default-image

‘মেট্রোরেল আসছে’, এমন ব্যানারে কয়েক বছর আগে হঠাৎ করে রাজধানীর রাজপথগুলো ছেয়ে গিয়েছিল। তখন থেকে রাজধানীবাসী মেট্রোরেলের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু করোনায় বহু প্রকল্পের কাজ থমকে গেলেও মেট্রোরেলের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। করোনার প্রথম ধাক্কায় যেমন মেট্রোরেলের কাজ চলেছে, তেমনি দ্বিতীয় ধাক্কায়ও থেমে নেই কাজ। আবার মেট্রোরেলের বগিও ঢাকায় চলে এসেছে। দিনের পাশাপাশি রাতের পালায়ও কাজ চলছে। দ্বিতীয় ধাক্কায় করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে চলমান লকডাউনে বিদেশি প্রকৌশলী ও পরামর্শকেরা দিনে নয়; রাতে কাজ করছেন।

২০১২ সালে প্রকল্পের কাজ শুরুর কথা থাকলেও সেটি শুরু হয় ২০১৬ সালে। বিশ্বমানের মেট্রোরেলের নির্মাণের জন্য জাপান, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের প্রকৌশলী ও পরামর্শকেরা যোগ দেন। বর্তমানে মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রায় সাত হাজার শ্রমিক-প্রকৌশলী-পরামর্শক কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে বিদেশি আছেন প্রায় এক হাজার। ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

দ্বিতীয় দফায় করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে চলতি মাসের প্রথম দিকে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হয় ‘লকডাউন’।

মেট্রোরেল প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, কঠোর লকডাউন শুরু হওয়ার পরও দিনের বেলায় রাজধানীর সড়কে মানুষের চলাচল থাকে। এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলও করছে। এসব কারণে বিদেশি প্রকৌশলী ও পরামর্শকেরা দিনের বেলায় প্রকল্প এলাকায় খুব একটা যান না। তবে রাতের বেলায় কাজের তদারক করতে যান তাঁরা।

বিজ্ঞাপন

মেট্রোরেল স্টেশনের কনকর্স, রেলপথের ভায়াডাক্ট (পথ), পিলারসহ বিভিন্ন নির্মাণকাজ দেখতে বের হন তাঁরা। বিশেষ করে ঢালাই দেওয়ার আগে বিদেশি প্রকৌশলী ও পরামর্শকদের অনুমোদন নিতে হয়। রাতে যখন সড়কে যানবাহন ও মানুষ চলাচল একদম কমে যায়, তখন বিদেশিরা নির্মাণস্থলে যান। দিনের বেলায় শ্রমিকেরা রড বাঁধাসহ ঢালাইয়ের আগের যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে রাখেন। রাতে প্রকৌশলীরা গিয়ে কাজ ঠিক আছে কি না, তা দেখেন। কয়েক দিন আগে একটি ভায়াডাক্ট ঢালাইয়ের আগে কাজ মনঃপূত না হওয়ায় ঢালাইয়ের অনুমোদন দেয়নি। এখন সেটি ঠিক করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ এন ছিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, গতবার করোনার প্রথম ধাক্কার সময়ে বহু জাপানি প্রকৌশলী নিজ দেশে চলে গিয়েছিলেন। অনেকে ফিরে আসতে পারেননি। তখন প্রকল্প এলাকায় ক্যামেরা বসিয়ে জাপান থেকে তদারক করতেন তাঁরা। এবার বিদেশি প্রকৌশলীরা সবাই দেশে আছেন। করোনা সংক্রমণ এড়াতে রাতের বেলায় তাঁরা কাজের তদারক করেন।

ছোট ছোট গ্রুপে কাজ করেন শ্রমিকেরা

করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ। এখন ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে কাজ করছেন শ্রমিকেরা। আগে যেখানে প্রতি দলে ২০-২৫ জন একসঙ্গে কাজ করতেন, এখন ১০-১২ জনের দলে বিভক্ত হয়ে কাজ করেন তাঁরা। এর কারণ হিসেবে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেছেন, ছোট ছোট দলের কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে পুরো দলের সব সদস্যকে করোনা পরীক্ষা করা হয় এবং আইসোলেশনে পাঠানো হয়।

গতকাল দুপুরে রাজধানীর পল্লবী, মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার সরেজমিনে দেখা গেছে, মেট্রোরেলের কাজ পুরোদমে চলছে। করোনার সংক্রমণের প্রস্তুতি হিসেবে মেট্রোরেল প্রকল্পে রাজধানীর গাবতলী ও উত্তরার পঞ্চবটী এলাকায় দুটি ফিল্ড হাসপাতাল করা হয়েছে। এ ছাড়া আইসোলেশন সেন্টারও আছে। গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত ৪২২ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। কোনো মৃত্যু নেই।

বিজ্ঞাপন

মেট্রোরেলের বগি এখন উত্তরায়

জাপান থেকে মেট্রোরেলের বগি রাজধানীর উত্তরায় পৌঁছেছে। গতকাল বুধবার বিকেলে একসেট মেট্রোরেলের বগি নিয়ে দুটি বার্জ উত্তরার মেট্রোরেল ডিপোর কাছে তুরাগ নদের জেটিতে ভিড়েছে। এটি মেট্রোরেলের বগির প্রথম চালান। দুই মাস আগে জাপানের কোবে বন্দর থেকে ছয়টি বগি যাত্রা শুরু করে। ৩১ মার্চ বগিগুলো মোংলা বন্দরে আসে।

জানা গেছে, উত্তরার ডিপোর কাছে তুরাগ নদের তীরে একটি স্থায়ী জেটি নির্মাণ করেছে ডিএমটিসিএল। পরে আসা বগিগুলোও যাতে এখানে নামানো যায়, সে জন্য এ স্থায়ী জেটিটি নির্মাণ করা হয়েছে। জেটি থেকে ডিপোর দূরত্ব এক কিলোমিটারের কম।

অগ্রগতি ৬১ শতাংশ

উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। গত মার্চ মাস পর্যন্ত মেট্রোরেলের কাজের অগ্রগতি ৬১ দশমিক ৪১ শতাংশ। খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি কাজ এগিয়েছে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত। এ অংশে প্রায় ৮৪ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মূল পথ নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এখন রেল ট্র্যাক বসানোর কাজ চলছে। চলছে স্টেশন নির্মাণের কাজ। উত্তরা অংশে তিনটি রেলস্টেশনের নির্মাণকাজও প্রায় শেষের দিকে। আর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত পিলার নির্মাণ শেষ। এখন ভায়াডাক্ট (পথ) নির্মাণের কাজ চলছে।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন