default-image

ভারত থেকে অক্সিজেন আমদানি বন্ধ হলেও জরুরি মুহূর্তে দেশে অক্সিজেনের সংকট হবে না বলে জানিয়েছেন ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তারা। বর্তমানে অক্সিজেনের যে চাহিদা রয়েছে, তার তিন-সাড়ে তিন গুণ পর্যন্ত চাহিদা পূরণ করার সক্ষমতা আছে দেশীয় কোম্পানিগুলোর। সেই সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে হলে গ্যাসীয় অক্সিজেন তরল করতে নতুন প্ল্যান্ট (লিকুইফ্যাকশন প্ল্যান্ট) বসাতে হবে।

দেশে প্রতিষ্ঠিত ও নিয়মিত অক্সিজেন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বাইরে চট্টগ্রামে অক্সিজেন উৎপাদনের বড় দুটি কারখানা রয়েছে। দুটিই বড় দুই শিল্প গ্রুপের। একটি আবুল খায়ের গ্রুপের, অন্যটি জিপিএইচ ইস্পাতের। নিজস্ব ইস্পাত কারখানার প্রয়োজনেই প্রতিষ্ঠান দুটি আলাদা এ অক্সিজেন কারখানা স্থাপন করেছে। এ দুটি গ্রুপের অক্সিজেন উৎপাদন সক্ষমতা প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টনের। এর মধ্যে ৫০ টনের মতো তরলে রূপান্তরিত হয়। বাকিগুলো রড উৎপাদনে ব্যবহারের জন্য উৎপাদিত গ্যাসীয় অক্সিজেন। বর্তমানে করোনার এ দুর্যোগে দুটি কারখানা থেকেই তরল অক্সিজেনের প্রায় পুরোটাই হাসপাতালে ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা হচ্ছে। বাকি গ্যাসীয় অক্সিজেন শিল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

জিপিএইচ ইস্পাত জানিয়েছে, সীতাকুণ্ডে প্রতিষ্ঠানটির ইস্পাত কারখানায় প্রতিদিন প্রায় ২৫০ টন অক্সিজেন উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ২২-২৫ টন তরল অক্সিজেন ও ২২৫ টন গ্যাসীয় বা বায়বীয় অক্সিজেন। অন্যদিকে আবুল খায়ের স্টিলের (একেএস) দৈনিক অক্সিজেন উৎপাদনক্ষমতাও ২৫০ টনের কাছাকাছি। তাদের কারখানায়ও বায়বীয় ও তরল আকারে অক্সিজেন উৎপাদিত হয়। বায়বীয় অক্সিজেনের যেটুকু শিল্পের কাজে লাগে, সেটুকু ব্যবহারের পর বাকিটুকু বাতাসে ছেড়ে দেওয়া হয়।

দুটি কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সব মিলিয়ে দুটি কোম্পানি এখন দিনে স্বাস্থ্য খাতে ৪৫-৫০ টন অক্সিজেন সরবরাহ করছে। স্বাস্থ্য খাতে অক্সিজেন সরবরাহকারী একাধিক প্রতিষ্ঠানের কাছে এ অক্সিজেন সরবরাহ করছে শিল্প গ্রুপ দুটি। উৎপাদনক্ষমতার বাকি অক্সিজেন স্বাস্থ্য খাতে ব্যবহারোপযোগী করতে হলে সেই সক্ষমতা অবশ্য গ্রুপ দুটির নেই। সে ক্ষেত্রে শুধু অক্সিজেন উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই সেটি সম্ভব। এ ছাড়া শিল্পে ব্যবহারের গ্যাসীয় অক্সিজেনকে তরল আকারে রূপান্তর করার জন্য নতুন ইউনিট বসাতে হবে, যেটি বসাতে পাঁচ-ছয় মাস সময় লাগতে পারে। ভারতের মতো সংকটে যাতে বাংলাদেশকে পড়তে না হয়, সে জন্য আগেভাগে কিছু প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সে ক্ষেত্রে শিল্প গ্রুপ দুটির উৎপাদিত অক্সিজেনকে স্বাস্থ্যে ব্যবহারোপযোগী করার প্রস্তুতি এখন থেকে নিয়ে রাখা উচিত বলে মনে করছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।

জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) মোহাম্মদ আলমাস শিমুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কারখানায় উৎপাদিত ২০ থেকে ২৫ টন তরল অক্সিজেন এখনই স্বাস্থ্য খাতে ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করছি। দেশের প্রয়োজনে ইস্পাত উৎপাদন কমিয়ে মেডিকেলে অক্সিজেন সরবরাহ করতে আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে।’

গ্রুপটি করোনার শুরু থেকে বিভিন্ন হাসপাতালে বিনা মূল্যে অক্সিজেন সরবরাহ করছে।

২০ থেকে ২৫ টন তরল অক্সিজেন এখনই স্বাস্থ্য খাতে ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করছি। প্রয়োজনে ইস্পাত উৎপাদন কমিয়ে মেডিকেলে অক্সিজেন সরবরাহে আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে।
মোহাম্মদ আলমাস শিমুল, এএমডি, জিপিএইচ ইস্পাত

তরল অক্সিজেনের উৎপাদন বাড়িয়েছে একেএস স্টিল

এদিকে গতকাল থেকে লিনডে বাংলাদেশ ও স্পেক্ট্রা অক্সিজেন লিমিটেডকে তরল অক্সিজেন সরবরাহ শুরু করেছে আবুল খায়ের গ্রুপের প্রতিষ্ঠান একেএস স্টিল। প্রথম দিন তারা ২২ টন তরল অক্সিজেন সরবরাহ করেছে।

একেএস মিলের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক ও কারখানা ইনচার্জ ইমরুল কাদের ভূঁইয়া বলেন, তাঁদের অক্সিজেন প্ল্যান্টটির উৎপাদনক্ষমতা ২৬০ টন। এত দিন ২৫০ টন অক্সিজেন গ্যাস ও ১০ টন তরল অক্সিজেন উৎপাদন করতেন। গতকাল থেকে গ্যাস অক্সিজেনের উৎপাদন ১০ টন কমিয়েছেন। আর বাড়িয়েছেন তরল অক্সিজেন উৎপাদন। এখন দৈনিক ২০ টন তরল অক্সিজেন উৎপাদন শুরু করেছেন তাঁরা। গত বছরের ১২ মে থেকে দৈনিক গড়ে ৫০০ সিলিন্ডার অক্সিজেন গ্রুপটি বিভিন্ন হাসপাতালে সিলিন্ডার হিসেবে সরবরাহ করছে।

প্রতিষ্ঠানটির সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. শামসুদ্দোহা বলেন, এত দিন তাঁরা অক্সিজেন গ্যাস সিলিন্ডার ভর্তি করে বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহ করতেন। বর্তমানে তরল অক্সিজেন সরবরাহ করছেন দুই প্রতিষ্ঠানকে। তাঁরা বিনা মূল্যে এ অক্সিজেন সরবরাহ করছেন।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিল্প গ্রুপের অক্সিজেনকে স্বাস্থ্যে ব্যবহারোপযোগী করার দক্ষতা ও সক্ষমতা রয়েছে বহুজাতিক কোম্পানি লিনডে বাংলাদেশসহ এ খাতের অক্সিজেন উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর।

বিজ্ঞাপন

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ে দেশে স্বাস্থ্য খাতে অক্সিজেনের চাহিদা রয়েছে ১০০ টনের কাছাকাছি। করোনার কারণে এ চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর এই চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫০ থেকে ২০০ টনে। সংক্রমণ কমতির দিকে থাকলে চাহিদাও কমে যায়।

বর্তমানে দেশে স্বাস্থ্য খাতে সর্বাধিক অক্সিজেন সরবরাহকারী বহুজাতিক কোম্পানি লিনডে বাংলাদেশ। এ ছাড়া আছে ইসলাম অক্সিজেন, স্পেক্ট্রা অক্সিজেনসহ মাঝারি ও ছোট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

একেএস ও জিপিএইচের উদ্যোক্তারা জানান, রড উৎপাদনের জন্য গ্রুপ দুটির কারখানায় ৯৯.৯৯ শতাংশ বিশুদ্ধ অক্সিজেন উৎপাদিত হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে দরকার হয় ন্যূনতম ৯৯.৫০ শতাংশ বিশুদ্ধ অক্সিজেন।

অর্থনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন