default-image

সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ধীরে ধীরে অনলাইনে বাড়াচ্ছে তাদের কার্যক্রম। গত সোমবার এক ওয়েবিনারের মাধ্যমে তারা শুরু করে এ বছরের অনলাইন বিক্রয় কার্যক্রম। যেখানে যুক্ত করা হয়েছে মসুর ডাল, ছোলা, তেল ও চিনি। যদিও ট্রাকে বিক্রি করা পণ্যের দামের তুলনায় অনলাইনে দাম ৩ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত বেশি রাখা হয়েছে। তবে বর্তমানে বাজারের যে দাম তার তুলনায় অনলাইনে বিক্রি করা টিসিবির পণ্যের দাম প্রতি এককে ১২ থেকে ৩৩ টাকা কম। পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হবে সরবরাহ বা ডেলিভারি খরচ। তবে বাজারমূল্যের চেয়ে দাম কম হওয়ায় অনলাইনে বিক্রি হওয়া টিসিবির পণ্য দরিদ্র মানুষের বদলে সামর্থ্যবানদের হাতে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।  

টিসিবির নতুন অনলাইনে নিত্যপণ্য বিক্রি কর্মসূচিতে ঢাকা ছাড়াও সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে সর্বমোট আটটি ই-কমার্স ওয়েবসাইটের মাধ্যমে চার ধরনের পণ্য বিক্রি করা হবে।

ওয়েবসাইটগুলো হচ্ছে, চালডাল ডটকম, স্বপ্ন অনলাইন, সবজিবাজার, কেজিক্লিক, যাচাই ডটকম, ওয়ানস্টপ, পলি কানেকশোন ও ই-ট্রাই টেক। এর মধ্যে ঢাকার বাইরের দুই জেলার জন্য মোট চার টন করে পণ্য এবং বাকিটুকু ঢাকার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। টিসিবি জানায়, অন্যান্য শহর থেকেও অনলাইন বিক্রিত চাহিদা চাওয়া হয়েছিল, চাহিদা না পাওয়ায় এই তিন শহরেই অনলাইনে বিক্রি হবে টিসিবির পণ্য।

বিজ্ঞাপন
default-image

বাজারে যখন নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়, পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার ভর্তুকি দিয়ে বাজারের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করে। দাম কম রাখার জন্য ক্রয়মূল্যের উপরে অর্থ ভর্তুকি দেয় সরকার। ক্রয়মূল্য ছাড়াও সংরক্ষণ ও পরিবহন খরচে ভর্তুকি দেওয়া হয়। টিসিবি সূত্র জানা, গত অর্থ বছরে এই ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৮১ কোটি টাকা। এ বছর টিসিবি ১৩০ টাকা লিটারে দেশি বাজার থেকে সয়াবিন তেল কিনেছে, যা ডিলারদের কাছে ৯৪ টাকা লিটারে বিক্রি করা হয়। ডিলাররা ট্রাকসেলে ১০০ টাকা লিটার এবং অনলাইন সেলে ১০৮ টাকায় বিক্রি করা হয়। এক্ষেত্রে প্রতি লিটারে ভর্তুকির পরিমাণ ৩৬ টাকা। পাঁচলিটারে ১৮০ টাকা। বাজারে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ১৪৫ টাকা। চিনির ক্ষেত্রে ভর্তুকির পরিমাণ ১৩ থেকে ১৪ টাকা।

টিসিবির মুখপাত্র মো. হুমায়ুন কবির প্রথম আলোকে বলেন, 'বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য টিসিবি দেশ ও বিদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে তা কম দামে বিক্রি করে থাকে। এখন পর্যন্ত তেল দেশ থেকে সংগ্রহ করা হতো কিন্তু তেলের বাজারমূল্য বাড়তে থাকায় সামনে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল সংগ্রহের পরিকল্পনা আছে সংস্থাটির।'

কম দামে পাওয়া যায় বলে টিসিবির ট্রাকের সামনে সাধারণত নিম্ন আয়ের মানুষেরা ভিড় করেন। এ বছরের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। গত এক বছর ধরে করোনায় ভুগছে অর্থনীতি, কমেছে সাধারণ মানুষের আয়। রোজা শুরুর আগে ১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ট্রাক সেল কর্মসূচির প্রথম দিন থেকেই ট্রাকের সামনে মেলে মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের ভিড়, যাঁরা আগে কখনো ট্রাকের সামনে দাঁড়িয়ে কিনতেন না টিসিবির পণ্য। নতুন আসা ক্রেতাদের চাপে এ সময়ে বাড়তে থাকে ট্রাক সেলে পণ্যের চাহিদা। শেষ পর্যন্ত যেহেতু পণ্য কিনেই নিতে হয়, কিছুটা হলেও সুবিধা ভোগ করেন তুলনামূলক উচ্চ আয়ের ক্রেতারা।

টিসিবি এ বছর পবিত্র রমজানে সারা দেশে ৫০০ ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে পণ্য বিক্রি করছে। কার্যক্রমের শুরুতে টিসিবি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছিল, রমজানে প্রতি ট্রাকে ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ কেজি চিনি, ৬০০ থেকে ৭৫০ কেজি মসুর ডাল, ১ হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার লিটার সয়াবিন তেল, ৩০০ থেকে ১ হাজার কেজি পেঁয়াজ, ৪০০ থেকে ১ হাজার কেজি ছোলা ও ১০০ কেজি খেজুর বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

ভর্তুকির পণ্য সামর্থ্যবানদের হাতে যাওয়ার আশঙ্কা

টিসিবির অনলাইন বিক্রি কার্যক্রমে পণ্য কার কাছে যাবে-এ বিষয় নজরদারি করার উপায় নেই কারও। কেবল নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছে, সপ্তাহে প্রতি ক্রেতা ৫ লিটার তেল ও ৩ কেজি করে অন্য তিন ধরনের পণ্য কিনতে পারবেন। এখানে একজন ক্রেতা অর্থ একটি প্ল্যাটফর্মে একটি অ্যাকাউন্ট। এক্ষেত্রে এক ব্যক্তি যদি অনলাইনের আটটি আলাদা প্ল্যাটফর্মে আলাদা আটটি অ্যাকাউন্ট খোলে, অথবা একই পরিবারের একাধিক সদস্য কেনে, সেক্ষেত্রে তা নজরদারির কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। জানতে চাইলে, ই-ক্যাবের মহাসচিব আবদুল ওয়াহাব বলেন, ‘আমারা বিশ্বাস করি, কেউ এমন করবে না। যদি করেও তার পরিমাণ ১ শতাংশের বেশি নয়।’
কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘টিসিবির পণ্য খোলা বাজারে যেন বিক্রি করে কেউ লাভবান না হতে পারে সে বিষয়ে নজরদারি করা হয়। অনলাইনে এটা খুব সহজেই করা যাবে। তাছাড়া মূল্য ভর্তুকির পণ্যে দরিদ্র মানুষের অধিকার বেশি থাকা উচিত।'

অনলাইনে ক্রেতার খোঁজ, অফলাইনে পণ্যের

টিসিবি এ বছর পবিত্র রমজানে সারা দেশে ৫০০ ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে পণ্য বিক্রি করছে। কার্যক্রমের শুরুতে টিসিবি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছিল, রমজানে প্রতি ট্রাকে ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ কেজি চিনি, ৬০০ থেকে ৭৫০ কেজি মসুর ডাল, ১ হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার লিটার সয়াবিন তেল, ৩০০ থেকে ১ হাজার কেজি পেঁয়াজ, ৪০০ থেকে ১ হাজার কেজি ছোলা ও ১০০ কেজি খেজুর বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এর বিপরীতে অনলাইন সেলে প্রতিটি পণ্য বরাদ্দ করা হয়েছে দেড় লাখ একক করে। এই অনলাইন বিক্রির সমন্বয়ক সংস্থা ই-ক্যাব বলছে, এটি প্রাথমিক বরাদ্দ। চাহিদার ভিত্তিতে অনলাইনে আরও বরাদ্দ দেবে টিসিবি।

বিজ্ঞাপন

একদিকে যখন টিসিবি অনলাইনে ক্রেতাদের কাছে বেশি পৌঁছাতে চাইছে, ট্রাকের সামনে কম দামে পণ্য কিনতে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষরা। গতকাল সোমবার ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুলের কাছে টিসিবির ট্রাকের সামনে লম্বা লাইন ধরে পণ্য কিনছিলেন ভ্যানচালক মজনু মিয়া। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন প্রশ্ন করতে বললেন, দুই জায়গায় ঘুরে ট্রাক না পেয়ে এখানে এসেছেন পণ্য কিনতে; তাও প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে। এমনিতে করোনার কারণে এ সময়ে কাজ পাওয়া কঠিন, তার ওপরে কম মূল্যে পণ্য কিনতে অনেকটা সময় ব্যয় করতে হচ্ছে তাঁকে।

মহাখালীতে টিসিবির একজন ডিলার জানান, শুরুতে পণ্যের সরবরাহ অনেক থাকলেও এখন বরাদ্দ কমিয়ে এনেছে টিসিবি। মিরপুরে আরেকজন ডিলার বলেন, কতটা পণ্য পাওয়া যাবে-এর সিদ্ধান্ত একমাত্র টিসিবির, এখানে তাঁদের চাহিদার কোনো মূল্যায়ন হয় না। যতটুকু পাওয়া যায়, ততটুকুই বিক্রি করেন তাঁরা।

অনলাইনে টিসিবির ক্রেতা কারা

টিসিবির অনলাইন কার্যক্রম শুরুর প্রেক্ষাপট হচ্ছে গত বছরের করোনায় চলাচলে বিধিনিষেধ এবং পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। সেবার ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সহযোগিতায় অনলাইন সেল শুরু করে টিসিবি। এর ফলে আট মাসে অনলাইনে সাত লাখ কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়। এ বছরও করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় মধ্যবিত্তদের জন্যই অনলাইনে পণ্য বিক্রি করবে বলে জানিয়েছে টিসিবি।

বাংলাদেশে ইন্টারনেট তুলনামূলক কম দাম হলেও দেশের দারিদ্র্যের হার বিবেচনায় ইন্টারনেট সহজলভ্য নয়। আবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দেশের মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মাত্র ৬ শতাংশ ই-কমার্সের ক্রেতা। দেশের মোট জনগণের মাত্র ১.৩% মানুষ ই- কমার্সে কেনাকাটা করা।

বর্তমানে বাংলাদেশের ই-কমার্স বর্ধনশীল হলেও তার জনপ্রিয়তা খুব বেশি নয়। এমনিতেও বাংলাদেশে ইন্টারনেট খুব সহজলভ্য নয়। দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ইনক্লুসিভ ইন্টারনেট ইনডেক্স-২০২১ অনুযায়ী, ১ জিবি ইন্টারনেট কিনতে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ের শতকরা ২ ভাগ খরচ করতে হয়। এই ইনডেক্স অনুসারে ইন্টারনেট ক্রয়ের সামর্থ্য অনুযায়ী ১২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৫, যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অবস্থান ২০তম।

অর্থাৎ বাংলাদেশে ইন্টারনেট তুলনামূলক কম দাম হলেও দেশের দারিদ্র্যের হার বিবেচনায় ইন্টারনেট সহজলভ্য নয়। আবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দেশের মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মাত্র ৬ শতাংশ ই-কমার্সের ক্রেতা। দেশের মোট জনগণের মাত্র ১.৩% মানুষ ই- কমার্সে কেনাকাটা করা। এই সীমিত ও সংরক্ষিত ইন্টারনেট ক্রেতার সংখ্যা জন্য টিসিবি দেড় লাখ একক সয়াবিন তেল, চিনি, মশুরডাল ও ছোলা বরাদ্দ করলো, যা চাহিদার প্রেক্ষিতে আরও বাড়বে।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন