বুকিং না নেওয়ায় খালি পড়ে আছে সাড়ে ১২ হাজার বড় কনটেইনার

প্রথম আলো ফাইল ছবি

পণ্য রপ্তানি হয় ৪০ ফুট লম্বা কনটেইনারে। কনটেইনার সংকটের সময়ে চট্টগ্রামের ১৯ ডিপোতে পড়ে আছে এই আকারের ১২ হাজার ৬৮৯ কনটেইনার। এই খালি কনটেইনারে অন্তত ১২ দিনের রপ্তানি পণ্য পরিবহন সম্ভব। তবে বুকিং না নেওয়ায় এসব কনটেইনার কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তেমনি যেসব কোম্পানি বুকিং নিচ্ছে তাদের এ ধরনের কনটেইনার সংখ্যা কম।

অবশ্য ২০ ফুট লম্বা কনটেইনারও আছে ১৩ হাজার ৬৪৭ টি। তবে ছোট কনটেইনারে ইউরোপ আমেরিকামুখী পোশাক রপ্তানি হয় কম। সে জন্য এসব কনটেইনারের চাহিদা নেই।

সংকটের সময় এভাবে বড় কনটেইনার খালি পড়ে থাকার কারণ হিসেবে জাহাজ কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, সিঙ্গাপুর বা কলম্বো থেকে ইউরোপ-আমেরিকায় বড় জাহাজে বুকিং মিলছে না। সবচেয়ে বেশি সংকট ইউরোপমুখী জাহাজে। ইউরোপের অনেক বন্দরে জটের কারণে অন্তত দুটি বড় শিপিং কোম্পানি ইউরোপগামী রপ্তানি পণ্যের বুকিং নিচ্ছে না। তারা শুধু যুক্তরাষ্ট্রগামী রপ্তানি পণ্যের বুকিং নিচ্ছে। আবার একটি কোম্পানি আমেরিকামুখী রপ্তানি পণ্যের বুকিং নিচ্ছে না। ফলে তাদের খালি কনটেইনার পড়ে আছে। তাতে সংকটের সময় এসব কনটেইনারে রপ্তানি পণ্য পরিবহনের সুযোগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগছে তৈরি পোশাক শিল্প। কারণ রপ্তানির বড় অংশই তৈরি পোশাক।

তৈরি পোশাক শিল্পের সংগঠন বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বৈশ্বিক সংকট থেকে কীভাবে পার পাওয়া যায় সে জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। কারণ এই সংকট অব্যাহত থাকলে পোশাক রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

শিপিং কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কনটেইনারের মধ্যে এক হাজার ৮০০ কনটেইনার রয়েছে হংকংভিত্তিক শিপিং লাইন ‘ওওসিএল’ এর।

জানতে চাইলে ‘ওওসিএল’ এর কান্ট্রি হেড ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ইউরোপের রটারড্যামসহ অনেক বন্দরে জট। এ পরিস্থিতিতে অনেক কোম্পানি সিঙ্গাপুর বা কলম্বো থেকে ইউরোপ রুটে কনটেইনার পরিবহনের ক্ষমতা কমিয়ে এনেছে। বিপরীতে পণ্য রপ্তানি বেড়েছে। তাতে ইউরোপমুখী জাহাজে কনটেইনার পরিবহনের জন্য বুকিং পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে খালি পড়ে থাকলেও সেগুলোতে রপ্তানি পণ্য বোঝাই করা যাচ্ছে না। তবে আমেরিকাগামী রপ্তানি পণ্যের বুকিং নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

জাহাজ কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, খালি পড়ে থাকা বড় কনটেইনারের মধ্যে মেডিটেরিয়ান শিপিং কোম্পানির পড়ে আছে এক হাজার ৬৫০টি। এই শিপিং কোম্পানিও নতুন করে ইউরোপে আগের মতো বুকিং নিতে চাচ্ছে না। অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেনি তারা।

মেডিটেরিয়ান শিপিং কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের হেড অব অপারেশন অ্যান্ড লজিস্টিক আজমীর হোসাইন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রামে ইউরোপমুখী রপ্তানি পণ্য পরিবহন নিশ্চিত করতে হলে সিঙ্গাপুর বা কলম্বো বন্দর থেকে বড় জাহাজের বুকিং পেতে হবে। চরিত্রানুযায়ী সেই বুকিং মিলছে না। বুকিংয়ের নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই কেবল রপ্তানি পণ্য পরিবহনের সুযোগ থাকে।

এর বিপরীত চিত্রও আছে। হ্যাপাগ লয়েডসহ কয়েকটি শিপিং কোম্পানির একই সমস্যা থাকলেও ইউরোপগামী রপ্তানি পণ্য পরিবহনের সেবা চালু রেখেছে। তবে তাদের খালি কনটেইনারের সংখ্যা কমে আসছে। তাতে তাদের খালি কনটেইনারের সংকট বাড়ছে। আবার তাদের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক রপ্তানি পণ্য বোঝাই কনটেইনার স্তূপ হয়ে আছে চট্টগ্রামের ১৯ ডিপোতে। এগুলো জাহাজিকরণে দুই-তিন সপ্তাহ সময় লাগছে।

কনটেইনারে পণ্য পরিবহন কার্যক্রম চক্রাকারে হয়। কনটেইনারে পণ্য আমদানির পর তা খালি হলে রপ্তানি পণ্য বোঝাই করা হয়। রপ্তানি পণ্যবোঝাই কনটেইনার নির্ধারিত গন্তব্যে নিয়ে খালি করে আবারও পণ্য বোঝাই করা হয়। এভাবে কখনো পণ্য নিয়ে কখনো বা খালি অবস্থায় জাহাজে করে এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে চক্রাকারে ঘুরতে থাকে কনটেইনার।

করোনা শুরুর ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পর গত বছরের শেষদিকে চীনসহ এশিয়ার উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে ইউরোপ-আমেরিকায় কনটেইনারে রপ্তানি বেড়েছে। করোনার কারণে এসব দেশ থেকে বিলাসপণ্যের আমদানি কমে গেছে বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোতে। তাতে ইউরোপ-আমেরিকা থেকে কনটেইনার ফেরত আসার হার কমেছে। আবার এসব দেশের অনেক বন্দরে জট তৈরি হওয়ায় কনটেইনার ফেরত আসতে সময় বেশি লাগছে। কনটেইনার পরিবহনের চক্রাকার কার্যক্রমের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে এই সমস্যা তৈরি হয়েছে।

রপ্তানিকারকের দায়িত্ব হলো কারখানা থেকে রপ্তানি পণ্য কাভার্ড ভ্যানে কনটেইনার ডিপোতে নিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের প্রতিনিধি ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া। এরপর মূলত বিদেশি ক্রেতারা তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে এই পণ্য নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন। বিদেশি ক্রেতা বা ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের সঙ্গে শিপিং কোম্পানির চুক্তি থাকে। তারা সে অনুযায়ী নির্ধারিত শিপিং কোম্পানির কনটেইনারে পণ্য পরিবহন অগ্রাধিকার দেন।

ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন প্রথম আলোকে বলেন, কনটেইনার ডিপোতে যেসব কনটেইনারে রপ্তানি পণ্য বোঝাই করা হয়েছে সেগুলোও এখন বিদেশের বন্দরে দ্রুত নেওয়া যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে কয়েকটি শিপিং কোম্পানির বড় আকারের খালি কনটেইনার থাকলেও নতুন করে বুকিং নিচ্ছে না। আবার কেউ বুকিং নিতে চাইলেও খালি কনটেইনার নেই তাদের। সব মিলিয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে।

কনটেইনার ডিপো মালিক সমিতির হিসেবে, ১৯টি ডিপোতে সোমবার পর্যন্ত রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনারের সংখ্যা ১৪ হাজার একক ছাড়িয়ে গেছে। কনটেইনারে বোঝাইয়ের অপেক্ষায় শেডে ও গাড়িতে আছে বিপুল পরিমাণ রপ্তানি পণ্য।

শিপিং কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে ইউরোপে পণ্য রপ্তানি নিয়ে। বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাকের রপ্তানি বেশি হচ্ছে এখন ইউরোপের দেশগুলোতে। ডিপোতে যেসব রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার স্তূপ হয়ে আছে সেগুলোর সিংহভাগই ইউরোপগামী।

সংকট বেশি থাকায় এখন ইউরোপগামী বড় কনটেইনারের পরিবহন ভাড়াও বেড়েছে। যেমন, আমেরিকাগামী ৪০ ফুট কনটেইনারে রপ্তানি পণ্য পরিবহনের ভাড়া এখন আট থেকে ১০ হাজার মার্কিন ডলার। আর ইউরোপগামী একই রকমের কনটেইনারে রপ্তানি পণ্য পরিবহনের ভাড়া ১০-১৫ হাজার। কোনো কোনো শিপিং কোম্পানি ১৯ হাজার ডলার ভাড়া চাইছে। অবশ্য ভাড়া বাড়লেও তা দিচ্ছে রপ্তানি পণ্যের বিদেশি ক্রেতারা।