্যাশা।

সেই রেশ না কাটতেই প্রাচীন বাংলার এই রাজধানী থেকে বর্তমান রাজধানীর দিকে রওনা দিলাম। ততক্ষণে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন