default-image

করোনাভাইরাসের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ছুটির পরিবর্তে এবার এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন ঘোষণা করেছে সরকার। এর ফলে জরুরি সেবা ছাড়া সবই বন্ধ থাকবে। এতে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে। লকডাউন দীর্ঘ হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত, দোকানি, হকার, রিকশাচালক ও স্বল্প আয়ের মানুষেরা বড় সমস্যায় পড়বেন বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, করোনা ঠেকাতে আরও আগে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। তাহলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না। এখনই স্বাস্থ্যবিধি মানাতে সরকারকে কঠোর হতে হবে। পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ লকডাউনের পরিবর্তে স্মার্ট লকডাউনের দিকে যেতে হবে। এতে অর্থনীতি ধরে রাখা যাবে, মানুষের মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কমবে। আর দোকান মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, এবার দোকান বন্ধ রাখতে হলে পথে বসা ছাড়া কোনো পথ থাকবে না।

গত বছরের শুরুতে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ বাড়তে শুরু করলে সরকার ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে, যা কয়েক দফায় বাড়ানোর পর ৩০ মে শেষ হয়। এই সময়ে জরুরি সেবা ছাড়া সরকারি সব দপ্তর বন্ধ ছিল। খাদ৵ ও ওষুধ ছাড়া বন্ধ ছিল সব দোকানপাট। পোশাক কারখানার পাশাপাশি ব্যাংকের সেবা সীমিত আকারে চালু ছিল। এর ফলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নগদ টাকা, কম সুদের ঋণসহ ২১টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। যার আকার দাঁড়ায় ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা, যা এখনো বাস্তবায়ন চলছে।

বিজ্ঞাপন

এর মধ্যে করোনার সংক্রমণ আবার বেড়ে গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার থেকে সাত দিনের লকডাউনের কথা জানিয়েছে সরকার। এমন সময়ে লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, করোনা মোকাবিলায় লকডাউন এখন ভোঁতা যন্ত্র। এখন সময় স্মার্ট লকডাউনের। অফিস চলবে, তবে কম লোকবল দিয়ে। দোকানপাট খোলা থাকবে ২৪ ঘণ্টা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেনাকাটা চলবে। মাস্ক ছাড়া কেউ বের হতে পারবে না। তাহলে সবকিছু ঠিক থাকবে। এ জন্য সরকারকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা গ্রহণ করা উচিত।

আহসান এইচ মনসুর আরও বলেন, ‘দাতারা যে টাকা দিয়েছে, তা দিয়ে সহজেই হাসপাতালগুলোতে সক্ষমতা বাড়ানো যেত। তাহলে শ্বাসকষ্টে কাউকে মারা যেতে হতো না। এদিকে দ্রুত নজর দিতে হবে। কারণ, সামনে আরও বেশি রোগীকে হাসপাতালে নিতে হতে পারে। এটা ঠেকানো না গেলে পরিস্থিতি উত্তরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।’

গত বছরে যেসব প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়, তাতে দোকানমালিকদের অংশগ্রহণ ছিল খুবই কম। যদিও বেশি ক্ষতিতে পড়েছেন তাঁরাই। এবারের লকডাউন নিয়ে তাঁরা বেশ শঙ্কিত। এ নিয়ে চাঁদনী চক ব্যবসায়ী ফোরামের সভাপতি মো. নিজাম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বছরে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে কয়েক বছর লাগবে। কেউ সম্পদ বিক্রি ও কেউ ঋণ নিয়ে টিকে আছে। আমরা ভেবেছিলাম, এবারের বৈশাখ ও ঈদে কিছু বিক্রি করে লোকসান সামাল দেব। এখন মনে হচ্ছে সেই সুযোগও শেষ হয়ে আসছে। পোশাক কারখানা ও খাবারের দোকান খোলা থাকলে আমাদের দোকানও খোলা থাকতে পারে। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে কড়াকড়ি করতে হবে।’

তবে ফ্যাশন হাউসগুলোর মালিকদের সংগঠন ফ্যাশন এন্ট্রাপ্রেনিউরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এফইএবি) সভাপতি শাহীন আহম্মেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এক সপ্তাহ লকডাউন থাকলে আমাদের তেমন সমস্যা নেই। আমাদের মূল্য লক্ষ্য বৈশাখ ও ঈদ। গতবার ঈদে কোনো ব্যবসা হয়নি, তাই এবার আমরা বড় বিক্রির আশা নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছি। যদি লকডাউন দীর্ঘ হয়, তাহলে আমাদের জন্য বড় বিপদ হয়ে যাবে।’

গত বছরে যে প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হয়, তার প্রথমটা ছিল পোশাকশ্রমিকদের বেতন-ভাতা। পুরো সময় কারখানা খোলাও ছিল। এ ছাড়া কম সুদের ঋণেও পোশাকমালিকেরা ভালো সুবিধা পেয়েছেন। রপ্তানি খাতের জন্য দেওয়া হয় নানা সুবিধা।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘শ্রমিকদের কারখানায় আসা-যাওয়ার সময় ভাগ করে দিতে আমরা উদ্যোক্তাদের অনুরোধ করেছি। সেটি হলে সড়কে বেশি লোকের গাদাগাদি হবে না। লকডাউনে গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। তবে অধিকাংশ শ্রমিকই কারখানার আশপাশেই থাকেন। আর প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব গাড়িতে কর্মীরা আসা–যাওয়া করতে পারবেন। আশা করি, এবারও সমস্যা হবে না।’

গত বছরে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উত্তরণে সব সময় খোলা ছিল ব্যাংক। এ ছাড়া পুরো বছর ঋণ শোধ না করেও ভালো গ্রাহক হিসেবে থাকার সুযোগ পেয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এবারও এমন কোনো সিদ্ধান্ত আসবে কি না, তা এখনো জানা যায়নি।

বিজ্ঞাপন
অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন