শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর নির্মাণাধীন তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর দৈর্ঘ্য সোয়া কিলোমিটারের মতো। প্রকল্প অনুমোদনের ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও এর নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায়
শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর নির্মাণাধীন তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর দৈর্ঘ্য সোয়া কিলোমিটারের মতো। প্রকল্প অনুমোদনের ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও এর নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায়ছবি: দিনার মাহমুদ

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ২০১০ সালে পদ্মা সেতু ও তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু প্রকল্প অনুমোদন দেয়। খরস্রোতা পদ্মার ওপর সোয়া ছয় কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পথে। অথচ নদীর পরিস্থিতি অনুকূল থাকার পরও মাত্র ১ দশমিক ২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর কাজ এখনো শেষ হয়নি।

গুরুত্ব-প্রয়োজনীয়তা, নকশা ও নির্মাণশৈলীর দিক থেকে পদ্মা সেতুর সঙ্গে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর তুলনা হয় না। তবে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় নির্মাণাধীন শীতলক্ষ্যা সেতুটির গুরুত্বও নেহাত কম নয়। কারণ, সেতুটি হলে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ সহজ হবে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ সদরের সঙ্গে বন্দর উপজেলারও সংযোগ ঘটবে।

বর্তমানে প্রতিদিন বন্দর উপজেলার প্রায় এক লাখ মানুষকে নৌকা ও ট্রলারে করে নারায়ণগঞ্জ সদরে আসা-যাওয়া করতে হয়। এতে প্রতিনিয়ত যেমন ভোগান্তি থাকে, তেমনি মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটে।

এই সেতুর কাছেই ৪ এপ্রিল বেপরোয়া গতিতে চালিয়ে আসা একটি কার্গো জাহাজ চাপা দেয় ছোট লঞ্চকে। এতে ৩৪ জনের মৃত্যু হয়। নৌযানচালক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, জাহাজটির গতি যেমন বেপরোয়া ছিল, তেমনি সেতুর কাছে নৌপথ সংকুচিত হওয়াও দুর্ঘটনার একটি কারণ। লঞ্চ দুর্ঘটনার তদন্তে গঠিত বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কমিটির প্রতিবেদনেও দুর্ঘটনার অনেকগুলো কারণের একটি হিসেবে সংকুচিত নৌপথকে দায়ী করেছিল।

বিজ্ঞাপন
# নির্মাণকাজের কারণে নৌযান চলাচলের পথ সংকুচিত হয়েছে।
# ৪ এপ্রিল এই সেতুর কাছেই বেপরোয়া কার্গোর ধাক্কায় লঞ্চডুবিতে ৩৪ জনের মৃত্যু হয়।

১০ বছরেও কেন তুলনামূলক ছোট এই সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলো না, তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেল, এই প্রকল্পে অর্থায়নকারী সংস্থা সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি) এবং বাংলাদেশ সরকারের টানাপোড়েন ও খামখেয়ালির কারণেই দেরি হয়েছে। ফলে প্রকল্পটির ব্যয় ও মেয়াদ বাড়াতে হয়েছে।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু প্রকল্পটি পাস করার সময় এর ব্যয় ধরা হয় ৩৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে এসএফডি ৩১২ কোটি টাকা ঋণ এবং সরকারের ৬৫ কোটি টাকা জোগান দেওয়ার কথা। পরের বছর সংস্থাটির সঙ্গে ঋণচুক্তি সই হয়। ২০১৩ সালের মধ্যে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ করার কথা ছিল।

নির্ধারিত সময়ে সেতুর কাজ শেষ করতে না পারায় ৩৭৭ কোটি টাকার প্রকল্প এখন ৬১০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। খরচ বেড়েছে ২৩৩ কোটি টাকা, যা শুরুর ব্যয়ের চেয়ে ৬২ শতাংশ বেশি। বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশ জোগান দিতে হবে সরকারের তহবিল থেকে। নতুন ব্যয় কাঠামো অনুযায়ী, সরকার দেবে ২৬৫ কোটি টাকা, যা আগে ছিল ৬৫ কোটি টাকা। আর এসএফডি দেবে ৩৪৫ কোটি টাকা।

প্রকল্পের সার্বিক কাজ এখনো ২৫ শতাংশ বাকি। এ কারণে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর জন্য পরিকল্পনা কমিশনে চিঠি দিয়েছে সওজ অধিদপ্তর।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রকল্পের নথিপত্র সূত্র জানাচ্ছে, এই প্রকল্পে পরামর্শক ও ঠিকাদার নিয়োগ দিতেই লেগে যায় সাত বছর। কারণ, সেতুর নির্মাণ ঠিকাদার ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ নিয়ে ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে অর্থায়নকারী সংস্থা এসএফডির টানাপোড়েন চলে।

সওজের কর্মকর্তারা বলেন, সাধারণত আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের পর তা চূড়ান্ত করতে এক বছরের মতো লেগে যায়। ঠিকাদার নিয়োগে ২০১১ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক দরপত্র ডাকা হলে তাতে সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচিত হয় চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি)। কিন্তু এসএফডির সদর দপ্তর তা নাকচ করে জানায়, চীনের ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিকভাবে কালোতালিকাভুক্ত। সওজের কর্মকর্তারা বলছেন, সিসিসিসি যে বিশ্বব্যাপী কালোতালিকাভুক্ত, সেটি তাঁরা জানতেন না। ফলে এসএফডির পরামর্শে পুনরায় দরপত্র ডাকা হয়। এবারে সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচিত হয় চীনেরই আরেক প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ২০১৭ সালে সরকারের চুক্তি হয়।

এর আগে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্যও দুবার দরপত্র ডাকতে হয়েছে। সওজ প্রথম দফায় যে প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত করেছিল, সেটি অনুমোদন করেনি এসএফডি। যে কারণে দ্বিতীয় দফায় দরপত্র ডাকা হয়। এবারে যৌথভাবে কাজ পায় বাংলাদেশের এসএআরএম অ্যাসোসিয়েটস, পাকিস্তানের ওমর মুনশি অ্যাসোসিয়েটস ও সৌদি আরবের আল মুহান্দিস কনসালটিং ইঞ্জিনিয়ারিং। প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারের চুক্তি সই হয় ২০১৪ সালে।

পরামর্শক ও ঠিকাদার নিয়োগের জটিলতা শেষ হওয়ার পর ২০১৭ সালে কাজ শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি। চুক্তি অনুযায়ী কাজ শুরুর আগে ঠিকাদারকে মূল সেতুর ৪৪৮ কোটি টাকার কাজের ১০ শতাংশ হিসেবে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা অগ্রিম দেওয়ার কথা। এই টাকা ছাড় করতে এসএফডি সময় নেয় এক বছর। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৪৫ কোটি টাকা ছাড়ের পর সেতুর মূল কাজ শুরু হয়। এরপর ধাপে ধাপে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো বিল দাখিল করলেও ৫৬ দিনের পরিবর্তে এসএফডি কখনো ১০০ দিন, কখনোবা ১৩০ দিনে অর্থ ছাড় করেছে। বিল পেতে দেরি হওয়ায় ঠিকাদার সিনোহাইড্রোও কাজ নিয়ে গড়িমসি করে।

এসএফডির সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থা অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) যুগ্ম সচিব এ কে এম শাহাবুদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রথম দিকে সমস্যা ছিল। এখন সঠিক সময়ে টাকা ছাড় করছে সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি)।’

সেতুর নকশা নিয়েও জটিলতা দেখা দিয়েছিল। প্রথম নকশায় নদীর যেখানে সেতু নির্মাণের কথা, সেখানে আগে থেকেই পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশের (পিজিসিবি) হাইভোল্টেজ বৈদ্যুতিক লাইন রয়েছে। তাই সেতুর নকশা পরিবর্তন করতে হয়েছে। আবার নতুন করে কিছু জমি অধিগ্রহণ করতে হয়েছে। নির্মাণের ব্যয় বৃদ্ধির বড় কারণ জমি অধিগ্রহণ, উপকরণের দাম বাড়া, মূল্য সংযোজন কর (মূসক/ভ্যাট) ও বেতন-ভাতা বাবদ খরচ। গত ১০ বছরে প্রকল্পটির পরিচালক বদল করা হয়েছে ১০ বার।

জানতে চাইলে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু প্রকল্পের পরিচালক শোয়েব আহমেদ বলেন, ১ দশমিক ২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতুর কাজ শেষ করতে ১০ বছর সময় নেওয়া সত্যিই অপ্রত্যাশিত। কিন্তু এই প্রকল্পে পরামর্শক ও ঠিকাদার নিয়োগেই অনেক সময় চলে গেছে। তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির (এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক) মতো বহুজাতিক সংস্থাগুলো কাজ শুরুর আগে অগ্রিম টাকা ছাড় করতে সময় নেয় এক মাস। সেখানে এসএফডি নিয়েছে এক বছর।

শুধু শীতলক্ষ্যা তৃতীয় সেতু নয়, সরকারের বেশির ভাগ অবকাঠামো প্রকল্পেই সময়ক্ষেপণ ও ব্যয় বাড়ানোর ঘটনা ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে সমীক্ষা ছাড়া। কোনো ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সমীক্ষা ছাড়া প্রকল্প নেওয়া হয়। বদলাতে হয় নকশা। দেরির মাশুল দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।

জানতে চাইলে সাবেক সচিব ও বৃহৎ প্রকল্প বিশেষজ্ঞ ফাওজুল কবির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার তো শুধু বড় বড় প্রকল্পের পেছনেই ছুটছে। দেশে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছোট প্রকল্প আছে, যেদিকে সরকার নজরই দেয় না। অথচ সেসব প্রকল্প থেকে দ্রুত সুফল মেলে। তিনি আরও বলেন, মাত্র সোয়া কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতুর নির্মাণকাজ ১০ বছরেও শেষ হবে না, এটা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সরকার যদি নিজের টাকায় সেতুর কাজ করে ফেলত, সৌদি কর্তৃপক্ষ কি নিষেধ করত? মূল বিষয় হলো, এসব ছোট প্রকল্পের দিকে সরকারের মনোযোগ নেই। এসএফডির টাকা পাওয়া যাচ্ছে না, এটা অজুহাত হতে পারে, কারণ নয়।

বিজ্ঞাপন
অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন